যদিও বিশ্বজুড়ে বর্তমানে খ্রিষ্টীয় বর্ষকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মানুষ ব্যবহার করে, তবুও প্রতিটি দেশ ও জাতি তাদের নিজস্ব নববর্ষ বরণ করে থাকে। আবহমানকাল ধরে বাংলার লোকসমাজ 'নববর্ষ' উদযাপন করে এসেছে। শুধু বাঙালি জনগোষ্ঠীই নয়, এ উৎসব আমাদের দেশের অনেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত মানুষেরও। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে যেসব পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠী, তারাও চৈত্র মাসের শেষ দু'দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিনটি জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন করে।

বিভিন্ন পার্বত্য সম্প্রদায়ের মধ্যে এ উৎসবটির ভিন্ন ভিন্ন নাম। যেমন- ত্রিপুরা উপজাতিরা বলে 'বৈসুক', মারমারা 'সাংগ্রাই', চাকমারা 'বিজু', তঞ্চ্যঙ্গারা 'বিষু', খিয়াংরা 'সাংলান', ম্রোরা 'সাংক্রান' নামে একে অভিহিত করে থাকে। নামের ভিন্নতা থাকলেও তিনটি দিনকে ঘিরেই উৎসব উদযাপিত হয়। এই একটি উৎসবে সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে থাকে না কোনো ভেদাভেদ ও বৈষম্য।

কিন্তু আমাদের দেশটি যখন 'পাকিস্তান' নামক একটি কৃত্রিম ও জঘন্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তখন সে রাষ্ট্রের শাসকশ্রেণির মানুষ নববর্ষের মতো সব ধর্মনিরপেক্ষ লৌকিক ঐতিহ্যমণ্ডিত উৎসবের মধ্যে হিন্দুয়ানির ভূত দেখতে পায়। নববর্ষ ও ঋতুবরণমূলক উৎসবকে তারা চিহ্নিত করে প্রকৃতি পূজা বলে। তবুও পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিকেই (অর্থাৎ বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে) শহুরে এলিটদের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটে। বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে শহর-নগরের সচেতন শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে বাঙালিত্বের ভূত অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। সেই ভূত থেকেই তাদের ভেতর রবীন্দ্রপ্রীতির নতুনতর উৎসারণ ঘটে, নজরুলের খণ্ডায়ণরোধের তাগিদ দেখা দেয়। এককথায়, বাঙালিত্বের প্রকৃত রূপের প্রতিষ্ঠাদানের লক্ষ্যেই তাদের বোধ পুষ্ট হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে বাঙালিত্বের চেতনার ধারক অনেক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে। এসব সংগঠনের মধ্যে একান্ত উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য নিয়ে দেখা দেয় তদানীন্তন প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার 'ছায়ানট'।

ছায়ানট একটি অসাধারণ ও অবিস্মরণীয় কাজ করেছিল। রমনার বটমূলে যে বছর ছায়ানটের উদ্যোগে নববর্ষ উদযাপনের প্রবর্তন ঘটে, সে বছর থেকেই বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে একটি নবধারা সূচিত হয়ে যায়। এর দৃষ্টান্তে উদ্বুদ্ধ হয় বাংলাদেশের পুরো বাঙালি সমাজ; সারাদেশের প্রতিটি শহরে-বন্দরে উদযাপিত হতে থাকে বাংলা নববর্ষ উৎসব; এবং সে ক্ষেত্রে সর্বত্র ছায়ানটেরই অনুকরণ ও অনুসরণ চলে। এই উৎসবে ধর্মতান্ত্রিকতার কোনো ছায়াপাত নেই, সকল প্রকার ধর্মতন্ত্রী সাম্প্রদায়িক রীতি-নীতির স্পর্শ থেকে মুক্ত এই উৎসব, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সকলে এসে এই উৎসবে মিলিত হয়। এই উৎসবের সূচনামন্ত্র রবীন্দ্রনাথের 'এসো হে বৈশাখ', পুরাতনের হৃদয় টুটে, নতুনকে ফুটিয়ে তোলার আর্তি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে এ উৎসবের গানে, কবিতায় ও নৃত্যে।

