ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন মনির শিকদার। তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন মিরপুরে। রোববার রাত ৮টায় খুলনার তেরখাদার বাড়িতে মারা যান মনির শিকদারের মা। মায়ের লাশ দেখতে পরিবারের সবাইকে নিয়েই খুলনার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। মায়ের লাশ দেখতে মনিরসহ লাশ হয়েছেন তার স্ত্রী ও দুই কন্যাশিশু। শুধু বেঁচে রয়েছে তাদের একমাত্র মেয়ে আট বছরের মিম। মিম একটি ব্যাগ ধরে পানিতে ভেসে ছিল। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

মায়ের মৃত্যুর খবরে মাকে শেষ বিদায় জানাতে ঢাকা থেকে স্বামী ও শিশুসন্তান নিয়ে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের চরডাঙ্গা গ্রামে যাচ্ছিলেন আদুরি বেগম। স্পিডবোট দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তার স্বামী আরজু সরদার ও দেড় বছর বয়সী ছেলে ইয়ামিনকে। দুর্ঘটনায় জীবিত যে পাঁচজনকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে আদুরি ও মিম রয়েছে। তারা বেঁচে থাকলেও এ দু'জনের পরিবারে আর কেউ রইল না। লাশ দেখতে গিয়ে লাশ হলো এই ছয়টি তাজা প্রাণ।

গতকাল সোমবার বাল্ক্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষে মারা যান খুলনার তেরখাদার মনির শিকদার, তার স্ত্রী হেনা বেগম, শিশুকন্যা সুমি ও রুমি। পাঁচ সদস্যের পরিবারটির একমাত্র সন্তান হিসেবে জীবিত আছে বড় মেয়ে আট বছরের মিম। বাবা-মা, দুই বোনকে হারিয়ে মিমের আশ্রয় হয়েছে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) হেফাজতে। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ি এলাকার বাসিন্দা এক ব্যক্তির কোলে চড়ে মিম আসে দোতার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে। সেখানে রাখা লাশের সারির কাছে নেওয়া হয় তাকে। একে একে বাবা-মা ও দুই বোনের লাশ দেখে অঝোরে কাঁদতে থাকে সে।

তেরখাদা উপজেলা সদরের পারোখালী গ্রামে মনির শিকদারের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে শোকের মাতম। এক শোক কাটিয়ে না উঠতেই আরও ভয়াবহ শোকে মুহ্যমান সবাই। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনির শিকদারের বাবা আলম শিকদার মারা গেছেন আরও আগে। রোববার রাত ৮টায় মা মারা যাওয়ার সংবাদ রাতেই মনিরকে জানানো হয়। সবার সিদ্ধান্ত ছিল সকালে মনির এসে পৌঁছলে মায়ের দাফন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সকাল থেকে মনিরের মোবাইল ফোন থাকায় তারা আর অপেক্ষা করেননি। সকাল ১০টায় মনির শিকদারের মা লাইলী বেগমের দাফন হয়। এর কিছু সময় পরই নৌ দুর্ঘটনার খবর আসতে থাকে। খবর পেয়ে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা কয়েকজন শিবচরে ছুটে যান।

মনির শিকদারের বেয়াই কিসমত হাওলাদার বলেন, চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় মনির শিকদার। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাদের। এখন কী থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছি না।

স্বামী আর সন্তানের সঙ্গে একই স্পিডবোটে ছিলেন আদুরি বেগম। তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন। আহত হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে বাংলাবাজার ঘাটের কাছে দোতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রাখা অন্যান্য লাশের মধ্যে স্বামী আর সন্তানকে খুঁজে পান। আদুরির আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে এখানকার পরিবেশ। আদুরি বেগম জানান, মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ঢাকা থেকে ফরিদপুর গ্রামের বাড়ি ফিরছিলেন তিনি স্বামী ও সন্তানসহ। 'আমার সব শেষ হয়ে গেছে, আমার আর কিছু রইল না' বলে কান্নায় ভে?ঙে প?ড়েন তিনি। আদুরি আরও বলেন, 'শিমুলিয়া ঘাট থাইকা গাদাগাদি কইরা স্পিডবোট ছাড়ে চালক। যাত্রার শুরু থিকাই এলোমেলো স্পিডবোট চালাচ্ছিল। শুরুতে একবার বোটটি উল্টে যাচ্ছিল। চালকের কারণেই আইজ আমার স্বামী-সন্তান হারাইলাম।'

এদিকে পিতা-পুত্রর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো চরডাঙা গ্রামে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ। বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইস্রাফিল মোল্যা বলেন, একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা। আরজু সরদার আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা। সে দুই বিয়ে করলেও প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটি মেয়ে ছিল, সে আগেই মারা গেছে। দ্বিতীয় স্ত্রী আদুরি বেগমের ঘরে ইয়ামিন সরদার নামে একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল। তার সংসারে আদুরি ছাড়া আর কেউ রইল না।

মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া থেকে যাত্রী নিয়ে একটি স্পিডবোট মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাটের দিকে যাচ্ছিল। স্পিডবোটটি পুরোনো কাঁঠালবাড়ি ঘাটের কাছাকাছি আসার পর সেখানে নোঙর করে রাখা বালুবোঝাই বাল্ক্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে স্পিডবোটটি উল্টে গিয়ে ২৬ জনের প্রাণহানি হয়।

মন্তব্য করুন