এক বছর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের নিহত সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির। হামলার আগে তাকে প্রাণনাশের হুমকির বিষয়টি মোজাক্কির সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন। হুমকির পরই কথিত সাংবাদিক হাসান ইমাম রাসেল কোম্পানীগঞ্জের রূপালী চত্বরে একটি দোকানে মোজাক্কিরের ওপর হামলা চালান। এ সময় কেউ একজন ভিডিওটি ধারণ করেন। সম্প্রতি মোজাক্কির

নিহত হওয়ার পর ওই ভিডিও নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। পুলিশও সেই হামলার ভিডিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও কোম্পানীঞ্জ থানা পুলিশ এক বছর আগের হামলার সঙ্গে বর্তমান ঘটনার কোনো রেশ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখছে।

এক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি দোকানে মোজাক্কিরকে চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুষি মারছেন হাসান ইমাম রাসেল। এ সময় আঞ্চলিক ভাষায় তাকে বলতে শোনা যাচ্ছে, 'বোলা, কারে বোলাইবি বোলা। বোলাচ্ছাকা, তোর কোন বাপ আছে বোলা। বোলাচ্ছা, বোলা, কারে বোলাইবি বোলা'। রাসেল এ সময় মোজাক্কিরকে অশ্নীল ভাষায় গালি ও মারধর করছিলেন। এক পর্যায়ে মোজাক্কির নিজেকে রক্ষায় পাশের আরেকটি দোকানে গিয়ে আশ্রয় নেন।

এই হামলার আগেই মোজাক্কির স্থানীয় এক সাংবাদিককে ফেসবুক মেসেঞ্জারে রাসেলের প্রাণনাশের হুমকির  বিষয়টি জানিয়ে ছিলেন। ওই সাংবাদিকের সঙ্গে কথোপকথনে মোজাক্কির বলেছিলেন, 'রনি আমাকে নুরনবী চৌধুরীর বাসায় সবার সামনে অপমান করেছে। আমাকে প্রায়ই কল দিয়ে বলে, তোরে রাসিল্লায় মাইরবো।'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সাংবাদিক সমকালকে বলেন, হাসান ইমাম রাসেল মূলত কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড মিডিয়ার কার্ড ব্যবহার করে নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেন। তিনি বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জার অনুসারী। গিয়াস উদ্দিন রনি কথিত সাংবাদিক রাসেলের বন্ধু। তারা দু'জন মিলে একটি 'সাংবাদিক' সংগঠনও গঠন করেছেন। দুই মাস ধরে সব কর্মসূচিতে রাসেলকে মঞ্চে আবদুল কাদের মির্জা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তবে সম্প্রতি রাসেলকে 'মাদক সম্রাট' আখ্যা দেন কাদের মির্জা। তিনি তাকে হত্যার পরিকল্পার সঙ্গেও রাসেল জড়িত ছিল বলে ফেসবুক লাইভ ও বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দেন। এ সময় রাসেলকে যেখানে পাওয়া যাবে ধরে পুলিশে দেওয়ার জন্য সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানান মেয়র। তারপর থেকে রাসেল অনেকটা আত্মগোপনে চলে যান। প্রায় ১৫ দিন ধরে তাকে এলাকায় তেমন দেখা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার আবদুল কাদের মির্জা সমকালকে বলেন, 'সে কোথাকার চাঁদাবাজ? আমি তাকে চিনি না।'

সাংবাদিক মোজাক্কিরের ওপর হামলার বিষয়ে হাসান ইমাম রাসেল সমকালকে বলেন, '২০১৯ সালের ১৩ মের ঘটনা। বুরহান উদ্দিন মোজাক্কির আমাদের সঙ্গে কাজ করতেন। তখন উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ঝামেলা চলছিল। কেউ মিজানুর রহমান বাদল ভাইয়ের পক্ষে, কেউ সাহাবউদ্দিন সাহেবের পক্ষে। মোজাক্কিরের বাড়ি যেহেতু চাপরাশির হাটে, ফলে বাদল ভাইয়ের দিকে তার একটা ঝোঁক ছিল। তখন আমি বেশি বেশি সাহাবুদ্দিন সাহেবের পক্ষে লেখালেখি করছিলাম। এরপর মোজাক্কির একটি ফেক ফেসবুক আইডি থেকে আমাকে বিভিন্ন বাজে কমেন্ট করা শুরু করে। আমি বিষয়টি রনিকে বলার পর সে মোজাক্কিরকে তার দোকানে ডেকে আনেন। এ সময় আমি তাকে একটু বকাঝকা করেছি। এর দুই মিনিট পরই আমরা আবার মিলে গিয়েছি। এখন একটি পক্ষ ওই ভিডিও ভাইরাল করে মূলত হত্যাকারীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।'

পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি বসুরহাট থেকে মাদকসহ হাসান ইমাম রাসেলকে আটক করে যৌথ বাহিনী। এ সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন। এরপর ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি টাস্কফোর্স অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল উদ্ধার করে। অভিযানের সময় পালিয়ে গেলেও পরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মামলায় দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন রাসেল।

এই ভিডিওর বিষয়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মীর জাহেদুল হক রনি সমকালকে বলেন, 'রাসেল একটি পুরোনো মামলার আসামি। আমরা তাকে খুঁজছি। এক বছর আগে মোজাক্কিরের ওপর হামলার ভিডিওটির বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সেই ঘটনার সঙ্গে মোজাক্কির হত্যার কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তাও তদন্ত করে দেখব।'

মোজাক্কিরের মেজভাই ফখরুদ্দিন সমকালকে বলেন, তার ভাই সব সময় অসহায় মানুষের সেবায় কাজ করেছে। এই ছোট্ট জীবনে সে ৩২ বার অন্যকে রক্ত দিয়েছে। ভাইয়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ হয়নি জানিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা করার জন্য একটি মোটরসাইকেল চেয়েছিল। ৩০ হাজার টাকা সে সংগ্রহ করার কথাও বলেছিল। বাকি টাকা যোগ করে এই মাসেই একটি মোটরসাইকেল কিনে দেব বলেছিলাম। কিন্তু মোজাক্কিরের সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।

পিবিআইর ঘটনাস্থল পরিদর্শন :কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় জেলা পিবিআইর বিশেষ পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সির নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল চাপরাশিরহাট পূর্ব বাজারে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তারা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেন।

কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম স্থগিত :উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত ঘোষণা করে গতকাল চিঠি দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুল আনম চৌধুরী সেলিম। তিনি জানান, হাইকমান্ডের নির্দেশে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত বলবৎ থাকবে। এ সময় ফেসবুকে কোনো রাজনৈতিক উস্কানিমূলক বক্তব্য বা স্ট্যাটাস দেওয়া যাবে না।

এদিকে মোজাক্কির হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের বাঁশখালী এবং কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে।











মন্তব্য করুন