গুজব ছড়িয়ে গত সোমবার রাতে ফরিদপুরের সালথায় উপজেলা পরিষদ, থানা চত্বরে তাণ্ডব চালায় স্থানীয়রা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় ইউএনও ও এসিল্যান্ডের গাড়ি। ওই হামলায় অংশ নেওয়া হাজার হাজার মানুষের মধ্যে অধিকাংশই বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতপন্থি। তবে অভিযোগ রয়েছে, তাদের উস্কে দিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগেরই কিছু নেতাকর্মী।

গতকাল বুধবার সালথা উপজেলা সদরে ঘুরে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সোমবার রাতের ওই হামলায় অংশ নিয়েছিল চার-পাঁচ হাজার মানুষ। স্থানীয় বাহিরদিয়া মাদ্রাসার মোহতামিম মাওলানা আকরাম আলীকে পুলিশ তুলে নিয়ে নির্যাতন করছে- এমন গুজব ছড়িয়ে লোকজনকে হামলার জন্য উস্কানি দেওয়া হয়। যদিও মাওলানা আকরাম এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না বলে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

প্রথম দিকে ঘটনাটি সীমিত পরিসরে থাকলেও পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতা যারা অন্য দল থেকে অনুপ্রবেশ করেছেন, তাদের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে এ ঘটনার নেপথ্যে। স্থানীয়রা জানান, গত ২৫ জানুয়ারি সালথা বাজারে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে উপজেলা প্রশাসনের ওপর ক্ষুব্ধ হন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ইমারত হোসেন পিকুল ও উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বাদল হোসেন।

সে সময় ১৮টি অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিলে পিকুল, বাদল ও তাদের সমর্থকরা প্রকাশ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সোমবারের ঘটনায় তাদেরই হামলাকারীদের হাতে দেশীয় অস্ত্র ও ঢাল-কাতরা তুলে দিতে দেখা গেছে।

অবশ্য ইমারত হোসেন পিকুল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি এই হামলার সঙ্গে যুক্ত নন, বরং তার এলাকা রামকান্তপুরের উত্তেজিত জনতাকে তিনি নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেছেন। একই মন্তব্য করেছেন বাদল হোসেন। তিনি বলেন, এই হামলার সঙ্গে শুধু বিএনপির লোকজনই জড়িত।

সেদিনের ঘটনার নেপথ্যে এই দু'জনের বাইরেও আরও কয়েকজনের নাম এসেছে। তাদের একজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ওয়াহিদুজ্জামান। স্থানীয় ভাওয়াল গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু মাতুব্বর বলেন, ঘটনার সূত্রপাত যেখানে সেই ফুকরা বাজারের পল্লি চিকিৎসক কাউসারের সমর্থকরাই এসিল্যান্ডের গাড়ি তাড়া করেছিল। কাউসার বিএনপির সমর্থক। তবে পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি বড় পর্যায়ে নিতে উস্কানি দেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ওয়াহিদুজ্জামান ও তার সমর্থকরা। উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি কাজী দেলোয়ারও বলেছেন, সোমবারের তাণ্ডবে মূল অংশগ্রহণকারী বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতপন্থিরা হলেও এর নেপথ্যে স্থানীয় নব্য আওয়ামী লীগারদের কয়েকজন নেতার ভূমিকা রয়েছে।

একই অভিযোগ বল্লভদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক নুরুল ইসলামের। তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকার বিএনপির লোকজনকে সংগঠিত করে এই হামলার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে নব্য আওয়ামী লীগারদেরও কয়েকজন ছিলেন। তাদের অন্যতম মাঝারদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাহিদুজ্জামান সাহিদ। সাহিদ আগে বিএনপি করতেন। ছিলেন নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

অবশ্য এই দুই নেতাই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ওয়াহিদুজ্জামান বলেছেন, 'আমি আগে বিএনপি করলেও উল্লেখযোগ্য পদপদবি ছিল না। দলের মধ্যে গ্রুপিং থাকায় প্রতিপক্ষ আমাকে ফাঁসাতে চাইছে।' হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। সাহিদুজ্জামান সাহিদ বলেছেন, 'হামলার বিষয় আমি পরের দিন জেনেছি। আমি সালথায় থাকি না, থাকি ফরিদপুরে। আমার জড়িত থাকার প্রশ্নই আসে না।'

হামলার সঙ্গে আওয়ামী লীগের একাংশের নেতাকর্মী জড়িত থাকার বিষয়ে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. ওয়াদুদ মাতুব্বর বলেন, 'আমরা অনেক কিছুই জানি, কিন্তু অবস্থানের কারণে বলতে পারি না।'

এদিকে, হামলায় বিএনপির সংশ্নিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সালথা উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার। তিনি বলেন, 'প্রশাসন যদিও বলছে ঘটনাটি পরিকল্পিত। সেটি সঠিক নয়। গুজব ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় জনতা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে এই তাণ্ডবে অংশ নিয়েছে।'

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম আলী বলেন, সোমবার রাতে চালানো তাণ্ডবের ঘটনা এখনও চোখে ভাসছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি বলেন, সালথা দাঙ্গাপ্রবণ এলাকা হলেও এমন ঘটনা কখনও ঘটতে দেখিনি। এ ধরনের ভয়াবহ তাণ্ডব প্রথম দেখলাম। আমরা সবাই আতঙ্কে আছি।

আরও একজনের মৃত্যু :সোমবারের ঘটনায় মিরান মোল্যা (৩৫) নামে আহত আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের দরজাপুরুরা গ্রামের আব্দুর রব মোল্যার ছেলে। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাওয়াল ইউপি চেয়ারম্যান ফারুকুজ্জামান ফকির মিয়া। এর আগে জুবায়ের হোসেন (২০) নামে এক যুবক নিহত হন।

থানায় মামলা, গ্রেপ্তার ১২ :সালথা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতে মামলা করেছেন। মামলায় ৮৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত চার হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল পাশা বলেন, উপজেলা পরিষদ ভবন, ভূমি অফিস, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ও থানা এলাকায় তাণ্ডবের ঘটনায় এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে এই মামলা করেছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিসহ ১২ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন- গোপালিয়া গ্রামের মো. নুরু শেখ, বিনোকদিয়া গ্রামের সজিব কাজী, সাইফুল ইসলাম, ইউসুফদিয়া গ্রামের রাব্বি মাতুব্বর, মিনাজদিয়া গ্রামের ইউনুস মাতুব্বর, গোপালিয়া গ্রামের আমির মোল্যা, ফুকরা গ্রামের আবুল কালাম শেখ, রিপন শেখ, ইলিয়াস মোল্যা, চিলারকান্দা গ্রামের শহিদুল শেখ, পিসনাইল গ্রামের রুবেল ফকির ও সোনাপুর গ্রামের রাকিবুল ইসলাম।

তদন্ত কমিটি :জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানিয়েছেন, সালথার তাণ্ডবের ঘটনা তদন্তে ছয় সদস্যের দুটি কমিটি করা হয়েছে। একটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসলিমা আলীকে। অপর কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আসলাম মোল্যাকে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে দুই কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য করুন