উন্নত চিকিৎসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিদেশে যেতে না পারার ঘটনায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়েছে দলটি। ওয়ান-ইলেভেনের ধারাবাহিকতায় তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলে বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল রোববার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তে নিঃসন্দেহে আমরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। শুধু মানবিক কারণে নয়, রাজনৈতিক কারণেও বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া জরুরি ছিল।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলেছেন, বিদেশে খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখানোয় পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছিল। সবুজ সংকেত পেয়েই অন্যান্য প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে। খালেদা জিয়ার পাসপোর্ট নবায়ন করা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সিনিয়র নেতারা যুক্তরাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। যুক্তরাজ্য সরকার

করোনার বিধিনিষেধের মধ্যেই খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর খালেদা জিয়াকে যুক্তরাজ্যে যেতে সরকারের অনুমতি না দেওয়া গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল দুপুরে খালেদা জিয়ার বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত আসার পর থেকেই সারাদেশে বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তারা আশা করেছিলেন, সরকার অন্তত অসুস্থতা নিয়ে রাজনীতি করবে না। তবে দুঃখজনক হলেও শেষ পর্যন্ত তার অসুস্থতা নিয়ে আবারও সরকার রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করল।

নাম প্রকাশ না করে বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা বলেন, সরকারের ভয় খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা। যুক্তরাজ্যে গিয়ে উন্নত চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে তিনি যদি সেখানে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন, বিশ্ব নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রচার করে বেকায়দায় ফেলে দেন- এসব আশঙ্কা থেকেই সরকার তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি।

তবে বিএনপির একটি অংশ এখনও হাল ছাড়েনি। তারা দেশি-বিদেশি লবিংয়ে সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জানা গেছে।

গতকাল এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার অবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তার অবদান অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। দুর্ভাগ্য- সরকার প্রতিহিংসামূলক রাজনীতি চরিতার্থ করার জন্যই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মির্জা ফখরুলের দাবি, আইনের যে ধারাতে সাজা স্থগিত করা হয়েছে, ওই ধারাতেই বিদেশে যাওয়া এবং দণ্ড মওকুফের সুযোগ রয়েছে। সরকার বলেছে, এমন অবস্থায় বিদেশ যাওয়ার কোনো নজির নেই। অথচ তারা অসংখ্য নজির সৃষ্টি করেছে। তারা ফাঁসির আসামিকেও বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারেন, মাফ করে দিতে পারেন। কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতার জন্য কোনো মানবতা, শিষ্টাচার ও মূল্যবোধ তাদের কাজ করে না। খালেদা জিয়া রাজনীতির শিকার হচ্ছেন।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বড় চক্রান্ত চলছে দাবি করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, খালেদা জিয়া দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তাকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে নেওয়া হয়েছে, অথচ আজ পর্যন্ত তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি সরকার।

খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজ (গতকাল) নিজে তাকে দূর থেকে দেখে এসেছি। আগের চেয়ে ভালো মনে হয়েছে। অক্সিজেন ছাড়াই শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন। ফুসফুসে টিউব লাগানো আছে। উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, চেয়ারপারসনের বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে দলের পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়নি, তার পরিবার আবেদন করেছে। এখন পরিবার সিদ্ধান্ত নেবে, তারা কী করবেন।

এর আগে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার বিষয়ে শালীনতা ও শিষ্টাচার বজায় রেখে কথা বলার অনুরোধ করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে নিয়ে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আপত্তিকর ও বিদ্রুপাত্মক কথা বলছেন, যা অশোভন। মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়ার করোনা নেগেটিভ এসেছে। তার জন্য যে চিকিৎসা এখন প্রয়োজন, তা সিসিইউতে রেখেই করতে হবে।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার সমকালকে বলেন, মানবিক কারণে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।

খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংকট আছে। দেশের হাসপাতালগুলোতে তার চিকিৎসা যথেষ্ট নয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় জাতীয়তাবাদী প্রজন্ম '৭১-এর উদ্যোগে খালেদা জিয়ার রোগ মুক্তির জন্য দোয়া মাহফিল এবং দুস্থ-অসহায়দের মধ্যে ঈদ উদযাপনের সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এর সম্পূর্ণ দায় সরকারকেই বহন করতে হবে।

সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো, সরকার কতটা অমানবিক।

স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু বলেন, খালেদা জিয়াকে এভাবে চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে শুধু বিএনপির নেতাকর্মী নয়, আপামর জনগণকে কষ্ট দিয়েছে সরকার।

মন্তব্য করুন