করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী সারাদেশে আজ বুধবার থেকে বিধিনিষেধ কার্যকর হচ্ছে। এই বিধিনিষেধকে বলা হচ্ছে 'লকডাউন'। আজ সকাল ৬টা থেকে আগামী ২১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত সাত দিন এই বিধিনিষেধ কার্যকর থাকবে। গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ সময়ে জরুরি সেবা ও শিল্প-কলকারখানা ছাড়া সবকিছু বন্ধ থাকবে। শিল্প-কলকারখানা কর্তৃপক্ষকে কর্মীদের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থায় আনা-নেওয়া করতে হবে। সর্বাত্মক লকডাউনে সংবাদপত্রসহ অন্যান্য জরুরি, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবাসংশ্নিষ্ট অফিস, তাদের কর্মী এবং যানবাহন নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। অর্থাৎ গণমাধ্যমের (সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া) কর্মীদের কাজ ও চলাচল অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া সংবাদপত্র এজেন্ট, হকার ও সংবাদপত্র পরিবহনও এই সর্বাত্মক লকডাউনের আওতার বাইরে থাকবে। সারাদেশে জেলা ও মাঠ প্রশাসন লকডাউনের সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহল দেবে।

সরকারি বিধিনিষেধের কঠোর বাস্তবায়ন চেয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে এই নির্দেশনা পালনে আগের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি বন্ধে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা, লকডাউনের আগের দিন যেভাবে মানুষ গ্রামে ফিরেছে, তাতে সংক্রমণ আরও বাড়বে। মানুষের বাড়ি ফেরা আটকাতে সরকারের ব্যর্থতার অভিযোগ করে তারা বলেছেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকার পরও হাজার হাজার মানুষ যেভাবে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে ফিরেছেন, তা দেখে মনে হয়, বিষয়টি নিয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। গ্রামে ফেরা অনেকে সংক্রমিত থাকতে পারেন। তারা গ্রামে গিয়ে পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও এলাকায় অন্যদের সংক্রমিত করতে পারেন।

সরকার মনে করছে, করোনার সংক্রমণ রোধে বিধিনিষেধ কার্যকর করার বিকল্প নেই। এরই অংশ হিসেবে সড়কে চলাচলের জন্য মুভমেন্ট পাস চালু করা হয়েছে। পুলিশের কাছ থেকে পাস না পাওয়া পর্যন্ত কেউ সড়কে ব্যক্তিগত যানবাহনেও চলাচল করতে পারবেন না।

গ্রামে ফেরার স্রোত :গতকাল সকাল থেকে সড়ক-মহাসড়কে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় মানুষ পিকআপ, ট্রাক ও প্রাইভেটকারে চেপে দলে দলে গ্রামে ফিরেছেন। মহাসড়কগুলোতে ছিল ব্যাপক ভিড়। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয় যানজটের। দৌলতদিয়া, পাটুরিয়া ও মাওয়া ফেরিঘাটেও ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলমুখী মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সড়ক-মহাসড়কে মানুষের বাড়ি ফেরার এই দৃশ্যকে ঈদের ছুটির সঙ্গে তুলনা করেছেন সংশ্নিষ্টরা। গত বছর মার্চ মাসে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পরও একইভাবে বাড়ি ফিরেছিলেন হাজার হাজার মানুষ। এ ছাড়া গত ৬ এপ্রিল বিধিনিষেধ আরোপের পরও গ্রামে ফিরেছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ নিয়ে ভয় :করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ৩ এপ্রিল ৫ হাজার ৬৮৩ জন আক্রান্ত এবং ৫৮ জন মৃত্যুবরণ করেন। এর পর পর্যায়ক্রমে ৪ এপ্রিল ৭ হাজার ৮৭ জন আক্রান্ত ও মৃত্যু ৫৩; ৫ এপ্রিল ৭ হাজার ৭৫ জন আক্রান্ত ও মৃত্যু ৫২; ৬ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ২১৩ ও মৃত্যু ৬৬; ৭ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ৬২৬ ও মৃত্যু ৬৩; ৮ এপ্রিল আক্রান্ত ৬ হাজার ৮৫৪ ও মৃত্যু ৭৪; ৯ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ৪৬২ ও মৃত্যু ৬৩; ১০ এপ্রিল ৫ হাজার ৩৪৩ জন আক্রান্ত এবং মৃত্যু ৭৭; ১১ এপ্রিল ৫ হাজার ৮১৯ আক্রান্ত এবং মৃত্যু ৭৮; ১২ এপ্রিল আক্রান্ত ৭ হাজার ২০১ এবং মৃত্যুবরণ করেন ৮৩ জন। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ৬ হাজার ২৮ জন আক্রান্ত এবং ৬৯ জন মৃত্যুবরণ করেন।

সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সর্বশেষ ১১ দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৭৩ হাজার ৩৯১ আর মৃত্যুবরণ করেছেন ৭৩৬ জন। প্রতিদিন গড়ে মৃত্যুবরণ করেন ৬৭ জন। দেশে গত বছর ৮ মার্চ দেশে করোনার সংক্রমণ শনাক্তের পর ওই বছরের জুন-জুলাই মাসে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কিন্তু ওই সর্বোচ্চ সংক্রমণের তুলনায় গত ১১ দিনে দ্বিগুণেরও বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হচ্ছে।

কঠোর বাস্তবায়ন চান বিশেষজ্ঞরা :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, সরকার যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে, সেটির কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ জন্য কঠোর হতে হবে। ৬ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিন থেকেই ওই নির্দেশনা পালনে ঢিলেঢালা ভাব ছিল। এ কারণে সেটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে মানুষকে ঘরে রাখতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এটি না হলে সংক্রমণ কখনও নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, 'লকডাউনে জরুরি প্রয়োজনে চলাচলের জন্য পুলিশের কাছ থেকে মুভমেন্ট পাস নিতে হবে। এ জন্য তারা একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন। পুলিশের আইজি বলেছেন, 'ওয়েবসাইটটি চালুর পর প্রথম ঘণ্টায় সোয়া এক লাখ মানুষ এই মুভমেন্ট পাসের জন্য আবেদন করেছেন। একই সঙ্গে প্রতি মিনিটে ১৫ হাজার আবেদন জমা হচ্ছে। এটি আতঙ্কের বিষয়। এতসংখ্যক মানুষ জরুরি প্রয়োজনে সড়কে বের হলে তো যানজট পড়ে যাবে! তাহলে লকডাউনের প্রয়োজন কী ছিল?'

অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, 'সংশ্নিষ্টদের বিশ্নেষণ করে দেখতে হবে, কী জরুরি প্রয়োজনে এসব মানুষ বের হতে চান। গুরুত্ব বিবেচনা করে কিছু মানুষকে সুযোগ দিতে হবে। তবে সবার প্রতি আহ্বান থাকবে- অযথা ঘরের বাইরে বের হয়ে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না।'

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, মানুষের ঘরে ফেরার দৃশ্য দেখে গত বছরের কথা মনে পড়ছে। ওই সময়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর হাজার হাজার মানুষ গ্রামে ফিরে সংক্রমণ ছড়িয়েছিলেন। এবার মানুষ বাড়ি ফিরলেন। বর্তমানে করোনার নতুন ধরন সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। গ্রামে ওই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে আক্রান্ত ও মৃত্যু আরও বাড়বে। সুতরাং মানুষের গ্রামে ফেরা আটকানোর প্রয়োজন ছিল। এখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিধিনিষেধের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করে নূ্যনতম ১৪ দিন লকডাউন দিতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারি নির্দেশনা সবাইকে মেনে চলতে হবে। কারণ করোনায় আক্রান্ত হলে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশী থেকে শুরু করে অন্যরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। কেউ বিধিনিষেধ না মানলে তার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সবাইকে সরকার আরোপিত বিধিনিষেধ মানতেই হবে। এর বিকল্প কিছু নেই।

মন্তব্য করুন