অক্সফোর্ডের কভিড টিকা নেওয়ার পরও রাজধানী ঢাকার এক স্বাস্থ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সাজ্জাদ হোসেন নামের ওই স্বাস্থ্যকর্মী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার হিসেবে কর্মরত। গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে গণটিকাদান শুরুর পরদিন তিনি টিকা নেন। এর ১৬ দিনের মাথায় মঙ্গলবার তার করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে।

সাজ্জাদ সমকালকে বলেন, টিকা নেওয়ার স্থানে প্রথমে ব্যথা এবং পরে জ্বর অনুভব করেন। টানা দু'দিন জ্বর ছিল। তবে প্যারাসিটামল ওষুধ সেবনে তা সেরে যায়। পরে হাসপাতালে কাজে ফেরেন। তিন দিন আগে তিনি আবারও জ্বরজ্বর অনুভব করেন। তাই সোমবার তিনি করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন। মঙ্গলবার ওই নমুনা পরীক্ষার ফল পজিটিভ আসে। বর্তমানে তিনি বাসায় আইসোলেশনে আছেন।

টিকা নেওয়ার পরও সাজ্জাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরে মিটফোর্ড হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। মিটফোর্ড হাসপাতালের কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, করোনার প্রতিষেধক টিকা নেওয়ার পর তারা অনেকটাই স্বস্তিতে ছিলেন। সবাই মনে করেছিলেন, টিকা নেওয়ার পর করোনামুক্ত স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। এ কারণে টিকা নেওয়ার পর থেকে তারা আগের মতো স্বাস্থ্যবিধি মানছিলেন না। অনেকে মাস্কও সঠিকভাবে ব্যবহার করেননি। সাজ্জাদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় সবার মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এখন তারা মনে করছেন, টিকা নিলেও তাদের আগের মতোই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে, মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

করোনার জাতীয় টিকা বিতরণ সংক্রান্ত কোর কমিটির সদস্য ও আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর সমকালকে বলেন, প্রতিষেধক টিকা নিলে কেউ করোনায় আক্রান্ত হবেন না, এমন কোনো নিশ্চয়তা বিজ্ঞানীরা দেননি। টিকা নেওয়ার পর কেউ আক্রান্ত হলে তার সংক্রমণ হবে মৃদু। একই সঙ্গে তার মারাত্মক সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকিও কম থাকবে। অর্থাৎ টিকা মৃত্যুঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি মারাত্মক সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করবে।

টিকা গ্রহণের কতদিন পর অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, টিকা গ্রহণের ১৪ থেকে ২১ দিনের মাথায় শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে থাকে। ওই অ্যান্টিবডি তৈরি হলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। তখন আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমে। তবে করোনাভাইরাস থেকে মুক্ত থাকতে টিকাই একমাত্র উপায় নয়। টিকা একটি মাত্র উপায়। এর সঙ্গে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। বিশেষ করে কোনো কিছু খাওয়ার আগে নূ্যনতম ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। তাহলেই করোনার সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে। টিকা নেওয়ার পর দেশে আরও কেউ আক্রান্ত হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে ডা. আলমগীর বলেন, এমন খবর এখনও তারা পাননি।

টিকা নিয়েও দেশে দেশে করোনায় আক্রান্ত : টিকা নেওয়ার পরও বিশ্বের অনেক দেশে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগোর নার্স ম্যাথিউ ডব্লিউ ফাইজারের টিকার প্রথম ডোজ নেন। এর পর ৮ দিনের মাথায় তিনি করোনা পজিটিভ হন। এর পরই বিশ্বব্যাপী শোরগোল পড়ে যায়। প্রশ্ন ওঠে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে।

৩১ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক টাইমসের এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাইজারের টিকা মেসেঞ্জার আরএনএ বা এমআরএনএ অনুভিত্তিক টিকা। এটি মানবদেহে প্রবেশ করে করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের অনুরূপ প্রোটিন তৈরির নির্দেশ দেয়। এসব নকল স্পাইক প্রোটিনে করোনা হয় না। কিন্তু মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় হয় এবং সৃষ্ট অ্যান্টিবডি স্পাইক প্রোটিনকে চিনে রাখে। পরে সহজেই করোনার সংক্রমণ রোধ করতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি তৈরি হতে কয়েকদিন সময়ের প্রয়োজন হয়। এই সময়ের মধ্যে কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে সেটি বিরল ঘটনা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, ইসরায়েল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে টিকা গ্রহণের পরও অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের ইমিউনোলজিস্টের অধ্যাপক ড্যানি অল্টম্যানের উদ্ৃব্দতি দিয়ে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি টিকা নেওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গেই সেটি কার্যকর হবে না। ইমিউনিটি তৈরি হতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে।

টিকা নেওয়ার পর মানবদেহ করোনার জেনেটিক উপাদানগুলো শনাক্ত করতে এবং অ্যান্টিবডি ও টি-সেল তৈরি করতে বেশ খানিকটা সময় নেয়। এর পর ধীরে ধীরে এগুলো ভাইরাসের দেহকোষে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বা আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।

টিকা কতদিন পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ করবে : করোনার প্রতিষেধক টিকা আসার পর বিশ্বজুড়ে সবার প্রশ্ন ছিল, টিকা কতদিন পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখতে পারবে? মহামারি শুরু হওয়ার এক বছর পর মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে ইমিউনিটির ওপর বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার লা জোলা ইনস্টিটিউট অব ইমিউনোলজির গবেষণা বলছে, করোনার সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর প্রায় ছয় মাস পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মানবদেহে থেকে যায়। ব্রিটেনের জনস্বাস্থ্য বিভাগের গবেষণায়ও প্রায় একই ফলাফল দেখা যায়। এতে বলা হয়, কভিড থেকে সেরে ওঠার পর বেশিরভাগ রোগী অন্তত পাঁচ মাস আবার সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবেন।

তবে টিকা কতদিন সুরক্ষা দেবে, তা এখনও অজানা। বিজ্ঞানীরা এখনও এটা উদ্‌ঘাটন করতে পারেননি। বিবিসির এক প্রতিবেদনে ব্রিটেনের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট ড. জুলিয়ান ট্যাংয়ের উদ্ৃব্দতি দিয়ে বলা হয়, টিকা গ্রহণের পর কতদিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কার্যকর থাকবে, তা এখনও বলা কঠিন। কারণ বিশ্বব্যাপী কেবল টিকাদান শুরু হয়েছে। একেক মানুষের ওপর এই টিকার ফলাফল একেক ধরনের। আবার কে কী ধরনের টিকা প্রয়োগ করছে, সেটির ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। টিকা গ্রহণের পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কয়েক বছর থেকে যাবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের অপর এক গবেষণায় বলা হয়।

টিকা নিলেন আরও ১ লাখ ৮২ হাজার মানুষ : দেশে গণটিকাদান কর্মসূচির ১৫তম দিনে গতকাল বুধবার টিকা নিয়েছেন আরও এক লাখ ৮১ হাজার ৯৮৫ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ১২ হাজার ৯৯ জন এবং নারী ৬৯ হাজার ৮৮৬ জন। এ নিয়ে মোট টিকা নিলেন ২৬ লাখ ৭৩ হাজার ৩৮ জন। এদিন সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টিকা পেতে ৩৮ লাখ ৮৯ হাজার ৩৪৫ জন নিবন্ধন করেছেন।



মন্তব্য করুন