১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল শপথ গ্রহণের পরপরই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনের উদ্যোগ নেয় মুজিবনগর সরকার। নবগঠিত সরকারের উদ্যোগে তখন ১০৭টি দেশে চিঠি পাঠানো হয়। এ দাবি কোনো একটি দল বা গোষ্ঠীর নয়, বরং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি বাঙালির। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন ফ্রন্টেও শুরু হয় নানা উদ্যোগ, যা মুজিবনগর সরকারকেই শক্তিশালী করেছিল। এরই অংশ হিসেবে তাজউদ্দীন\হআহমদের সঙ্গে পরামর্শের পর ২১ এপ্রিল থেকে ন্যাপ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী মুক্তাঞ্চল থেকে জাতিসংঘ, গণচীন, সোভিয়েত রাশিয়াসহ প্রভাবশালী দেশগুলোতে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি তাদের উদ্দেশ্যে পৃথক বিবৃতি দেন।\হএকাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে অধিকাংশ ধর্মভিত্তিক দল ও ধর্মীয় নেতারা পাকিস্তান সরকারের পক্ষালম্বন করে। মওলানা ভাসানী মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বিভিন্ন সময়ে বাঙালির অধিকার রক্ষায়ও সোচ্চার ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রাম যখন তুঙ্গে, তখন ঢাকার পল্টনের জনসভায় ভাষণ দিতে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষ থেকে ৯ মার্চ সকালে ঢাকা এসে পৌঁছান। বঙ্গবন্ধু তাকে টেলিফোন করেন। ফোনে দুই নেতার আলোচনা হয়। এর পর আওয়ামী লীগ ও ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করেন। পল্টন ময়দানের জনসভায় তুমুল করতালির মধ্যে ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী ইয়াহিয়া খানকে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করে নিতে বলেন। তিনি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশমতো ২৫ মার্চের মধ্যে কিছু না করা হলে শেখ মুজিবের সঙ্গে মিলে ১৯৫২ সালের মতো তুমুল গণআন্দোলন শুরু করবেন। মওলানা ভাসানী তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনির মধ্যে আরও বলেন, কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছে, শেখ মুজিবুর রহমান আপস করতে পারেন; কিন্তু শেখ মুজিব অবিশ্বাস করার মতো লোক নন।

মওলানা ভাসানী বলেন, 'তাকে আমি রাজনীতিতে হাতেখড়ি দিয়েছি। আমি আমার রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সংগঠনের সভাপতি হিসেবে ৩১ জন জেনারেল সেক্রেটারির সঙ্গে কাজ করেছি। তাদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানই শ্রেষ্ঠ সেক্রেটারি।'

২৫ মার্চ রাতে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের সন্তোষে তার গৃহে অবস্থান করছিলেন। গণহত্যার খবর ছড়িয়ে পড়লে তিনি টাঙ্গাইল ছেড়ে তার পিতৃভূমি সিরাজগঞ্জে চলে যান। ৪ এপ্রিল পাকিস্তান বাহিনী তার সন্তোষের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। এ খবর পেয়ে মওলানা ভাসানী নৌকাযোগে ভারত সীমানা অভিমুখে রওনা হন। তার সঙ্গে ছিলেন মোজাফ্‌ফর ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলাম। ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর সহযোগিতায় মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলাম এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে (১৫/১৬ এপ্রিল) আসামের ফুলবাড়ীতে গিয়ে পৌঁছান। সেখানে তাদের হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হয়।

মওলানা ভারতে প্রবেশের পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকার কলামজুড়ে ছাপা হয়, 'সীমান্তের এপারে ভাসানীর সজল চোখে সাহায্য প্রার্থনা'। প্রতিবেদনে বলা হয়- 'বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তানি জঙ্গি ফৌজের নির্যাতন বন্ধের জন্য তিনি করজোড়ে ও সজল চোখে ভারত সরকারের কাছে নৈতিক সমর্থন ও সাহায্য প্রার্থনা করেন।' এরপর মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলামকে প্লেনে করে কলকাতায় পাঠানো হলে তারা পার্ক সার্কাসের পার্ক স্ট্রিটের কোহিনূর প্যালেসের পাঁচতলার একটি ফ্ল্যাটে ওঠেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দু'বার কলকাতার কোহিনূর প্যালেসে এসে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন এবং তার পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।\হ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সমর্থন জানানোর আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল উ থান্ট, গণচীনের প্রেসিডেন্ট মাও সে তুং, প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের কাছে তারবার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যে, পূর্ববঙ্গে (বাংলাদেশে) পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপক হারে গণহত্যা চালাচ্ছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন। মাও সে তুং এবং চৌ এন লাই-এর প্রতি তারবার্তায় ভাসানী বলেন, 'সমাজতন্ত্রের আদর্শ হলো নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। ইয়াহিয়ার (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) সামরিক সরকার আপনাদের সরবরাহকৃত আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে নির্দয়ভাবে নিরস্ত্র শ্রমিক কৃষক ছাত্র বুদ্ধিজীবী এবং নারী শিশুদের হত্যা করছে। আপনাদের সরকার এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিকার না করলে গোটা বিশ্ব এ কথাই মনে করবে যে, আপনারা নির্যাতিত জনগণের বন্ধু নন।'

