ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী কর্মসূচি ঘিরে দেশের একাধিক জেলায় তাণ্ডব চালায় হেফাজতকর্মীরা। সর্বশেষ ফরিদপুরের সালথায় গুজব ছড়িয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় উপজেলা পরিষদ ও এসিল্যান্ডের গাড়ি। থানা চত্বরেও হামলা চালানো হয়। আশঙ্কা রয়েছে, একই আদলে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী আবার তাণ্ডব চালাতে পারে। এমন বাস্তবতায় নাশকতা ঠেকাতে দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হেফাজত ও তাদের মদদপুষ্টদের ঠেকাতে অপারেশনাল পুলিশ ফোর্স বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতিমূলক সব আয়োজন সম্পন্ন করতে মাঠ পর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়েছে নানা নির্দেশনা। যেসব জেলায় পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে সেখানকার কর্মকর্তাদের গাফিলতি ও ঢিলেঢালা আচরণের ব্যাপারে চলছে চুলচেরা বিশ্নেষণ। মাঠ পর্যায়ের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। চলমান পরিস্থিতিতে পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ মাঠে দায়িত্বরত সব কর্মকর্তার সঙ্গে দফায় দফায় ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। সেখানে প্রয়োজনীয় সব নির্দেশনা দেন তিনি।

একাধিক জেলার পুলিশ সুপার জানান, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষকে হুমকি দিতে পারে- এমন যে কোনো শক্তির ব্যাপারে আরও কঠোর নীতি প্রয়োগ করা হবে। তাদের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। সব পুলিশ সদস্যকে 'ব্যাটল রেডি' অবস্থায় থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত সেখানে যেতে হবে। এর জন্য সব ইউনিটে 'কুইক রেসপন্স' টিম গঠনের কথাও বলা হয়েছে। প্রতিটি স্থাপনায় কী ধরনের অস্ত্র-গুলি এবং কী পরিমাণ রয়েছে, তার হিসাব রাখতে হবে। আশপাশের এলাকায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টিতেও জোর দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে বলা হয়, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফাইটিং ফোর্স বাড়াতে হবে। ডেস্কে বসে কাজ করা পুলিশ সদস্য কমাতে হবে। পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিকে আরও মনোযোগ বাড়ানোর ব্যাপারেও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কারণ, কোনো এলাকায় পুলিশ সদস্যকে অতর্কিত আক্রমণ করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ঘিরে আরও সতর্ক থাকতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, একই ইস্যুতে একই সংগঠন কর্মসূচি আহ্বান করলেও কোনো কোনো জায়গায় তা দক্ষ হাতে মোকাবিলা করা হচ্ছে। তাই সেসব এলাকায় কোনো নৈরাজ্যকর ঘটনা ঘটেনি। আবার কোনো জেলায় উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে সেখানে পরিস্থিতি ঘোলাটে আকার ধারণ করছে। এক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দক্ষতা-অদক্ষতার বিষয়টি আলোচনার দাবি রাখে।

হেফাজত নেতা মামুনুল ইস্যুতে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়। পুলিশের নীতিনির্ধারকদের বার্তাও সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেননি তারা। এমনকি মাঠ পর্যায় থেকে তারা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়েছে। শৈথিল্যের কারণে মামুনুলকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জের পুলিশ প্রশাসনও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হাটহাজারীতেও হেফাজত তাদের শক্তি প্রদর্শন করে। সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক শৈথিল্য ছিল।

বিপরীতে নরসিংদী, গাজীপুর, সিরাজগঞ্জসহ বেশ কিছু জেলায় হেফাজতসহ ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠনের ব্যাপক প্রভাব থাকলেও তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হেফাজতসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আগে থেকেই কৌশলগত যোগাযোগ রক্ষা ও 'নরম-গরম' নীতি, নানামুখী 'হোম-ওয়ার্ক' এবং গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক জোরদার করার কারণে এসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল।

সেখানে অতীতে ভাঙচুর-নাশকতায় জড়িতদের সর্বশেষ অবস্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। যারা টুকটাক হামলায় জড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত অ্যাকশনে যায় পুলিশ। এ কারণে হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে নরসিংদী ও গাজীপুর মহানগরে উল্লেখযোগ্য কোনো নাশকতা ও ভাঙচুর হয়নি। খুলনা, বরিশাল, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগেও তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ সমকালকে বলেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় এরই মধ্যে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, এর পুনরাবৃত্তি আর কোথাও হোক- এটা আমরা চাই না। থানা-ফাঁড়িসহ যেভাবে সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ হচ্ছে, এটা অনাকাঙ্ক্ষিত। এ ধরনের হামলা ঠেকাতে ব্যাপক প্রস্তুতি তাদের রয়েছে।

নরসিংদীর পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বলেন, সংঘাত-সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। অশুভ চক্রান্তে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে কোনো কর্মসূচির নামে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালানো হলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নরসিংদীতে পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছি। আগামীতেও করব।

'হামলা ঠেকাতে' মেশিনগান পোস্ট :সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে 'হামলা ঠেকাতে' থানাগুলোতে মেশিনগান চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। মহানগর ও জেলা পুলিশের প্রতিটি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে বস্তা দিয়ে বাঙ্কার তৈরি করে সার্বক্ষণিক মেশিনগান নিয়ে পাহারা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকি ও গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশের স্থাপনাগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের বিভিন্ন মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, গত বুধবার রাত থেকে সিলেটে পুলিশি স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। গতকাল বিকেলে কোতোয়ালি মডেল থানায় গিয়ে বস্তা দিয়ে বাঙ্কার বানিয়ে তাতে লাইট মেশিনগান (এলএমজি) নিয়ে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। থানার সামনে সব ধরনের সুরক্ষা সামগ্রী পরিহিত অবস্থায় পুলিশের একাধিক প্যাট্রল টিমকে প্রস্তুত থাকতে দেখা যায়। নিরাপত্তা জোরদারের কথা নিশ্চিত করেছেন মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপকমিশনার বিএম আশরাফ উল্লাহ তাহের। তিনি জানান, যে কোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ জানান, নগরীর সব থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশি স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি স্থাপনায় এলএমজি পোস্ট বসানো হয়েছে। শুধু থানা বা ফাঁড়ি নয়; সরকারি সব স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাড়তি ফোর্স তৈরি রাখা হয়েছে। কেউ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করলে কঠোরভাবে তা দমন করা হবে।

'ছুটছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা' :চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতার সময় বিভিন্ন জায়গায় থানা ও ফাঁড়িতে আক্রমণের ঘটনায় নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ। চট্টগ্রামের দুটি থানায়ও আক্রমণ চালায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় পুলিশ সদরদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী নগর ও জেলার থানা এবং ফাঁড়িগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সর্বাবস্থায় সতর্ক থাকতে পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করতে থানা ও ফাঁড়িগুলোতে ছুটছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

নগর পুলিশের উপকমিশনার আবদুল ওয়ারীশ সমকালকে বলেন, 'ফোর্সদের নিয়মিত ব্রিফ করা পুলিশের রুটিন কাজের অংশ। তবুও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে যে কোনো ধরনের ঘটনা সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে মোকাবিলায় বিভিন্ন টেকনিক বা নিয়ম-কানুন তাদের পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে।'

মন্তব্য করুন