বেশিরভাগ মানুষ স্কুল খোলার পক্ষে

নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে সংশয়ও

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১

বিশেষ প্রতিনিধি

অভিভাবক ও শিক্ষক বাদে দেশের ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ স্কুল খুলে দেওয়ার পক্ষে। তবে অভিভাবকদের প্রায় ৫৫ ভাগ তাদের সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে এখনও নিরাপদ বোধ করছেন না। প্রায় অর্ধেক অভিভাবক মনে করেন, তাদের সন্তানরা সরকারের জারি করা স্কুল স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে চলতে সক্ষম নয়।

এসডিজি বাস্তবায়নে 'নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ'-এর করা এক অনলাইন জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার 'অবশেষে স্কুল খুলছে :আমরা কতখানি প্রস্তুত?' শীর্ষক এক ভার্চুয়াল সংলাপে জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়। মোট এক হাজার ৯৬০ জনের ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে অভিভাবক ছিলেন ৫৭৬ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৩৭০ জন। বাকি ব্যক্তিরা অন্যান্য শ্রেণি-পেশার। গত ১৭ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি এই অনলাইন জরিপ পরিচালনা করা হয়। এতে সিংহভাগ মানুষ স্কুল খুলে দেওয়ার পক্ষে থাকলেও ৫২ শতাংশ মানুষ স্কুল খুলে দেওয়ার পর সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বলেছেন।

সংলাপে জরিপের তথ্য তুলে ধরেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) যুগ্ম পরিচালক অভ্র ভট্টাচার্য। সঞ্চালনায় ছিলেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। ঢাকা ও এর বাইরের ১৬টি জেলা থেকে শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা সংলাপে অংশগ্রহণ করেন।

জরিপে অভিভাবকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, স্কুল খুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার প্রণীত স্বাস্থ্য নির্দেশিকা সম্পর্কে তারা অবগত কিনা? জবাবে প্রায় ৮৭ শতাংশ অভিভাবক বলেন, তারা অবগত। তবে সন্তানের স্কুল স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে চলতে বিদ্যালয়ের অতিরিক্ত ব্যয় হবে, ৬৭ শতাংশ অভিভাবক সেজন্য অতিরিক্ত কোনো ফি দিতে চান না।

৮৭ শতাংশ শিক্ষক স্কুলে যেতে নিরাপদ বোধ করার কথা জানিয়েছেন। সমপরিমাণ শিক্ষক মনে করেন, স্বাস্থ্য নির্দেশিকা নিশ্চিত করার সামর্থ্য তাদের রয়েছে। প্রায় ৬৯ শতাংশ শিক্ষক অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহনে সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করার কথা বলেছেন। আর অভিভাবক ও শিক্ষক বাদে জরিপে অংশ নেওয়া অন্যান্য শ্রেণি- পেশার ৫৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ সরকারের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা বাস্তবায়নযোগ্য বলে মনে করেন।

সংলাপে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী দ্রুত স্কুল খুলে দেওয়ার কথা বলেন। তবে তারাও স্বাস্থ্যবিধি মানার ওপর জোর দিয়েছেন। শিক্ষকরা সিলেবাস কমানোর বিষয়ে তাদের তীব্র আপত্তির কথা জানান। অনেক প্রাথমিক শিক্ষক বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয় খুলতে দেরি হওয়ায় অনেক শিশু আশপাশের কওমি মাদ্রাসা ও কেজি স্কুলে ভর্তি হয়ে চলে যাচ্ছে। দ্রুত স্কুল না খুললে শিশুদের মূলধারা থেকে হারাতে হতে পারে।

কয়েকজন শিক্ষক বলেন, শহর অঞ্চলের স্কুলগুলো খোলার জন্য যতখানি প্রস্তুত, চর, হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের স্কুলগুলো ততটা প্রস্তুত নয়। স্কুল খোলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা যন্ত্রপাতি কেনার জন্য এককালীন একটি থোক বরাদ্দ রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মাস্কের ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্কুলে সবার দুপুরের খাওয়ারের ব্যবস্থা করতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, স্কুল খোলার ব্যাপারে একটা বড় ধরনের ঐকমত্য রয়েছে। তবে একটা মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। অটোপাসকে আগামীতে আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব সে ক্ষেত্রে সিলেবাস সংকোচন করতে হবে।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, সব বিষয়ে গুরুত্ব না দিয়ে শুধু কিছু মৌলিক বিষয়ে জোর দিয়ে স্কুল খোলা হলে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কম পড়বে।

শিক্ষার্থীদের শুধু স্কুলে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে শিক্ষা প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনতে হবে বলে মনে করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, স্বাস্থ্য নির্দেশিকাগুলো বিশদ এবং স্কুলের ভেতর সব নিয়মাবলি মেনে চলা কঠিন হবে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমিত আকারে শুধু মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্কুল খোলা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নেহাল আহমেদ।

সংলাপে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রবীণ শিক্ষকনেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ, সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবু সাঈদ ভূঁইয়া, অর্থনীতিবিদ ড. সাজ্জাদ জহির, প্রাইমারি হেড টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন, বঙ্গবন্ধু প্রাইমারি শিক্ষক সমিতির সভাপতি আবদুর রহমান বাচ্চু, বাংলাদেশ টিচার্স ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ রফিকা আফরোজ।