প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের লাগাম টানতে ঈদের ছুটি কমিয়ে, দূরপাল্লার পরিবহন বাস, লঞ্চ ও ট্রেন চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। মানুষকে আটকে রাখার লক্ষ্যে গৃহীত এ পদক্ষেপ কাজে আসেনি। গত কয়েকদিনে বিকল্প পথে ঝুঁকি নিয়ে লাখ লাখ মানুষ পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে ঢাকা ছেড়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঘরমুখো যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাড়ি ফেরার দৃশ্য সামনে এলেও দেশের অন্যান্য জেলার মানুষের বাড়ি ফেরার বিষয়টি সেভাবে আলোচনায় আসেনি। আন্তঃজেলা পরিবহন চালুর সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাদের কেউ বাড়ি ফিরেছেন। কেউ মাইক্রোবাসে, প্রাইভেটকারে, পিকআপ কিংবা ট্রাকে করে বাড়ি ফিরেছেন। এমনকি কাভার্ডভ্যানে লুকিয়ে বাড়িতে যেতে দেখা গেছে। এভাবে লাখ লাখ মানুষের বাড়ি ফেরায় স্বাস্থ্যবিধি মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এতে করে উদ্বেগও বাড়ছে। উদ্বিগ্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগামী জুনে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করছেন। তাদের অভিমত, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে যেভাবে লাখ লাখ মানুষ বাড়ি ফিরেছেন, তাতে আগামী জুনে তৃতীয় দফার সংক্রমণ শুরুর শঙ্কা রয়েছে। ভারতীয় নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়লে সেটি আরও ভয়াবহ হবে। এমন অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদ জামাত হোক উন্মুক্ত স্থানে :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি দেশের প্রখ্যাত আলেমরা ঈদের জামাত উন্মুক্ত স্থানে আয়োজন করার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান তারা। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ঈদ জামাত কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে উন্মুক্ত স্থানে আয়োজন করা যায়, সে বিষয়টি লক্ষ্য রাখার জন্য জনসাধারণ ও আলেম-ওলামাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিকল্প পদ্ধতিতে ঈদের জামাত আয়োজন করার আহ্বান জানাচ্ছি। জামাত-পরবর্তী কোলাকুলি কিংবা হাত মেলানোর রীতি রয়েছে। এটি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সুতরাং কোলাকুলি ও হাত মেলানো থেকে বিরত থাকতে হবে।

এর আগে গত ২৬ এপ্রিল ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা আদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। শোলাকিয়ার ইমাম ও জাতীয় দ্বীনি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ সমকালকে বলেন, মুসলমান হিসেবে ঈদের নামাজ আদায় করতে হবে। একই সঙ্গে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে যেসব স্বাস্থ্যবিধি রয়েছে তাও মেনে চলতে হবে। এসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। সুতরাং মাস্ক ব্যবহার, স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়া এবং নিরাপদ সামাজিক দূরত্বে থেকে নামাজ আদায় করলে অনেকাংশে সুরক্ষা পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে করমর্দন ও কোলাকুলির বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ আরও বলেন, কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহে গতবছরের মতো এবার ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ বৃহত্তম এই ঈদগাহে ঈদের জামাতে হাজার হাজার মুসল্লি অংশগ্রহণ করে থাকেন। তখন ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এতে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সুতরাং সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের নামাজ আদায় করুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন।

গোপালগঞ্জের গওহর ডাঙ্গা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা রুহুল আমিন সমকালকে বলেন, শুধু ঈদের জামাত নয়, সবসময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। কারণ করোনা প্রতিরোধের মূলমন্ত্র স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। বিশেষ করে মাস্ক ব্যবহার করা এবং সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে পরিস্কার রাখা অথবা বারবার স্যানিটাইজ করা। একই সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। ঈদের দিন বৃষ্টি না হলে খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ আদায় করুন। ধর্ম মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী মেনে চলুন। এতে করে অনেকাংশে সুরক্ষিত থাকা যাবে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের :বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, মানুষের গ্রামে যাওয়া আটকাতে সরকারি পদক্ষেপ যথাযথ ছিল না। কারণ দূরপাল্লার পরিবহন বাস, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ রাখলেও আন্তঃজেলা পরিবহন চালু ছিল। এতে করে মানুষ ভেঙে ভেঙে গ্রামে ফিরতে পেরেছে। আবার মাইক্রোবাস, পিকআপ, প্রাইভেটকার, ট্রাকে করেও অনেকে ফিরেছেন। তাদের আটকাতে সরকারের কোনো পদক্ষেপ ছিল না। হাজার হাজার মানুষ যেভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে বাড়ি ফিরে গেছেন সেটি আতঙ্কের। এসব মানুষ আবার কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকায় ফিরবেন। গত বছর ঈদযাত্রায় এমন ঘটনা ঘটেছিল। এরপর সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছিল। এবারও সেই আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে জুন মাসে আরেকটি ঢেউ আসতে পারে। তবে ভারতীয় নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়লে তা হবে ভয়াবহ। এ অবস্থায় সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, মাস্ক ব্যবহার করুন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ সমকালকে বলেন, সরকারের বিধিনিষেধ আরোপের ফলে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসছে। এটি বাড়িয়ে ১৬ মে পর্যন্ত করা হয়। লক্ষ্য ছিল ঈদযাত্রা নিরুৎসাহিত করা। এজন্য দূরপাল্লার পরিবহন বাস, লঞ্চ ও ট্রেন বন্ধ রাখা হয়েছিল। এর পরও মানুষকে আটকে রাখা যায়নি। দলবেঁধে যে যার মতো করে গ্রামে ছুটে গেছেন। এসব ব্যক্তির মধ্যে থাকা সংক্রমিতদের মাধ্যমে পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং পরে অন্যদের সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হলো। এর মধ্যে ভারতে নতুন ধরনও দেশে শনাক্ত হয়েছে। এটি আরও আতঙ্কের। কারণ ওই ধরনটি দক্ষিণ আফ্রিকা ও যুক্তরাজ্যের ধরনের তুলনায় অধিক সংক্রামক। দ্রুত সংক্রমিত করে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়। সুতরাং আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। অন্যথায় কঠিন সংকটের মধ্যে পড়তে হবে।

তৃতীয় ঢেউ নিয়ে শঙ্কা স্বাস্থ্য বিভাগের :দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ঈদকে সামনে রেখে যেভাবে জনসমাগম বেড়েছে, লাখ লাখ মানুষ গ্রামে ফিরেছেন, দোকানপাট ও শপিংমলে ভিড় করেছেন, তাতে জুন মাসেই তৃতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ বলেন, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে জনসমাগম ও মানুষের চলাচল যেভাবে বেড়েছে তাতে আমরা অত্যন্ত শঙ্কিত। ঢাকা ছেড়ে যাওয়া লাখ লাখ মানুষ আবার ফিরে আসবে। এতে করে সামনে তৃতীয় ঢেউ আসবে কিনা, তা নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ চিন্তিত।

মহাপরিচালক বলেন, ভারতের সংক্রমণের ভয়াবহতা আমরা লক্ষ্য করছি। সুতরাং সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, মানুষের সচেতনতা বাড়াতে সবাই মিলে যেন চেষ্টা করি। করোনা মহামারি কবে নাগাদ পৃথিবী থেকে চলে যাবে, তা এখনও অজানা। এটি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলার সুযোগ নেই। নিজেদের সর্বনাশ নিজেরা ডেকে আনলে এই প্রাণঘাতী ভাইরাস থেকে পরিত্রাণ পাওয়া কঠিন হবে।



মন্তব্য করুন