করোনা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্ত বন্ধ রয়েছে। তবে যারা এরই মধ্যে চিকিৎসার জন্য গিয়ে আটকা পড়েছেন বা ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে আসছে, তারা বেনাপোল, আখাউড়া ও বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরতে পারছেন। নিয়ম অনুযায়ী ভারতফেরতদের ১৪ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু যে তিন স্থলবন্দর দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন, সেখানে কোয়ারেন্টাইন সুবিধা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে কাউকে কোয়ারেন্টাইন করতে স্থানীয় প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। ওই তিন সীমান্ত এলাকার জেলা-উপজেলায় প্রয়োজনের তুলনায় আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য স্থাপনা অপ্রতুল হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ভারতফেরতদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে বিকল্প জায়গা খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা। সীমান্ত ছাড়াও অন্য এলাকায়ও কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলছেন সংশ্নিষ্টরা। দেশে করোনার ভারতীয় ধরন শনাক্তের পর এদিকে আরও নজর দেওয়ার ব্যাপারে গুরুত্ব দেন তারা।

সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি লোক দেশে প্রবেশ করতেন। গত ২৬ এপ্রিল থেকে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ওই স্থলবন্দর দিয়ে দুই হাজার ৫৬৪ জন দেশে ফিরেছেন। তাদের মধ্যে ১২ জন করোনায় সংক্রমিত হয়ে ভারত থেকে দেশে ফেরেন।

সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, প্রথমে ভারত থেকে বেনাপোল দিয়ে সবচেয়ে বেশি লোক দেশে প্রবেশ করতেন। সেখানে কোয়ারেন্টাইনের জন্য যেসব জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছে, তা এখন প্রায় পরিপূর্ণ। এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া দিয়ে ভারতফেরতদের দেশে প্রবেশের ওপর জোর দেওয়া হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২৬ মার্চ থেকে ৭ মে পর্যন্ত আখাউড়া হয়ে ২৬৯ জন বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন। তাদের অধিকাংশই চিকিৎসার জন্য ভারতে গিয়েছিলেন। ফেরত আসাদের তালিকায় শিক্ষার্থীও রয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১২টি হোটেল, একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আর আরেকটি বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে ৩০০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে যত লোক প্রতিদিন ওই সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করছেন তাতে সেখানে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার ব্যবস্থা থাকবে না।

আখাউড়ার ওপাশে ভারতের আগরতলা। আগরতলায় বিমানবন্দর রয়েছে। ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা বিভিন্ন রাজ্য থেকে বিমান এসে আগরতলা বিমানবন্দরে নামেন। এরপর তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বর্তমানে ভারতফেরতদের পাসপোর্ট স্থলবন্দরে জমা রাখা হয়। ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে তা ফেরত পান তারা।

জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় আবাসিক হোটেল ও অন্যান্য স্থাপনায় কোয়ারেন্টাইন সুবিধা নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। বিদেশফেরতরা নিজ খরচে সেখানে থাকবেন। তবে কোয়ারেন্টাইনে থাকা অনেকে অর্থ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরতে চাচ্ছেন।

জানা গেছে, আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ২৬ এপ্রিলের পর থেকে প্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিক ২৫৫ জন। তাদের মধ্যে হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ১৪৫ জন। বাকিরা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, কোয়ারেন্টাইনের জন্য যেসব জায়গা ঠিক করা হয়েছিল তা প্রায় পরিপূর্ণ। নতুনভাবে আরও ঢুকলে এখানে রাখা কষ্টসাধ্য হবে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সঠিকভাবে কোয়ারেন্টাইন শেষ না করে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গত শুক্রবার ভারত থেকে ফেরত আসা ২০ জনের একটি দলকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। তাদের মধ্যে ৭ জন চিকিৎসার জন্য ভারত যান। বাকিরা রোগীদের সহায়তার জন্য সঙ্গে গিয়েছিলেন।

যশোরের পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ার্দার সমকালকে বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় যশোর ছাড়াও নড়াইল, মাগুরা, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় ভারতফেরতদের কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম হুমায়ূন কবির সমকালকে বলেন, ভারতফেরত ২০ জনকে হাসপাতালে কোয়েরেন্টাইনে রাখা হয়। শুনেছি তাদের মধ্যে কেউ বেনাপোল দিয়ে দেশে ঢুকেছে। সবার করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল এলেও ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে পুলিশ-র‌্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর বলেন, কীভাবে তারা বেনাপোল থেকে চট্টগ্রামে এলো এটা জানা নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখছে।

গত ২৬ এপ্রিল থেকে স্থলসীমান্ত হয়ে ভারত থেকে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। শনিবার দেশটির সঙ্গে স্থলসীমান্ত বন্ধের মেয়াদ আরও ১৪ দিন বাড়ানো হয়েছে। এখন ৯ মে পর্যন্ত সব স্থলসীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে বাংলাদেশের যে নাগরিকরা চিকিৎসার জন্য ভারতে গেছেন এবং যাদের ভিসার মেয়াদ ১৫ দিনের কম তারা শুধু বেনাপোল, আখাউড়া ও বুড়িমারী সীমান্ত দিয়ে দেশে ফিরতে পারবেন। ভিসার মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে দেশে ফিরতে আগ্রহী বাংলাদেশের নাগরিকদের দিল্লি, কলকাতা ও আগরতলার বাংলাদেশ মিশনের অনাপত্তিপত্র নিতে হয়। কোয়ারেন্টাইন সুবিধা সীমিত হয়ে পড়ায় ঈদের ছুটির আগে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন অনাপত্তিপত্র দেওয়ার বিষয়ে কিছুটা কড়াকড়ি মেনে চলবে বলে জানা গেছে।

মন্তব্য করুন