আকস্মিকভাবে পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরলো কর্তৃপক্ষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত সরকারি কলেজের পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার রাত ও গতকাল বুধবার দিনভর শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও অবরোধের মুখে নতুন করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা আগের ঘোষণা মতোই স্থগিত থাকবে। ২৪ মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খোলার পর পরীক্ষা শুরু হবে।

গতকাল বিকেলেই সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার নতুন সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। দুটি পরীক্ষা পেছানো হয়েছে। গতকাল চতুর্থ বর্ষের যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, তা ৭ মার্চ হবে। আর আজ বৃহস্পতিবারের পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হবে ১৩ মার্চ।

এর আগে গতকাল সকাল ৯টার দিকে পরীক্ষার স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং হল-ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবিতে রাজধানীর নীলক্ষেত ও সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। ফলে নিউমার্কেট-আজিমপুর সড়কের উভয় পাশে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন গাড়ি নিউ এলিফ্যান্ট রোড হয়ে কাঁটাবন দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। পরে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে অবস্থান নিলে সিটি কলেজ থেকে শাহবাগ পর্যন্ত সড়কও বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এই যানজট মিরপুর রোড হয়ে গাবতলী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে পুরো রাজধানীতেই এর প্রভাব পড়ে, চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা জোনের ডিসি সাজ্জাদুর রহমান বলেন, নীলক্ষেত মোড়টি রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের একটি। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন করার কারণে রাজধানীজুড়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। জনদুর্ভোগও প্রকট হয়ে ওঠে।

শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নিয়ে রুটিন অনুযায়ী চলমান পরীক্ষা নেওয়াসহ আবাসিক হল ও ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবি জানান। কিছু শিক্ষার্থী কাফনের কাপড় পরেও কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পুলিশ তুলে দিতে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। একপর্যায়ে জলকামান নিয়ে এগিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশকে ঘিরে ধরে এবং উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের একটি করে লাল গোলাপ উপহার দেয়।

আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজধানীর ইডেন সরকারি মহিলা কলেজের চতুর্থ বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই সময়ে পরীক্ষা স্থগিত করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। ২০১৯ সালে যে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা এখনও আটকে আছে। আমরা আর কত সেশনজটে পড়ে থাকব?

শিক্ষার্থী ইসমাইল বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমাদের পরীক্ষা চলছিল। সকাল ৯টায় আমাদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। আমরাও প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ স্থগিতের ঘোষণায় আমরা বিপাকে পড়েছি। আমাদের অনেকেই পরীক্ষা চলবে এমন ঘোষণায় বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় আসার পর তাদের বাসা নেওয়া, ফরম ফিলআপ এবং ভর্তি হওয়া পর্যন্ত বিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে গতকাল বিকেলে জরুরি ভার্চুয়াল সভা ডাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য এবং সাত কলেজের অধ্যক্ষরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে সাত সরকারি কলেজের প্রধান সমন্বয়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেন, সাত কলেজের চলমান পরীক্ষাগুলো অব্যাহত থাকবে। তবে পরীক্ষা চলাকালে কলেজগুলোর হোস্টেল খোলা যাবে না এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

একই সময়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ভিডিওবার্তায় বলেন, আমি আশা করি, এই সাত কলেজের কোনো পরীক্ষা নিয়ে কোনো সংশয় থাকবে না, পরীক্ষাগুলো চলবে। কিন্তু আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয় ২৪ মে খুলবে। আর হলগুলো খুলবে ১৭ মে।

বিকেল ৪টার দিকে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা এলে সড়কে অবস্থান নিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা আনন্দ প্রকাশ করে স্লোগান দিতে দিতে চলে যান। বিকেল সোয়া ৪টার পর থেকে রাজধানীতে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ। এই কলেজগুলোয় শিক্ষার্থী প্রায় দুই লাখ।নতুন সময়সূচি :অধিভুক্ত সাত কলেজের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের স্থগিত পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। গতকাণ বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহলুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ রুটিন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের ২০১৯ সালের তৃতীয় বর্ষ স্নাতক পরীক্ষার্থীদের স্থগিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষাগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারি, ৩, ৬, ৯ ও ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় পরীক্ষা শুরু হবে। অন্যদিকে, স্নাতক চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষাগুলো ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২, ৪ ও ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এ বর্ষের পরীক্ষাও প্রতিদিন সকাল ৯টায় শুরু হবে।



মন্তব্য করুন