বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করছে পরিবার। এ জন্য বিমান ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক কাজ দ্রুত শেষ করছেন তারা। পরিবারের সদস্যরা তাকে যুক্তরাজ্যে নেওয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন। সরকারের অনুমতি পেলেই আজ-কালের মধ্যেই তাকে বিদেশে নেওয়া হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

তবে তার পাসপোর্টের মেয়াদ নেই। অন্তত দুই বছর আগে তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর গতকাল বৃহস্পতিবার এ নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়।

খালেদা জিয়াকে সুচিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। কভিড সংক্রমণ-পরবর্তী জটিলতাসহ নানা সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় 'মানবিক' কারণে তিনি এ আহ্বান জানান। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে

করোনাভাইরাস সংক্রমণে মৃত দলীয় নেতাকর্মীদের পরিবারকে ঈদ উপহার প্রদান উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব বলেন। বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ঢাকা মহানগর বিএনপির ১০ জন নেতাকর্মীর পরিবারকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঈদের উপহার তুলে দেন বিএনপি মহাসচিব।

খালেদা জিয়া কখন যাবেন, প্রস্তুতি চলছে কিনা এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল সমকালকে বলেন, চেয়ারপারসনের বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি তার পরিবার দেখছে।

গতকাল দুপুরে বিএনপি নেত্রীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে বৈঠক করেন চিকিৎসকরা। সেখানে উপস্থিত একজন চিকিৎসক সমকালকে জানান, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থাকে ভালো বলা যাচ্ছে না। আগে প্রতিদিন তার দুই লিটার অক্সিজেন লাগত, এখন লাগছে তিন লিটার পর্যন্ত। কখনও কখনও চার লিটার পর্যন্ত লেগে যাচ্ছে। তার এক্স-রে রিপোর্টও ভালো আসেনি। এ ছাড়া অন্যান্য রিপোর্টও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সেসব রিপোর্টও খুব বেশি ভালো নয়। ডায়াবেটিস এখনও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় আছে।

খালেদা জিয়ার করোনা নেগেটিভ এসেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণত করোনা রোগীর ১৪ দিন অতিক্রম হলে তার রিপোর্টকে নেগেটিভ ধরা হয়। কিন্তু খালেদা জিয়া এখন কভিড-পরবর্তী জটিলতায় বেশি ভুগছেন।

বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার এখন শারীরিক যে অবস্থা আছে, তাতে তারা বেশি জার্নি না করার জন্য সুপারিশ করেছেন। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে মেডিকেল টিমের কোনো চিকিৎককে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, সাধারণত যে দেশের হাসপাতালে রোগী নেওয়া হয়, সেখানকার চিকিৎসক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরও খালেদা জিয়ার সঙ্গে মেডিকেল বোর্ডের সর্বোচ্চ একজন চিকিৎসক যেতে পারেন বলে তিনি মনে করছেন।

বিএনপি দলীয় সূত্র জানিয়েছে, খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে দলীয়ভাবে বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করার জন্য কয়েকজন নেতাকে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিমান ভাড়া থেকে শুরু করে চিকিৎসার অন্যান্য বিষয়ে পরিবারকে সাহায্য করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা রয়েছে।

বিএনপি নেত্রীর বিদেশে চিকিৎসার জন্য পরিবারের আবেদনের বিষয়ে সরকার ইতিবাচক বলে জানা গেছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে আবেদন পর্যালোচনা করে 'যত দ্রুত সম্ভব' স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মতামত পাঠানো হবে।

এর আগে দুপুরে গুলশানে ব্যক্তিগত কার্যালয়ে সাংবাদিকদের আইনমন্ত্রী বলেন, আবেদনের বিষয়ে শিগগিরই আমাদের মতামত দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব। খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে শর্ত শিথিলের সুযোগ আছে কিনা, তা পর্যালোচনা করা হবে। সে ক্ষেত্রে দু-একদিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে সূত্রে জানা গেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার লিখিত আবেদনটি তার ভাই শামীম এস্কান্দার বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে যান। পরে রাতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আবেদনটি মতামতের জন্য আইন সচিবের কাছে পাঠানো হয়। সচিবালয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে গতকাল বিকেলে গুলশানে আইনমন্ত্রীর কার্যালয়ে আবেদনটি নিয়ে আসেন আইন সচিব গোলাম সারোয়ার।

