করোনাভাইরাসের টিকার মজুদ ফুরিয়ে আসছে। প্রথম ডোজ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার মতো টিকাও দেশে নেই। প্রায় সাড়ে ১৩ লাখের মতো মানুষকে দ্বিতীয় ডোজের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সরকারের কাছে যে মজুদ আছে, তা নিয়ে আগামী ১০ থেকে ১২ দিন চলতে পারে। তবে আগামীকাল বুধবার চীনের উপহারের সিনোফার্মের পাঁচ লাখ ডোজ দেশে আসছে। ওই টিকা দিয়ে আবারও প্রথম ডোজ শুরু করা যাবে।

ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের উৎপাদিত অক্সফোর্ডের টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণকারীদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে সরকার। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভারত থেকে টিকা আসার সম্ভাবনা নেই। বিকল্প হিসেবে অক্সফোর্ডের টিকা মজুদ থাকা দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাতে সাড়া মেলেনি। ফলে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। কারণ, প্রথম ডোজ গ্রহণকারীদের দ্বিতীয় ডোজও একই টিকা নিতে হবে।

দুশ্চিন্তায় ১৩ লক্ষাধিক মানুষ :সেরামের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তিন কোটি ডোজ টিকা পাওয়ার কথা বাংলাদেশের। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে কেনা টিকার ৫০ লাখ ডোজ এবং ফেব্রুয়ারিতে ২০ লাখ ডোজ পাওয়া গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের বাকি ৩০ লাখ ডোজ, মার্চ মাসের ৫০ লাখ ও এপ্রিল মাসের ৫০ লাখ মিলে মোট এক কোটি ৩০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করেনি সেরাম। এখন পর্যন্ত ভারত সরকার ৩৩ লাখ ডোজ টিকা উপহার হিসেবে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত এক কোটি তিন লাখ ডোজ টিকা ভারত থেকে পেয়েছে বাংলাদেশ।

ভারতে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এবং কাঁচামাল সংকটের কারণে সে দেশের সরকার টিকা রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এ অবস্থায় গত ২৬ এপ্রিল থেকে প্রথম ডোজের টিকা দেওয়া স্থগিত করে সরকার। অবশ্য এরপরও প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন।

রোববার পর্যন্ত টিকার প্রথম ডোজ নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯০০ জন। প্রথম ডোজ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ দিতে হলে এক কোটি ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮০০ ডোজ টিকা প্রয়োজন। এর মধ্যে প্রথম নেওয়ার আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৬ জন। প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে গতকাল পর্যন্ত ৯৩ লাখ ১৬ হাজার ৮৬ ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে।

প্রথম ডোজ গ্রহণকারীদের দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার জন্য আরও ২৩ লাখ ২৩ হাজার ৭১৪ ডোজ টিকার প্রয়োজন। বর্তমানে সরকারের হাতে মজুদ আছে ৯ লাখ ৮৩ হাজার ৯১৪ ডোজ। এই টিকা দিয়ে আগামী ১০ থেকে ১২ দিন চলতে পারে। এরপর টিকা না এলে দ্বিতীয় ডোজের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিরা বিপদে পড়বেন। প্রথম ডোজ গ্রহণকারী সবাইকে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হলে আরও ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ ডোজ টিকার দরকার।

সময়মতো টিকা না এলে করণীয় সম্পর্কে টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ভারত থেকে সময়মতো টিকা না এলে দ্বিতীয় ডোজের সময়সীমায় পরিবর্তন আনা হবে। কারণ, অক্সফোর্ডের টিকার প্রথম ডোজ গ্রহণের পর ৪ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়। দেশে প্রথমে চার সপ্তাহ পর এবং পরে আট সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১২ সপ্তাহ পর দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার সুযোগ যেহেতু রয়েছে, সেটি কাজে লাগানো হবে। সে ক্ষেত্রে আরও এক মাস সময় পাওয়া যাবে। এর মধ্যে টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

এরপরও টিকা না পেলে আরও সময় বাড়ানো হবে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, ১২ সপ্তাহের পরও টিকা দেওয়া যাবে। তাতেও কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা হবে না।

বিকল্প উদ্যোগেও সাড়া মিলছে না :ভারত থেকে অক্সফোর্ডের টিকা না পেয়ে বিকল্প উপায়ে একই টিকা সংগ্রহে উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও তাতে সাড়া মিলছে না। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মজুদ থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে না, সেসব দেশ থেকে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এরই অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি ও সুইডেন দূতাবাসে চিঠি পাঠানো হয়। ঢাকায় অবস্থিত ওইসব দেশের দূতাবাসে গত ১০ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত চিঠি পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই চিঠিতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার ঘাটতির কথা উল্লেখ করে মজুদ থাকা অব্যবহূত টিকা পেতে আগ্রহের কথা জানানো হয়।

