সড়ক ও ফেরিঘাটে বিজিবি-পুলিশের কড়া পাহারা। বসেছে ভ্রাম্যমাণ আদালতও। তবু ঠেকানো যাচ্ছে না গ্রামমুখো জনস্রোত। করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়েই যে যেভাবে পারছেন, শহর ছাড়ছেন। দূরপাল্লা ও আন্তঃজেলার বাস বন্ধ থাকলেও আগের দিনগুলোর মতো গতকাল রোববারও প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অটোরিকশায় গাদাগাদি করে লাখো মানুষ রাজধানী ছেড়েছেন।

করোনা সংক্রমণ রোধে প্রায় এক মাস গণপরিবহন বন্ধ রাখার পর গত বৃহস্পতিবার থেকে 'জনস্বার্থে' জেলার অভ্যন্তরে গণপরিবহন চালুর অনুমতি দেয় সরকার। সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে গ্রামমুখো মানুষের ঢল। এভাবে গাদাগাদি করে গ্রামে গিয়ে প্রিয়জনকে ঝুঁকিতে না ফেলতে রোববারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

গতকাল রাজধানীর গাবতলী ও আবদুল্লাহপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কোনো আহ্বান বা নিবেদন কাজে আসছে না। দুপুরে আবদুল্লাহপুরের আরএসআর সিএনজি রিফুয়েলিং সেন্টারের সামনে দেখা যায়, শখানেক প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস যাত্রীর অপেক্ষায় রয়েছেন। প্রাইভেটকারে তিন থেকে চারজন এবং মাইক্রোবাসে ১০ থেকে ১৫ জন করে যাত্রী যাচ্ছেন ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর ও নেত্রকোনার দিকে।

মো. মানিক নামের একজন মাইক্রোচালক জানান, যাত্রীপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়ায় ময়মনসিংহ, ৭০০ টাকায় শেরপুর যাচ্ছেন। যাত্রীর খুব একটা অভাব হচ্ছে না। কয়েকজন মিলে তার ১২ আসনের গাড়ি 'রিজার্ভ' করে যাচ্ছেন। শুক্র ও শনিবারও এভাবে ময়মনসিংহ গিয়েছেন।

বায়িং হাউসের কর্মকর্তা তানভীর মাহমুদ জানান, রমজানে প্রতি শুক্রবার অফিস করেছেন। রোববার থেকে অফিস বন্ধ। খুলবে আগামী রোববার। তার স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবা ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় থাকেন। ঢাকায় অফিসেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাড়ি যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। তাই যেতেই হচ্ছে তাকে। পরিচিত আরও কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং আবদুল্লাহপুর এসে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে ছয় হাজার টাকায় মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে বাড়ি যাচ্ছেন।

ময়মনসিংহের ত্রিশালের রেজাউল ইসলাম জানান, ছয় হাজার টাকায় প্রাইভেটকার শেরপুর পর্যন্ত রিজার্ভ করে বাড়ি যাচ্ছেন। পথে তিনি ত্রিশালে নেমে যাবেন। বিমান, প্রাইভেটকার চালু রেখে দূরপাল্লার বাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ তিনি। রেজাউল ইসলাম বলেন, বড়লোক ঈদে গ্রামে যাবে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করবে। মধ্যবিত্ত, গরিবের জন্য কেন গ্রামে যেতে বাধা! বড়লোকের মাধ্যমে কি করোনা ছড়ায় না। করোনা হলেও কিছু করার নেই। বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে ঈদ করতে পারবেন- এটাই শান্তি।

