বৈশাখের আজকের বিকেলের সূর্য ডোবার পরপরই আকাশের কোণে সরু এক ফালি চাঁদ খুঁজবে কোটি চোখ। যদি রুপালি চাঁদের কণা হেসে ওঠে, তবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল ফিতর। আর শাওয়াল মাসের চাঁদের দেখা না পেলে, পরশু শুক্রবার উদযাপিত হবে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় এই উৎসব। এবার একদিকে বৈশাখের তীব্র গরম ও দাবদাহ, অন্যদিকে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাণঘাতী সংক্রমণ- এই দুইয়ের মাঝেই আরেকটি খুশির ঈদ সমাগত। গেল বছরের দুই ঈদের মতো এবারের ঈদও মহামারির মধ্যে উদযাপিত হবে।

এক মাস রোজার পর ঈদুল ফিতর আসে উচ্ছ্বাস আর শান্তির বারতা নিয়ে। পবিত্র কোরআনের বর্ণনামতে, ঈদুল ফিতর মুসলিম উম্মাহর জন্য এক সর্বজনীন ধর্মীয় উৎসব। মুসলমানরা যখন নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি বা পছন্দের পোশাক পরে, দেহে আতর-খুশবু মেখে ঈদগাহে যান, তখন ফেরেশতারা তাদের সংবর্ধনা জানান।

পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতরে দান করাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিত্তবানরা দরিদ্রদের মাঝে জাকাত ও ফিতরা বিতরণ করলে দরিদ্ররা ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে পারবে বেশি। তাদের মুখেও হাসি ফুটবে এবং ঈদের ভোর তাদের জন্যও আনন্দবার্তা নিয়ে আসবে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঈদের খুতবায় দান-খয়রাতকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন। তাই ঈদের নামাজের আগেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের নিজ নিজ জাকাত ও সদকাতুল ফিতর (ফেতরা) আদায় করে থাকেন।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে পুরো বিশ্ব বিপর্যস্ত। বাংলাদেশও লড়ছে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে। সারাদেশে এখন চলছে তৃতীয় দফার লকডাউন। চলবে ১৬ মে পর্যন্ত। এ কারণে একরকম ঘরবন্দি মানুষ। ঘরে থাকাই এখন সবচেয়ে নিরাপদ।

এবারের ঈদে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ রাখা হয়েছে। চালু রয়েছে কেবল জেলার ভেতরে বাস চলাচল। তবু রাজধানী থেকে গ্রামে ছুটছে মানুষ। তবে বিশেষজ্ঞরা এই মুহূর্তে নিজ নিজ অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। নিজে ও পরিবারের স্বার্থেই যে যেখানে আছেন সেখানেই অবস্থান করতে বলেছেন তারা।

সরকারি নির্দেশ অনুসারে, এবারও ঈদগাহে নামাজ পড়া যাবে না। ঈদের জামাত হবে মসজিদে। নামাজ শেষে চিরাচরিত কোলাকুলিও নিষেধ। শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হবে মুখে মুখে। মসজিদগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নামাজে দাঁড়াতে হবে। প্রয়োজনে করতে হবে একাধিক জামাত। ঈদের বড় জমায়েত করা যাবে না। অনেকটা পারিবারিক আবহেই কাটাতে হবে ঈদ।

ঈদ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ নতুন জামা কাপড়, জুতাসহ ঈদ কেনাকাটা। এবার করোনার কারণে মার্কেট ও বিপণিবিতান বন্ধ থাকায় শুরুতে কেনাকাটা প্রায় বন্ধ ছিল। পরে বিপণিবিতান খুলে দেওয়া হলে কেনাকাটা করেছে মানুষ। সংক্রমণের ভয়ে অবশ্য অনেকে শপিংমলমুখো হননি।

আজ সন্ধ্যায় জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বৈঠকে বসবে। বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কক্ষে অনুষ্ঠিতব্য ওই সভা থেকে বাংলাদেশের আকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদের ঘোষণা দেওয়া হবে।

করোনা সংক্রমণের কারণে এবার জাতীয় ঈদগাহে কোনো জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পর পর পাঁচটি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম জামাত সকাল ৭টায়।

করোনার কারণে লকডাউন চলায় এবার ঈদে আলাদা সরকারি ছুটিও থাকছে না। ঈদের দিন সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলোতে আলোকসজ্জা করা হলেও এবার তা থাকছে না। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন ঈদ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো ঈদের আগের দিন থেকে টানা ৭ দিন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচারের ঘোষণা দিয়েছে। ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা বিশেষ সংখ্যা প্রতি বছরই প্রকাশ করে। এবারও তা করেছে।

ঈদের দিন দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশুসদন, ছোটমণি নিবাস, সামাজিক প্রতিবন্ধী কেন্দ্র, আশ্রয়কেন্দ্র, ভবঘুরে কল্যাণ কেন্দ্র ও দুস্থ কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।

পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ঈদের দিন বৃষ্টির পূর্বাভাস

এবার গ্রীষ্ফ্মের শুরুটা ছিল গরম আর বৃষ্টিহীন। অবশেষে মে মাসে এসেছে বৃষ্টি। গতকাল দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হয়েছে। যদিও তা স্থায়ী ছিল না বেশিক্ষণ। এদিন ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ৩৪ মিলিমিটার। তবে দেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে টাঙ্গাইলে ৭৮ মিলিমিটার।

ঈদের দিনও বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। আবহাওয়াবিদ শাহীনুর রহমান জানান, ১৩, ১৪ ও ১৫ মে দেশের কোথাও কোথাও দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হতে পারে। তবে কোনো কোনো জায়গায় থাকতে পারে রোদ।

এদিকে চলতি মাসেই অন্তত একটি ঘূর্ণিঝড় এবং দুই থেকে তিনটি তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস রয়েছে। তবে ঈদের সময়টায় সাগরে কোনো ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির আশঙ্কা নেই।

মন্তব্য করুন