মায়ের মৃত্যুর খবরে ঢাকার হাসনাবাদের আদুরি বেগম স্বামী-সন্তান নিয়ে যাচ্ছিলেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙা গ্রামের বাড়িতে। পদ্মায় দুর্ঘটনায় স্বামী-সন্তান দু'জনকেই হারিয়েছেন তিনি। ৮ বছরের শিশু মিমের কাহিনি আরও করুণ। দাদির মৃত্যুর খবরে ঢাকা থেকে বাবা-মা ও ছোট দুই বোনের সঙ্গে যাচ্ছিল খুলনার তেরখাদা উপজেলার পরোখালী গ্রামে নিজেদের বাড়িতে। দুর্ঘটনায় পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে মিম। গতকাল সোমবার ভোরে পদ্মায় নোঙর করা বাল্ক্কহেডের সঙ্গে যাত্রীবাহী স্পিডবোটের সংঘর্ষে আদুরি-মিমের পরিবারের ছয়জনসহ নিহত হয়েছেন ২৬ জন। মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৩১ জন যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটটি মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাটে যাচ্ছিল। নিহত ২৬ জনের মধ্যে তিনজন শিশু ও একজন নারী রয়েছেন। এ ছাড়া আহত অবস্থায় উদ্ধার স্পিডবোটের চালকসহ পাঁচজনকে মাদারীপুরের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের অভিযোগ- শুরু থেকেই চালক এলোমেলোভাবে স্পিডবোটটি চালাচ্ছিলেন। তার খামখেয়ালিপনার কারণেই এত প্রাণ ঝরে গেল!

এ ছাড়া লকডাউনের বিধিনিষেধের মধ্যে স্পিডবোট চললেও যাত্রীদের কারও গায়ে ছিল না লাইফ জ্যাকেট। এ ঘটনায় ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসন।

নৌপুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল ভোর প্রায় ৬টার দিকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে যাত্রীবাহী একটি স্পিডবোট ৩১ জন যাত্রী নিয়ে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ঘাটের উদ্দেশে রওনা দেয়। স্পিডবোটটি শিবচর কাঁঠালবাড়ী (পুরাতন ফেরিঘাট) ঘাটের কাছে এলে পদ্মা নদীতে নোঙর করে রাখা একটি বাল্ক্কহেডের (বালুবাহী কার্গো) পেছনে সজোরে ধাক্কা লেগে উল্টে দুমড়েমুচড়ে যায়। খবর পেয়ে নৌপুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। পরে কোস্টগার্ড এসে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিন শিশু, এক নারীসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

লাশগুলো উদ্ধার করে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দোতরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়। সন্ধ্যার আগেই মৃতদেহ শনাক্ত করে একে একে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানানা শিবচর থানার ওসি মিরাহ হোসেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ দাফনের জন্য প্রত্যেক পরিবারকে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন- বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানীয়া ইউনিয়নের পূর্বষট্টি গ্রামের সাদেক ব্যাপারীর ছেলে রিয়াজ হোসেন (৩০) ও সাইফুল হোসেন (২৮), উপজেলার আশা এলাকার রত্তু হোসেনের ছেলে সাইদুল হোসেন (২৭), পাতারহাট বন্দর এলাকার মনির চাপরাশী (৩৫), বন্দর থানার তেদুরিয়া এলাকার আলী আহমেদের ছেলে আনোয়ার চৌকিদার (৫০), বানারীপাড়া উপজেলার হাশেম ব্যাপারীর ছেলে আলাউদ্দিন ব্যাপারী (৪৫), খুলনার তেরখাদা উপজেলা সদরের পরোখালী গ্রামের মৃত আলম মিয়ার ছেলে মনির শিকদার (৩৮), তার স্ত্রী হেনা বেগম (৩৬), তাদের দুই কন্যা সুমি আক্তার (৫) ও রুমি আক্তার (৩); ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মাইগ্রো গ্রামের মৃত পান্নু মিয়ার ছেলে আরজু সরদার (৪০), তার দেড় বছর বয়সী ছেলে ইয়ামিন, মাদারীপুরের রাজৈরের শঙ্কারদি এলাকার তারা মীরের ছেলে তাহের মীর (৪২); কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার মাইখারকান্দি এলাকার মৃত আব্দুল হাশেমের ছেলে কাওসার হোসেন (৪০), একই এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে রুহুল আমিন (৩৫), তিতাস উপজেলার ইসুবপুর এলাকার মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে জিয়াউর রহমান (২৮); চাঁদপুরের উত্তর মতলবের মোহনপুর এলাকার মৃত আলী হোসেন ব্যাপারীর ছেলে দেলোয়ার হোসেন (৪৫), মুন্সীগঞ্জের সাতপাড় এলাকার চান মিয়া শেখের ছেলে সাগর শেখ (৪০), পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার পসারিয়াবুনিয়া এলাকার রঞ্জন অধিকারীর ছেলে জনি অধিকারী (২৬), সদর উপজেলার চরখানা এলাকার মো. ওহিদুরের ছেলে মো. বাপ্পি (২৮); মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মৌলতীকান্দি এলাকার আজিত মোল্লার ছেলে আলম মোল্লা (৩৮), একই উপজেলার গুয়াতলা এলাকার আদম আলী মোল্লার ছেলে শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), সদর উপজেলার শ্রীনদী এলাকার আব্দুল মান্নান মোল্লার ছেলে মাওলানা আব্দুল আহমদ মোল্লা (৩৫); ঢাকার পীরেরবাগের নুরে আলমের ছেলে খোরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার রাজাবাড়িয়া এলাকার মৃত আব্দুল কুদ্দুস শিকদারের ছেলে এসএম নাসিরউদ্দিন (৪৫), নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার রাজাপুর এলাকার হাফিজুর রহমানের ছেলে জুবায়ের মোল্লা (৩৫)।

