হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে তাণ্ডব, হেফাজত নেতা মামুনুল হক ইস্যু এবং ২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর পল্টন ও মতিঝিল এলাকায় নজিরবিহীন নৈরাজ্যের আদ্যোপান্ত নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন আজিজুল। অনেক প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি তিনি। তবে কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীসহ আটক ও পরে মামুনুলের ব্যাপারে যা ঘটেছে, সে ব্যাপারে নিজের ও সংগঠনের মতামত তুলে ধরেন পুলিশ রিমান্ডে থাকা হেফাজতের এই নেতা। রিমান্ডের প্রথম দিনে গোয়েন্দাদের কাছে আজিজুল বলেছেন, 'মামুনুল বিয়ে নিয়ে যা ঘটিয়েছেন, এটা ন্যক্কারজনক। বিয়ে গোপন করা তার ঠিক হয়নি। এরপর বিয়ে নিয়ে একেকবার একেক ব্যাখ্যা দেন মামুনুল। এটা ইসলাম সমর্থন করে না। হেফাজতের ভেতরে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।' জিজ্ঞাসাবাদ ও মামলার তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা গতকাল মঙ্গলবার সমকালকে এসব তথ্য জানান। এখন পর্যন্ত মামুনুলের দুটি কথিত বিয়ের তথ্য সামনে এসেছে, যা থানা পর্যন্ত গড়িয়েছে।

২০১৩ সালের ৫ মে পল্টন ও মতিঝিলে সরকারি অফিস, যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দায়ের মামলাগুলোর অন্তত চারটির এজাহারভুক্ত আসামি আজিজুল হক। ওই মামলাগুলোর একটিতে গত সোমবার তাকে গ্রেপ্তার দেখায় ডিবি। রোববার গভীর রাতে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকা থেকে র‌্যাব ও ডিবির অভিযানে গ্রেপ্তার হন তিনি। সোমবার তাকে ঢাকায় এনে আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।

আজিজুল হককে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে যুক্ত একজন পুলিশ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে মামুনুল হকের আটক হওয়ার বিষয়টি 'ব্যক্তিগত' বলে মনে করছেন আজিজুল। তবে মামুনুলের একাধিক বিয়ের যে তথ্য এখন বের হচ্ছে, তা এতদিন গোপন করা তার ঠিক হয়নি বলে আজিজুল মন্তব্য করেন। হেফাজত তার বিয়েকাণ্ডের বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি। তবে প্রকাশ্যে হেফাজতের কেউ মামুনুলের বিষয়টি নিয়ে বিরোধিতা করছে না। কারণ, এতে ব্যক্তি মামুনুলের তুলনায় সংগঠন ভাবমূর্তির সংকটে পড়বে বলে মনে করছেন আজিজুল। তাই কৌশল হিসেবে প্রকাশ্যে মামুনুলের ইস্যুকে ব্যক্তিগত বলে দাবি করে আসছে হেফাজত। তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়নি।

২৬ মার্চ কেন হঠাৎ করে ভাঙচুর-জ্বালাও-পোড়াওয়ে জড়াল হেফাজত- এমন প্রশ্নে আজিজুল হক দাবি করেন, কেন কারা এর নেপথ্যে ইন্ধন দিয়েছে- এটা তার জানা নেই। ২৬ মার্চ কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বায়তুল মোকাররমে যাননি। নামাজ আদায় করতে যান। এরপর সেখানে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে।

একটি রাজনৈতিক সংগঠনকে কেন্দ্র করে অশ্নীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন আজিজুল হক। এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, সম্প্রতি হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে যেসব এলাকায় হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে সেখানকার সিসিটিভি ও অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। যারা সরাসরি তাণ্ডবে জড়িয়েছে তাদের গ্রেপ্তারে একাধিক সংস্থা মাঠে নেমেছে। সবচেয়ে বেশি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। গতকাল পর্যন্ত ওই জেলায় ১৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একশ জন হেফাজতের নেতাকর্মী। বাকিরা বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মী।

হেফাজতের কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখছেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তারের পর এখন হেফাজতের অনেক নেতাকর্মীর ভাষ্য, মাওলানা আহমদ শফী মারা যাওয়ার পর একক নেতৃত্ব থেকে সংগঠনটি নিয়ন্ত্রণে কিছুটা শৈথিল্য রয়েছে। সংগঠনটির বর্তমান আমির জুনায়েদ বাবুনগরী শক্তভাবে সংগঠনটিকে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কোনো ইস্যুতে মাঠে নামলে কর্মী-সমর্থকদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আবার হেফাজতের ওপর ভর করে অনেক কর্মসূচিতে বিএনপি, জামায়াত-শিবির চক্র ঢুকে পড়ে। তারাও হামলা-ভাঙচুরে নানাভাবে নেতৃত্ব দেয়। চলমান পরিস্থিতিতে হেফাজত নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করছে- এবার যে কায়দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হাটহাজারীসহ কয়েকটি জায়গায় তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তা সরকার ভালোভাবে নেয়নি। এসব নৈরাজ্যকর ঘটনার পর হেফাজত সত্যি কোণঠাসা। নানামুখী চাপ ও সংকটে পড়েছে তারা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের নারী কেলেঙ্কারি। এটা সামনে আসার পর সংগঠনও এক ধরনের ইমেজ সংকটে পড়েছে। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে গতকাল নায়েবে আমিরের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ফরায়েজী আন্দোলনের সভাপতি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ হাসান। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হেফাজতের একটি অংশ নীতিনির্ধারণী মহলকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, নরেন্দ্র মোদির সফর ঘিরে যে হামলা-ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনা ঘটেছে, এটা পরিকল্পিত ছিল না। কেউ কেউ ফেসবুক লাইভে এসে গুজব ছড়িয়ে এসব নাশকতা বিস্তৃত করতে ভূমিকা রাখে। তবে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, যদি কর্মী-সমর্থকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকে তাহলে কেন কর্মসূচি ডাকা হবে?

মাঠ প্রশাসনে রদবদল হবে :একাধিক সূত্র জানায়, হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব হয়- এমন কয়েকটি জেলার মাঠ প্রশাসনে পরিবর্তন আসবে। এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারকে সাসপেন্ড ও সুনামগঞ্জের একজন ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি জেলায় শিগগিরই রদবদল আসছে।


মন্তব্য করুন