চিঠিতে বাংলাদেশের চলমান টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে ওইসব দেশের সহায়তা চাওয়া হয়। এর বাইরেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মিশনে চিঠি পাঠিয়ে টিকার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে বলা হয়েছে। তবে এখনও কোনো সাড়া মেলেনি।

টিকা সংগ্রহে ভারতের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। কিন্তু জুলাইয়ের আগে টিকা রপ্তানিতে ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। চুক্তি অনুযায়ী টিকা দিতে না পারলেও অন্তত প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করার জন্য অন্তত ৩০ লাখ ডোজ দ্রুত দেওয়ার জন্য সরকারের হাইকমান্ড থেকে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাতেও সাড়া মেলেনি বলে সংশ্নিষ্টরা জানান।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সমকালকে বলেন, ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত টিকার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি সে দেশের সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা করে জানাবেন বলে জানিয়েছেন। অন্য দেশগুলোর কাছ থেকে এখনও কোনো আশ্বাস মেলেনি।

পরিকল্পনায় রাশিয়া ও চীনের টিকা :ভারত থেকে টিকা না পেয়ে বিকল্প হিসেবে রাশিয়া ও চীনের টিকা পেতে চাইছে সরকার। এ জন্য রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে চুক্তির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। এ চুক্তির আওতায় এই দেশ দুটি থেকে টিকা কেনা যাবে। তবে টিকার দাম বেশি হওয়ায় চীন ও রাশিয়া থেকে খুব বেশি সংখ্যক টিকা কিনবে না সরকার। আপদকালীন সংকট মোকাবিলায় যে সংখ্যক টিকা লাগবে, তা কেনা হবে।

অবশ্য রাশিয়া ও চীন প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনে সায় দিলে সরকার তাতে আগ্রহী। এটি হলে বাংলাদেশের তিনটি ওষুধ কোম্পানির মাধ্যমে বছরে একশ কোটি ডোজের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে টিকার দাম অনেক কম পড়বে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের হাইকমান্ড আশাবাদী, বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন বিষয়ে চীন ও রাশিয়া দ্রুতই চুক্তি করবে। এটি হলে টিকার সংকট দূর হবে। আর সেটি না হলে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও কোভ্যাক্সকে কেন্দ্র করেই চলবে টিকাদান কর্মসূচি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে সেখান থেকে কেনা টিকার আরও ২ কোটি ৩০ লাখ ডোজ পাওয়া যাবে বলে তারা আশা করছেন। এর বাইরে কোভ্যাক্স থেকে চলতি বছরের মধ্যে আরও ৬ কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার কথা রয়েছে। ভারতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ওপর নির্ভর করছে ওই টিকা পাওয়ার বিষয়টি। কারণ কোভ্যাক্সের টিকার জোগানদাতাও মূলত সেরাম ইনস্টিটিউট। ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে কোভ্যাক্সও টিকা পায়নি। এ কারণে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ১ কোটি ৯ লাখ ডোজ টিকা দিতে পারেনি কোভ্যাক্স। এ কারণেই মূলত সংকটের সৃষ্টি হয়। জুলাইয়ে ওই সংকট দূর হতে পারে। এর মধ্যে রাশিয়া ও চীনের টিকা দেশে উৎপাদনের বিষয়টি নিষ্পত্তি হলে সেরাম কিংবা কোভ্যাক্সের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, দ্বিতীয় ডোজের ১৩ লাখের মতো টিকার ঘাটতি নিয়ে এখন কিছুটা উদ্বিগ্ন। এর বাইরে টিকা নিয়ে আর সংকট নেই। কারণ, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে টিকার চুক্তি হতে যাচ্ছে। ওই চুক্তির আওতায় দেশ দুটি থেকে টিকা কেনা হবে। মে মাসেই রাশিয়া থেকে ৪০ লাখ ডোজের মতো টিকা আসতে পারে। চীনের উপহারের টিকাও আগামীকাল বুধবার চলে আসবে। এ ছাড়া রাশিয়া ও চীন বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনেও সম্মতি প্রকাশ করেছে। তারা প্রযুক্তি ও কাঁচামাল সরবরাহ করবে, আর বাংলাদেশে সক্ষমতা আছে এমন ওষুধ কোম্পানিগুলো টিকা উৎপাদন করবে। এসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। দ্রুতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

মন্তব্য করুন