দুপুরে ঢাকা থেকে বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

বেপরোয়া গতির করণে তীরে নোঙর করা বালুবোঝাই বাল্ক্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে বেঁচে যাওয়া যাত্রী আদুরি বেগমের অভিযোগ। স্বামী-সন্তান হারানো এই নারী বলেন, শুরু থেকেই চালক এলোমেলোভাবে স্পিডবোটটি চালাচ্ছিলেন। পারভিন নামে স্থানীয় এক নারী বলেন, 'এই লকডাউনের মধ্যে কেমনে স্পিডবোট চালু হয়েছে! অবশ্যই ওপারের পুলিশ টাকা খেয়ে স্পিডবোট ছাড়তে সুযোগ দিয়েছে। তাই আজ এতগুলো প্রাণ গেল।' দেলোয়ার হোসেন নামে আরেকজন বলেন, 'আমি বাড়ির জন্য নদী থেকে পানি নিতে এসে দেখি এ অবস্থা। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আমিও উদ্ধারকাজে নেমে পড়ি। সে কী মর্মান্তিক দৃশ্য!'

বিধিনিষেধ উপেক্ষা, ছিল না লাইফ জ্যাকেট :চলমান লকডাউনে গণপরিবহনের সঙ্গে এই নৌরুটে গত ৫ এপ্রিল থেকে লঞ্চ ও স্পিডবোট বন্ধ রয়েছে। কিন্তু সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ২৭ এপ্রিল থেকে নৌরুটে চলাচল শুরু করছে স্পিডবোট। দ্বিগুণ ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের পারাপার করা হচ্ছে। ফেরিতে উঠতে ব্যর্থ এবং দ্রুত যাওয়ার তাড়া থেকে যাত্রীরা স্পিডবোটে বাড়তি ভাড়া দিয়েই পারাপার হচ্ছেন। গতকাল সকালে দুর্ঘটনাকবলিত স্পিডবোটের যাত্রীদের কেউই লাইফ জ্যাকেট পরিহিত ছিলেন না। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া মাওয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের কমান্ডার ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জীবিত উদ্ধার ও নিহতদের কারও গায়ে লাইফ জ্যাকেট পাওয়া যায়নি।

মুন্সীগঞ্জের মাওয়া নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবির বলেন, ঘাটে যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। এরই মধ্যে কিছু কিছু স্পিডবোট ঘাটের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী পারাপার করছে। আমরা সেখানে গেলেই তারা দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করে। তবে আমরা চেষ্টা করছি যাতে অবৈধভাবে স্পিডবোট যাত্রী পার না করতে পারে। তিনি আরও বলেন, লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ থাকার নির্দেশনা রয়েছে। সে নিয়ম উপেক্ষা করে অবৈধভাবে স্পিডবোটটি চলছিল। এটি কখন, কোন স্থান থেকে ছেড়ে গেছে তা জানা যায়নি।

ব্যাগ ধরে ভেসে ছিল ছোট্ট মিম :বাবা-মা ও দুই বোনকে হারিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে রয়েছে শিশু মিম। উদ্ধারের পর তাকে শিবচরের পাঁচ্চর রয়েল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। মিমকে উদ্ধারকারী নৌপুলিশের কনস্টেবল মেহেদী বলেন, 'শিশুটিকে নদীতে ব্যাগ ধরে ভাসতে দেখি। হাত ও চোখের কাছে আঘাতের সামান্য চিহ্ন ছিল। দ্রুত তাকে পাঁচ্চর রয়েল হাসপাতালে পাঠানো হয়। শিশুটির পরিবারের সব সদস্যই মারা গেছেন।'

মেহেদির রং মোছেনি সাইফুলের :মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করেছিলেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানীয়া বন্দরের ব্যবসায়ী সাইফুল হোসেন। হাতের মেহেদির রং মুছে যাওয়ার আগেই মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনায় জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে তার। গতকালের দুর্ঘটনায় সাইফুল ও তার ভাই রিয়াজ হোসেন নিহত হয়েছেন। এ উপজেলার আরও দুই ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। ঈদ উপলক্ষে দোকানের মালপত্র কিনতে তারা ঢাকায় গিয়েছিলেন। নিহত অপর দুই ব্যবসায়ী হলেন উলানীয়া বন্দরের বোরকা ব্যবসায়ী সাইদুল ইসলাম ও পাতারহাট বন্দরের মুদি ব্যবসায়ী মনির চাপরাশী।

স্পিডবোটের চালক আটক :দুর্ঘটনায় আহত ৫ জনকে শিবচর উপজেলা স্ব্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের একজন ওই স্পিডবোটের চালক শাহ আলম। তাকে আটক করেছে পুলিশ। শিবচর থানার ওসি মিরাজ হোসেন জানিয়েছেন, স্পিডবোটের চালক গুরুতর আহত। তাকে পুলিশের নজরদারিতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুরের বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। তার পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ। তিনি কিছুই বলতে পারছেন না। মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন।

ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি :স্পিডবোট দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক আজহারুল ইসলামকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), একজন পুলিশ সদস্য, ফায়ার সার্ভিসের একজন সদস্য, বিআইডব্লিউটিসি ও বিআইডব্লিউটিএর একজন করে প্রতিনিধি। তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য করুন