পরদিন ২২ এপ্রিল ভাসানী এক প্রচারপত্রের মাধ্যমে পাকিস্তানের ২৩ বছরে পূর্ব বাংলা ও বাঙালির দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছিলেন। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে ভাসানী বলেন, 'সুতরাং আজিকার স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ কায়েমের যে সংগ্রাম শুরু হয়েছে, তাহা নতুন কিছু নহে। ইহা একাটি জাতির বাঁচা-মরার প্রশ্নে পূর্বস্বীকৃত প্রস্তাব বাস্তবায়নের মহান সংগ্রাম।' ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট লিও পোদগর্নি, প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সি কোসিগিন ও সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল ব্রেজনেভের কাছে বাংলাদেশের জনগণের ওপর পাকিস্তানের বর্বরোচিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। নেতৃবৃন্দের প্রতি তারবার্তায় ভাসানী বলেন, 'মহামতি লেনিনের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত আপনাদের দেশ ও জনগণ সব সময়ই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের নির্যাতিত জনগণের দুর্দিনে বৈষয়িক এবং রাজনৈতিক সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের জনগণের বর্তমান সংগ্রামেও আপনাদের সার্বিক সাহায্য আমরা আশা করি।'\হএকইভাবে মওলানা ভাসানী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জর্জ পম্পিডু, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল যোসেফ টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত, আরব লীগের সেক্রেটারি জেনারেল আবদেল খালেক হাসাওনার ও আরব ঐক্য সংস্থার মহাসচিব দায়লো টেলির কাছেও পৃথক বার্তা পাঠান।\হ৫ মে 'দালাল, বিশ্বাসঘাতক ও মোনাফেক হইতে সাবধান হউন' শিরোনামে এক প্রচারপত্রে মওলানা ভাসানী ইসলামের নামে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামসহ পশ্চিম পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ বিশ্বাসঘাতকদের স্বরূপ তুলে ধরে বলেন, '...নরপশু সৈনিকদিগের ছত্রছায়ায় এই দালালেরা স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করিয়া বিভিন্ন টালবাহানায় পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তানের স্থায়ী শোষণদাসে পরিণত করিতে সুচতুর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছে।' প্রচারপত্রে মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের চার হাজার ইউনিয়নে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার, গ্রামে গ্রামে গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং সেন্টার খোলার, মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বতোভাবে সাহায্য করার এবং মুক্তিযুদ্ধে যুবকদের যোগ দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন।\হ৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, 'বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই।' ৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, 'বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।'\হমুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মওলানা ভাসানী কলকাতা ছাড়াও দেরাদুন, দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে সমস্যা ও সমাধানের উপায় নিয়ে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। জবাবে ইন্দিরা গান্ধী 'উপযুক্ত সময়ের জন্য' অপেক্ষা করতে বলেন। এর পরেও বিভিন্ন সময়ে ভাসানী একই অনুরোধ জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি দিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রমকে আরও সুসংহত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পক্ষে সর্বস্তরের জনগণের জাতীয় ঐক্যকে প্রতিভাত করার জন্য সেপ্টেম্বরে কলকাতায় বাংলাদেশের পাঁচটি দলের নেতাদের সমন্বয়ে 'জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি' গঠন করা হয়। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন মওলানা ভাসানী। উপদেষ্টা কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিংহ, ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফ্‌ফর আহমদ, বাংলাদেশ কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর এবং আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও খন্দকার মোশতাক আহমদ। অবশ্য তাদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমদ স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মদদদাতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন।

মওলানা ভাসানী অধিকাংশ সময় দেরাদুনে বিশ্রামে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে তিনি ভারতে নজরবন্দি ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভারতে অবস্থানকালে মওলানা ভাসানী দু'বার অসুস্থ হন। তখন তাকে দিল্লি অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সে ভর্তি করা হয়েছিল।

দেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি মেঘালয়ের ডালু থেকে নেত্রকোনার হালুয়াঘাট হয়ে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন মওলানা ভাসানী। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক খায়রুজ্জামান চৌধুরী তাকে সীমান্তে অভ্যর্থনা জানান।


মন্তব্য করুন