স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যারা নাশকতা চালিয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সরাসরি হামলাকারী, ইন্ধনদাতা ও অর্থদাতাদের পৃথক তালিকা করছে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। নজর রাখা হচ্ছে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকসহ বেশ কয়েকজন মাঝারি ও শীর্ষ পর্যায়ের নেতার গতিবিধির ওপর। কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে বিতর্ক, সংগঠন ও পরিবারে ইমেজ সংকট এবং একের পর এক মামলায় এখন চতুর্মুখী চাপে রয়েছেন মামুনুল হক।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। জানা গেছে, 'সবুজ সংকেত' পেলেই সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে যে কোনো সময় মামুনুলসহ হেফাজতের কয়েকজন নেতাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তারা যাতে পালাতে না পারেন, সে লক্ষ্যে সংশ্নিষ্ট সংস্থাকে সজাগ রাখা হয়েছে।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে সরকারি-বেসরকারি নানা অফিসে এবার যেভাবে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা তা ভালোভাবে নেয়নি। যারা জ্বালাও-পোড়াও করেছে, তাদের বিরুদ্ধে তাই কঠিন অ্যাকশনে যেতে মাঠ পর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

যেসব জেলায় হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে নৈরাজ্য হয়েছে, সেখানকার পুলিশ সুপারসহ সংশ্নিষ্ট মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নাশকতাকারীদের ধরতে তৎপর রয়েছে র‌্যাবও। সর্বশেষ 'শিশু' বক্তা রফিকুল ইসলাম ও নারায়ণগঞ্জে বিএনপিদলীয় কাউন্সিলর ইকবাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরকারী আরমান মালিক ও ঘোড়া নিয়ে হামলায় জড়ানো যুবক সৈকত হোসেনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হেফাজতের ব্যাপারে এবার কঠোর নীতি নেওয়া হয়েছে। শুরুর দিকে হেফাজতের বিরুদ্ধে যেসব মামলা করা হয়েছিল, তাতে সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়নি। তবে গত দু'দিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হেফাজতের একাধিক নেতার নাম উল্লেখ করেই মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জে রিসোর্টে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামুনুল হকসহ ৮৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। এতে ৫০০ থেকে ৬০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামিও করা হয়েছে।

এ ছাড়া বায়তুল মোকাররম মসজিদে তাণ্ডবের ঘটনায়ও মামুনুল হককে আসামি করে মামলা হয়েছে। এ মামলার অপর আসামিরা হলেন- হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব, লোকমান হাকিম, নাসির উদ্দিন মনির, নায়েবে আমির বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, নুরুল ইসলাম জেহাদী, মাজেদুর রহমান, হাবিবুর রহমান, খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, জসিম উদ্দিন, মাসুদুল করিম, মনির হোসাইন কাশেমী, যাকারিয়া নোমান ফয়েজী, ফয়সাল আহমেদ, মুশতাকুন্নবী, হাফেজ মো. জোবায়ের ও হাফেজ মো. তৈয়ব। এজাহারে বলা হয়েছে- মামুনুল হকের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় আরও দুই-তিন হাজার আসামি ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়া ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের নানা স্থানে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও বাড়িঘরে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে।

আরেকজন কর্মকর্তা জানান, হেফাজতে ইসলামের বিভিন্ন কর্মসূচির আগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের বার্তা দেওয়া হয়। কর্মসূচি ঘিরে যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, বিষয়টি তাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় প্রশাসন। হেফাজতও প্রতিশ্রুতি দেয় কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটবে না। তবে তারা বারবার প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন। ওই কর্মকর্তার যুক্তি- হেফাজত কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমে উগ্র কর্মী-সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। পরে এসব ঘটনার দায়িত্বও নেন না তারা। ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব ভাঙচুর ও স্থানীয় সাংবাদিকের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার পরও কোনো দায়িত্ব নেয়নি হেফাজতে ইসলাম। সোমবার হেফাজতের একটি প্রতিনিধি দল প্রেস ক্লাব পরিদর্শনে গিয়ে দাবি করেন, 'হামলাকারীরা হেফাজতের কেউ নন। ভিডিও দেখে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।' ওই কর্মকর্তা জানাচ্ছেন, হেফাজত তাদের কর্মসূচিতে জ্বালাও-পোড়াও করতে গিয়ে হতাহত হওয়া ব্যক্তিদের 'কর্মী-সমর্থক' হিসেবে দাবি করছে। অথচ যারা জ্বালাও-পোড়াও করেছে, তাদের দায়-দায়িত্বের বিষয়টি অস্বীকার করছে।

ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। প্রথমে ধরা হচ্ছে হামলায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫২ জনকে। জেলায় মামলায় হয়েছে ৪৫টি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীকাণ্ডে হেফাজত নেতা মামুনুল হক সংগঠনের ভেতরেও এক ধরনের চাপে রয়েছেন। তবে হেফাজতের 'সম্মান' ও সংগঠনের প্রভাব বিবেচনায় প্রকাশ্যে কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস করছেন না। যদিও একের পর এক অডিও ফাঁস ও নানা তথ্য-উপাত্ত সামনে আসার পর হেফাজতের অনেকেই নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন, মামুনুল 'সঠিক' কাজ করেননি। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ রয়্যাল রিসোর্টে তিনি তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম হিসেবে প্রথম স্ত্রী আমেনা তৈয়্যবার নাম ব্যবহার করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, বৈধ স্ত্রী হলে তিনি কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে রিসোর্ট বুকিং ফরমে প্রথম স্ত্রীর নাম কেন লিখলেন। এসব ঘটনা তাদের ক্ষুব্ধ করেছে।

এদিকে রিসোর্টের বুকিং ফরমে উল্লেখিত কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী 'আমেনা তৈয়্যবা' জানিয়েছেন, তার নাম জান্নাত আরা ঝরনা। বাবার নাম অলিয়র। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। খুলনার সোনাডাঙ্গা খালাসি মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা শহিদুল ইসলামকে বিয়ে করেছিলেন ঝরনা। পরে এটা প্রমাণিত হয়, ঝরনাকে নিয়েই রিসোর্টে গিয়েছিলেন মামুনুল। জানা গেছে, ঝরনাকে নিজের বাসায় তোলার সাহস দেখাননি মামুনুল। তাকে বছিলায় শরীফ নামে একজনের বাসায় রাখা হয়েছে।

ঝরনার ফোনালাপ : ঝরনার নতুন একটি ফোনালাপের রেকর্ড সমকালের কাছে এসেছে। সেখানে তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যখন জেরা করছিল তখন হুজুর বলছিলেন, তার স্ত্রীর নাম তৈয়্যবা। আমি হুজুরের বাবার নাম জানি না। আবার হুজুর কোথাও কোথাও বলছেন আমাকে নাকি চেনেন না।' ফোনের ওপাশ থেকে বলা হয়, 'একের পর এক তার রেকর্ড ফাঁস হচ্ছে তারপরও হুজুর একই নম্বর থেকে বারবার কথা বলছেন। বিপদে পড়লে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।' ঝরনা এরপর বলেন, 'উনি কেন মিথ্যার আশ্রয় নিলেন।'


মন্তব্য করুন