দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণায় আবারও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে ১৭ মে হল খুলে দেওয়া এবং ২৪ মে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের ঘোষণা দিলে পর দিন মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চলমান সব ধরনের পরীক্ষা স্থগিত করে। কর্তৃপক্ষের এমন ঘোষণা প্রত্যাহার করে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। আগামী রোববারের মধ্যে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা। পরীক্ষার দাবিতে সড়ক অবরোধ করলে রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করেছে পুলিশ।

সকাল ১১টার দিকে কলেজের সামনের নীলক্ষেত-আজিমপুর সড়কে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে নীলক্ষেত-আজিমপুর সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। তারা জোর করে শিক্ষার্থীদের কলেজের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ- সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ করে। নারী পুলিশ সদস্যরা তাদের চুল ধরে জোর করে ক্যাম্পাসের ভেতরে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে লালবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সানওয়ার হোসেন গণমাধ্যমকর্মীদের বলেছেন, কলেজের শিক্ষকরা এসে আন্দোলনকারীদের বুঝিয়েছেন, কিন্তু তারা শিক্ষকদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। এরপর কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে পুলিশ তাদের সেখান থেকে উঠিয়ে দেয়। লাঠিচার্জের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : দুপুর ১২টায় শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিল নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধু চত্বরে অবস্থান ও সমাবেশ করেন তারা। এ সময় বক্তারা বলেন, পরীক্ষার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। অন্তত ১০টি বিভাগের পরীক্ষা চলছে, কয়েকটির শুরু হবে। কারও কারও একটি বা দুটি পরীক্ষা বাকি আছে। হঠাৎ পরীক্ষা বন্ধ করে দেওয়ায় অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এস এম রবিউল হাসান সমকালকে বলেন, 'পরীক্ষা স্থগিতের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি করেছেন শিক্ষার্থীরা। আমরা তাদের দাবি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব। আমরা একা এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব না।'

এদিকে সমাবেশ শেষে আন্দোলনকারীরা প্রক্টরের অফিসে স্মারকলিপি দিয়ে বের হওয়ার সময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাহ মোহাম্মদ শিহাবকে পেছন থেকে আঘাত করেন ছাত্রলীগের এক কর্মী। তাকে কিল-ঘুষি মারেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই ছাত্রলীগ কর্মীর নাম মুজাহিদ চৌধুরী। মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'মারামারির কোনো ঘটনা হয়নি। প্রক্টর অফিস থেকে বের হওয়ার সময় একটু ধাক্কা লেগেছে।'

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় :সকাল সাড়ে ১১টার দিকে প্যারিস রোডে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা সেখানেই বসে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। দুপুর ১টার দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেখানে প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান গেলে শিক্ষার্থীরা তাকে রোববার দুপুর ১২টার মধ্যে পরীক্ষা চালুর ঘোষণা দিতে সময় বেঁধে দেন। এই সময়ের মধ্যে পরীক্ষা গ্রহণের ঘোষণা না এলে কঠোর আন্দোলনে নামবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা। পরে সোয়া ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা তাদের অবস্থান কর্মসূচি শেষ করেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, দীর্ঘদিন পর গত জানুয়ারিতে ২০১৯ সালের অনার্স শেষ বর্ষ ও মাস্টার্সের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল। আমরা মেসে থেকে পরীক্ষা দিচ্ছিলাম। হঠাৎ পরীক্ষা স্থগিত করায় আমরা বিপাকে পড়ে গেছি। অনেক বিভাগে লিখিত পরীক্ষা কয়েকটি হয়েছে। আবার অনেক বিভাগে কেবল ব্যবহারিক পরীক্ষা বাকি আছে।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় :দুপুর ১টায় বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ১১ মাস তারা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে ছিলেন। গত জানুয়ারি থেকে তাদের পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও হঠাৎ গত মঙ্গলবার থেকে চলমান সব পরীক্ষা স্থগিত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে সেশনজটসহ নানা সমস্যার মধ্যে পড়বেন তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. সুব্রত কুমার দাস বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা যেহেতু দাবি জানিয়েছে তাই পুনরায় পরীক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে আমরা ওপর মহলে যোগাযোগ করব।

কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় :সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়বাংলা ভাস্কর্য চত্বরে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। পরে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় প্রক্টর উজ্জ্বল কুমার প্রধান বিষয়টি নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের আশ্বাস দিলে শনিবার পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন তারা।

উপাচার্য অধ্যাপক এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে আমরা পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা তো সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে ক্লাস-পরীক্ষা নিতে পারি না।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় :দুপুর ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা বলেন, সব কিছু স্বাভাবিক চললেও হঠাৎ করেই চলমান পরীক্ষা বন্ধ করা অযৌক্তিক। আমরা এমনিতেই অনেকটা পিছিয়ে গেছি। এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখলে আমরা ভয়াবহ সেশনজটে পড়ব। অনতিবিলম্বে আটকে থাকা চূড়ান্ত পরীক্ষাগুলো নিতে হবে।

প্রক্টর ড. কাজী মোহাম্মদ কামাল উদ্দীন বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা পরীক্ষা স্থগিত করেছি। পুনরায় সরকারি নির্দেশনা এলে পরীক্ষা নেওয়া হবে।

ঢাবির আন্দোলন প্রত্যাহার : বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জানান, ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম শেষে আগামী ১ মার্চ থেকে আবাসিক হল খুলে দেওয়ার দাবি থেকে সরে এসে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র জুনায়েদ হুসেইন খানের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। দুপুরে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও তারা সেটি করেননি। তবে আন্দোলন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারী আরেক অংশের শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, আন্দোলন প্রত্যাহারের বিষয়ে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের কথা বলা হয়নি।

এ বিষয়ে জুনাইদ হুসেইন খান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়েই আন্দোলন করা হয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে প্রত্যাহারেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

১ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবি জাবি শিক্ষার্থীদের :আগামী ১ মার্চের মধ্যে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে এ মানববন্ধন হয়। মানববন্ধনের শুরুতে লোকপ্রশাসন বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আল মাহমুদ শাফির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।





মন্তব্য করুন