মানুষ সাধারণত আলাদা আলাদা বসবাস করলেও প্রকৃত উৎসব একাকিত্ব থেকে, সংকীর্ণতা থেকে, সাম্প্রদায়িকতা থেকে মানুষের উত্তরণ ঘটায় এবং এ রকম উত্তরণ ঘটিয়েই উৎসবের দিনগুলো বছরের অন্যান্য দিনের চেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে ওঠে।

সম্প্রদায়গত ধর্মতন্ত্র-সংশ্নিষ্ট কোনো দিনই যে 'সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র' হওয়ার কিংবা 'সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব' করার মতো মহৎ উৎসবের দিন বলে গণ্য হতে পারে না- এ কথা কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো করেই জানতেন। তা জানতেন বলেই বাঙালির উৎসব তিনি সন্ধান করেছেন ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালিত্বের মর্মস্থলে। বাঙালি সমাজের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বাঙালিত্বকে তারা অধিষ্ঠিত রেখেছে সমস্ত প্রকার ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে, সম্প্রদায় নিরপেক্ষ প্রকৃতি চেতনা ও পরিপার্শ্ব ভাবনা থেকে উৎসারিত হয়েছে তাদের সকল উৎসব। তাদের প্রকৃতি চেতনার পরিপার্শ্ব ভাবনা বিশেষভাবে রূপ পেয়েছে ঋতু পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। কারণ, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত তাদের জীবন ও জীবিকা। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাল রেখে তাদের জীবনাচরণেও পরিবর্তন ঘটাতে হয়। পরিবর্তন ঘটার দিনটিই হয় তাদের ঋতু উৎসবে। এই ঋতু উৎসবের সূচনারূপেই ঘটা করে পালিত হয় নববর্ষ বা বর্ষবরণের উৎসব। শুধু বর্ষবরণ নয়, বর্ষবিদায়ও। চৈত্রসংক্রান্তির বর্ষবিদায়ের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ। বাঙালি সমাজ আবহমানকাল ধরে লৌকিক রীতিতেই বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের উৎসব করে আসছে, এই উৎসবের রীতিপদ্ধতিতে সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।

এ বিষয়টি ধর্মতন্ত্রী সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের ক্রোধের উদ্রেক করে। তারা, অর্থাৎ যারা পাকিস্তানবাদের উত্তরাধিকার স্বাধীন বাংলাদেশেও বহন করছে, দেশটির পাকিস্তানায়ন ঘটানোই তাদের আসল লক্ষ্য। সে লক্ষ্যেই তারা ইতোমধ্যে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তারা দেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ছেঁটে দিতে পেরে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলেছে। এখন পাকিস্তানের মতোই এ দেশটিকে ধর্মতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিণত করতে তারা তৎপর হয়ে উঠেছে। এই তৎপরতা গত কয়েক বছর ধরে বিশেষ প্রবল রূপ ধারণ করেছে। এই কিছুদিন আগেও হেফাজতে ইসলাম নামক সংগঠনটির যে অপতৎপরতা আমরা লক্ষ্য করলাম, তার বিরুদ্ধে এখনই যদি আমরা সম্মিলিতভাবে না দাঁড়াতে পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। সেই অন্ধকারকে প্রতিহত করতেই হবে। ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক শক্তি তথা, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের ধারক সকলকেই একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটা প্রবল সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু করতে হবে। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই ধর্মতন্ত্রী মৌলবাদীদের সকল জারিজুরির অবসান ঘটানো যাবে। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।

করোনার ছোবলে আমরা এবার যার যার ঘরে থেকেই বর্ষবরণ করব- তারপরও আমাদের প্রাণের পহেলা বৈশাখে বরবারের মতো এবারও যার যার অবস্থান থেকেই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসবে প্রাণে প্রাণ মেলাব আমরা। সকলকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।


মন্তব্য করুন