ঢাকা থেকে বাস ও অন্যান্য গণপরিবহন যেন বের হতে না পারে, সে জন্য টঙ্গী সেতুতে পাহারা বসিয়েছে পুলিশ। তবে তাদের সামনে দিয়েই প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছে। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা জানান, প্রাইভেট গাড়ি আটকানোর নির্দেশ নেই। তাই বাধা দেওয়া হচ্ছে না। ট্রাফিক পরিদর্শক ইসমাইল আলী বলেন, বাস, অটোরিকশা, ট্যাক্সি এলে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এক জেলা থেকে আরেক জেলায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস চলার অনুমতি থাকলেও 'মুভমেন্ট পাস' নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে টঙ্গীর কলেজ রোড পর্যন্ত ঘুরে ঢাকা জেলা থেকে আসা কোনো গাড়িকে মুভমেন্ট পাসের জন্য পুলিশ চেকপোস্টে থামাতে দেখা যায়নি। উল্টো অভিযোগ এসেছে, মহাসড়কে কিছু কিছু জায়গায় মুভমেন্ট পাস না থাকলে গাড়ি আটকে টাকা আদায় করে ছেড়ে দিচ্ছে পুলিশ। মুভমেন্ট পাস থাকলেও টাকা নিচ্ছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। তবে সমকাল এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে পারেনি।

গ্রামমুখো জনস্রোত ঠেকাতে গার্মেন্ট কলকারখানায় ঈদে তিন দিনের বেশি ছুটি না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান গতকালও এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন মালিকদের। তবে গাজীপুরের শিল্পঘন এলাকায় কথা বলে ধারণা পাওয়া গেল, মঙ্গলবার ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসের পর গ্রামমুখো মানুষের ঢল আরও বাড়তে পারে। অধিকাংশ কারখানার শ্রমিকরা নিজ উদ্যোগে ট্রাক, পিকআপ রিজার্ভ করেছেন ঈদে গ্রামে ফিরতে।

রাজধানীর আরও দুই প্রান্তসীমা গাবতলী ও নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ডের চিত্রও আবদুল্লাহপুরের মতো বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখান থেকেও প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে করে যাচ্ছেন গ্রামমুখো মানুষ। সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গাড়ি চলাচল বেড়েছে সেতুতে। শনিবার ভোর ৬টা থেকে রোববার ভোর ৬টা পর্যন্ত যমুনার বঙ্গবন্ধু সেতুতে যানবাহন পার হয়েছে ২৬ হাজার। এক কোটি ৮৮ লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে। যানবাহানের এ সংখ্যা লকডাউনের শুরুর দিনগুলোর কয়েকগুণ বেশি।

সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, দূরপাল্লার বাস ছাড়া আর কিছুই চলাচল বন্ধ নেই। বারবার অনুরোধ করে এবং দাবি জানিয়েও দূরপাল্লার বাস চালু করতে সরকারকে রাজি করাতে পারেননি মালিক-শ্রমিকরা। দূরপাল্লার গাড়ি চালু করলে বরং যাত্রীদের এমন গাদাগাদি, হুড়োহুড়ি করে যেতে হতো না।

সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার জানিয়েছেন, জনস্রোত ও অননুমোদিত যান চলাচল বন্ধে পুলিশ ও প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে চিঠি দিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে কাজ শুরু করেছে।

সড়কের মতো ফেরিঘাটেও ছিল যাত্রীর ভিড়। জনস্রোত ঠেকাতে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল দিনের বেলায় ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল শিমুলিয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে। রাতে পণ্যবাহী যান পারাপারে ফেরি চালু হলে তাতে চেপে হাজারো মানুষ পদ্মা পাড়ি দেন।

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বিজিবির পাহারা ফাঁকি দিয়ে ঘাট এড়িয়ে ট্রলার, মাছ ধরার নৌকা, বাল্ক্কহেডে করে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় হাজার হাজার মানুষ নদীর পার হয়ে গ্রামে চলে গেছেন। কালবৈশাখীতে নৌকাডুবি হয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এমন বিপজ্জনক নদী পারাপারে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে যাত্রী পারাপার করায় ১৮টি ট্রলার জব্দ করেছে পুলিশ।

মন্তব্য করুন