সাংবাদিকদের আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাহী আদেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারায় খালেদা জিয়ার সাজা ও দণ্ডাদেশ স্থগিত করা হয়েছিল। এখানে দুটি নির্দিষ্ট শর্ত দেওয়া ছিল। সেই শর্তে বলা হয়েছিল, মুক্ত থাকার সময়ে তাকে ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। শর্তগুলো মেনে তারা স্থগিতাদেশ গ্রহণ করেছিলেন এবং খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেছিলেন। এখন আদালতের কিছু করার নেই। এখন দেখতে হবে ৪০১ ধারায় যখন আমরা কার্যসম্পাদন করে দিয়েছি; সেক্ষেত্রে এ শর্তগুলো শিথিল করার কোনো সুযোগ আছে কিনা। আবেদন পর্যালোচনা করে মতামত দেওয়া হবে।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতা বাকি। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়াকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হতে পারে। ইতোমধ্যে তাকে লন্ডনে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। সরকারের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর সকালে খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট নবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেন শামীম এস্কান্দার। আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট নবায়নের জন্য জমা দিয়ে আসেন তিনি। রাতে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা পাসপোর্ট নিতে যোগাযোগ করেন। পাসপোর্ট পাওয়ার পর ভিসার জন্য যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনে জমা দেওয়া হবে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে চিকিৎসক এবং তার পরিবারের সদস্যদেরও ভিসার জন্যও পাসপোর্ট জমা দেওয়া হবে। খালেদা জিয়াকে যুক্তরাজ্যে নেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হয়েছে।

এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলার জন্য এবং শারীরিক খোঁজ নেওয়ার জন্য গতকাল দুপুরে মির্জা ফখরুল হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। আবার রাতেও তিনি ও দলের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক হাসপাতালে গিয়ে খালেদা জিয়ার খোঁজখবর নেন।

গত ১১ এপ্রিল খালেদা জিয়ার করোনা শনাক্ত হয়। এরপর ২৭ এপ্রিল রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত ৩ মে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াতে দৌড়ঝাঁপ :গতকাল খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। এ দিনই পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াতে (রি-ইস্যু) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। ব্যাংকেও ফি জমা দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপি সূত্রে তথ্য মিলেছে।

ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক (পাসপোর্ট ও ভিসা) সাইদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গতকাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার পাসপোর্টের আবেদন অধিদপ্তরে পৌঁছেনি। আবেদন পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা এমআরপির আবেদন জমা নেওয়া বন্ধ রয়েছে। ই-পাসপোর্ট আবেদন জমা নেওয়া ও বিতরণ করা হচ্ছে। তবে ই-পাসপোর্ট পাওয়া প্রক্রিয়াগত কারণেই সময়সাপেক্ষ। বিশেষ ধরনের এই পাসপোর্টে আবেদনকারীর ১০ আঙুলের ছাপ এবং চোখের মণির ছাপ নেওয়া হয়। খালেদা জিয়া করোনা আক্রান্ত হওয়ায় এসব কার্যক্রমও শেষ করা সম্ভব হবে না। এ জন্য তাকে এমআরপি নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে তার পাসপোর্ট অফিসে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অপর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার পক্ষে তার পরিবারের কেউ পাসপোর্টের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও সেটি যাচাই-বাছাই শেষে নিয়ম অনুযায়ী অধিদপ্তরে জমা হবে। এমআরপি বন্ধ থাকার পরও এই পাসপোর্টের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদন লাগবে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, তা ছাড়া খালেদা জিয়া সরকারের নির্বাহী আদেশে জামিনে থাকায় তার পাসপোর্ট আবেদন গ্রহণের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়েরও অনুমোদন নিতে হতে পারে। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে হয়তো আবেদন গ্রহণের এক থেকে দু'দিনের মধ্যেই রি-ইস্যু পাসপোর্ট দেওয়া সম্ভব হবে।

দোয়া-প্রার্থনা আজ :বিএনপি চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনায় আজ শুক্রবার বাদ জুমা সারাদেশে মসজিদে দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন উপাসনালয়ে প্রার্থনা করা হবে। এ বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, শুক্রবার পবিত্র জামাতুল বিদা। এদিন সারাদেশে সব মসজিদ, অন্যান্য ধর্মের বিভিন্ন প্রার্থনালয়ে এবং দলের সব ইউনিটে খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তির জন্য দোয়া করা হবে। সব ইউনিটের নেতাকর্মীদের প্রতি অনুরোধ করছি- জনগণকে সঙ্গে নিয়ে খালেদা জিয়ার রোগমুক্তির জন্য দোয়া চাইবেন।

মন্তব্য করুন