যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের ভয় ছিল, শেষ পর্যন্ত সেটাই ঘটে গেল। ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভিড় সামলানো গেল না। গত বছর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ বাড়ি ফিরেছিলেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের লাগাম টানতে ঈদের ছুটি কমিয়ে, দূরপাল্লার পরিবহন বাস, লঞ্চ ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রেখে মানুষের গ্রামে যাওয়া আটকে দেওয়ার যে পরিকল্পনা সরকার করেছিল, তা কার্যত ভেঙে পড়েছে। বিকল্প পথে হাজার হাজার মানুষ গ্রামে ছুটছেন। পাশাপাশি ঈদের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শপিংমল ও বিপণিবিতানে দেখা যাচ্ছে উপচেপড়া ভিড়।

এর মধ্যেই গতকাল শনিবার দেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন শনাক্তের খবর এসেছে। যে ধরনটিতে ভারত এখন প্রায় বিধ্বস্ত। মৃত্যু ও সংক্রমণ ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে চলেছে। ভারতের এই ভয়ংকর বিপদ বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাড়ি ফেরা মানুষের সঙ্গে দেশব্যাপী ভারতীয় ধরনটি ছড়িয়ে পড়লে তা হবে ভয়াবহ; আসবে ভয়ংকর বিপদ।

আগামী দু-তিন দিনে ভিড় আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে গতকাল আটজনের শরীরে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন শনাক্ত হয়েছে। সেক্ষেত্রে আগামী জুন মাসে তৃতীয় ধাপের সংক্রমণ শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আগামী জুনে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে পারে। তিনি বলেন, সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়লে আবার সরকারকে দোষারোপ করা হবে।

মন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন দেশেও শনাক্ত হয়েছে। প্রতিবেশী দেশটির সংক্রমণ ও মৃত্যুর অবস্থা আমরা অবগত। তেমন অবস্থা সৃষ্টি হলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

তবে মানুষের বাড়ি ফেরা ঠেকাতে সরকারি পদক্ষেপ যথাযথ ছিল না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, সরকারি পদক্ষেপ একটি অন্যটির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ রেখে আন্তঃজেলা গণপরিবহন চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার অন্যান্য পরিবহনের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। এতে করে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও পিকআপ ভ্যানে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ মিলছে। আন্তঃজেলা পরিবহন চালু থাকায় অনেকে ভেঙে ভেঙে ওই গণপরিবহনে করে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। এতে করে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনস্বাস্থ্যবিদদের পরামর্শ মানা হয়নি। অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা থেকে যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তাতে সংক্রমণ ও মৃত্যু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন: করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রথমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে গত ৫ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে বিধিনিষেধ আরোপ করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিন থেকেই কার্যত তা ভেঙে পড়ে। মানুষের দাবির মুখে একে একে দোকানপাট ও শপিংমল খুলে দেওয়া হয়। চালু করা হয় গণপরিবহনও। পরে ১৪ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত সবকিছু বন্ধ করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২১ এপ্রিল থেকে পরবর্তী সাত দিন আবারও একই বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে সংক্রমণ ও মৃত্যু কিছুটা কমে আসে। ঈদ সামনে রেখে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দোকানপাট ও শপিংমল খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সেগুলো খুলে দেয়। ২৮ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত আরও কিছু শর্ত শিথিল করে বিধিনিষেধের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। আগামী ১৬ মে পর্যন্ত চলমান বিধিনিষেধের সময়সীমা বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। গ্রামে ফেরা ঠেকাতে ঈদের ছুটিতে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের নিজ কর্মস্থল সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাবির মুখে সরকার আন্তঃজেলায় পরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয়। তবে দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখা হয়। লঞ্চ ও ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু মানুষের বাড়ি ফেরা আটকানো যায়নি। বাড়তি ভাড়া দিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরী থেকে তারা চলাচল করছে। ঈদ সামনে রেখে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়তে পারেন- এমন আশঙ্কা ছিল সরকারের হাইকমান্ডের। সে কারণে গতকাল থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। শুক্রবার রাতে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে গতকাল মাওয়া, পাটুরিয়া ও দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ভিড় করে হাজার হাজার ঘরমুখো মানুষ। জনচাপে শেষ পর্যন্ত ফেরি চলাচলে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এতে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারি পদক্ষেপ যথাযথ হয়নি- মত বিশেষজ্ঞদের: মানুষের গ্রামে ফেরা ঠেকাতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ যথাযথ হয়নি বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি সমকালকে বলেন, কিছু চালু কিছু বন্ধ রেখে লকডাউন কিংবা বিধিনিষেধ আরোপ করলে তা কার্যকর করা সম্ভব হয় না। দূরপাল্লার গণপরিবহন, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ রেখে আন্তঃজেলা পরিবহন চালু করা হলো। এতে মানুষ ভেঙে ভেঙে গন্তব্যে পৌঁছানোর সুযোগ পাচ্ছেন। আবার প্রাইভেটকার, পিকআপ, মাইক্রোবাস চলাচলে কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি। মানুষকে ঢাকাসহ বিভিন্ন নগরীতে আটকে রাখতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা রাখলে এভাবে তারা যেতে পারতেন না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সমকালকে বলেন, আন্তঃজেলা পরিবহন চালু রাখার কারণে গতকাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরমুখো মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে দুই ফেরিঘাটে। আগের রাতে বলা হলো, ফেরি বন্ধ থাকবে। কিন্তু মানুষকে ফেরিঘাটে পৌঁছানোর আগে কোনোরকম বাধা দেওয়া হয়নি। এতে বিশৃঙ্খলা হয়েছে। মানুষ গাদাগাদি করে ফেরি পারাপার হয়েছে। এটি আতঙ্কের। গাদাগাদি করে বিকল্পভাবে মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও পিকআপে করে বাড়ি ফিরছে তারা। এর চেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা চালু থাকলে ভিড় কম হতো। অর্ধেক যাত্রী নিয়ে দূরপাল্লার পরিবহন চললে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। এতে সংক্রমণ ঝুঁকিও কমে আসত।

বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব সমকালকে বলেন, সরকারি পদক্ষেপ হাস্যকর। আগের রাতে ফেরি চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হলো। ওই ঘোষণা না জেনে হাজার হাজার মানুষ ফেরিঘাটে ভিড় করল। কয়েক ঘণ্টা আটকে থাকার পর জোরাজুরি করে ফেরিতে উঠল। অর্থাৎ জনচাপে সরকারি নির্দেশনা প্রত্যাহার করা হলো। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষকে না হয় ফেরি বন্ধ করে আটকানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের ঘরে ফেরা কি আটকানো গেছে? আগামী জুনে এই ঈদযাত্রার প্রভাব পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতায় সতর্ক করে আসছিলাম; কিন্তু মানুষ তা আমলে নেয়নি। রাজধানীর প্রতিটি শপিংমলে উপচেপড়া ভিড়। কোনো স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। শপিংমল ও দোকানপাট বন্ধ রাখলে তা খুলে দেওয়ার জন্য আন্দোলন করা হয়। খুলে দেওয়ার পর সংক্রমণ বাড়লে তখন আবার সরকারের সমালোচনা করা হয়। ঈদে বাড়ি না ফিরে যার যার স্থানে থাকতে বলা হলেও কেউ শুনছে না। ফেরি আটকানো হলো; কিন্তু আন্দোলন করে ফেরি চালু করা হলো।

মন্তব্য করুন