সীমান্তবর্তী জেলাগুলো নিয়ে উদ্বেগ বেড়েই চলছে। দেশে করোনাভাইরাসের ভারতীয় ধরন 'ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট' শনাক্ত হওয়ার পর সীমান্তের জেলাগুলোতে প্রতিদিন আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। অন্য জেলাগুলোতেও ধরনটি ছড়িয়ে পড়ছে। সারাদেশেই সংক্রমণ বাড়ছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় করোনা শনাক্তের দিক থেকে ঢাকাকে ছাড়িয়ে গেছে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ। সংক্রমণে এত দিন ঢাকা বিভাগ শীর্ষে ছিল।

গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৮১৫ রোগী শনাক্ত হয়েছেন রাজশাহী বিভাগে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫৭৮ রোগী শনাক্ত হয়েছেন খুলনায়। তৃতীয় স্থানে থাকা ঢাকা বিভাগে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৫১৩ জন। সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। শয্যা সংকটে রোগী ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না কোনো কোনো হাসপাতালে। জেলা-উপজেলা শহরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও যশোরের অবস্থা উদ্বেগজনক।

করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণে সীমান্তের সাত জেলায় গত মে মাসে লকডাউনের সুপারিশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিটি। কিন্তু সাতক্ষীরা ছাড়া আর কোনো জেলায় এখনও লকডাউন দেওয়া হয়নি। এর বাইরে কয়েকটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার পর্যায়ে লকডাউন ঘোষণা করেছে স্থানীয় প্রশাসন। তবে সুপারিশ না করলেও সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আগেই লকডাউন দেওয়া হয়। রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায়ও আজ বিকেল থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত সর্বাত্মক লকডাউন দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সীমান্ত জেলাগুলোতে লকডাউন কার্যকর না করার সমালোচনা করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটি আরও ১২ দিন আগে সীমান্তের সাতটি জেলায় লকডাউনের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ স্থানীয় প্রশাসনের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে বসে আছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সমকালকে বলেন, ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলো নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ উদ্বিগ্ন। ওই জেলাগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদানের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। কোভ্যাক্সের কাছে এ জন্য বাংলাদেশের আবহাওয়া উপযোগী টিকা চাওয়া হয়েছে। কারণ ফাইজারের যে টিকা এসেছে, তা ঢাকার বাইরে সংরক্ষণের সুবিধা নেই। একই সঙ্গে সুরক্ষা সামগ্রী ও ওষুধপত্র পাঠানো হবে। প্রয়োজন হলে জেলাগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।

ঢাকাকে ছাড়াল :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় সারাদেশে নতুন করে দুই হাজার ৫৭৬ জনের শরীরে করোনার সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগে- ৪৯ জন।

গত চব্বিশ ঘণ্টায় যত সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছেন, তা দেড় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ২৮ এপ্রিল ৯৫৫ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। এ নিয়ে দেশে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা আট লাখ ২০ হাজার ৩৯৫ জনে পৌঁছাল।

গত চব্বিশ ঘণ্টায় করোনায় আরও ৪০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন। এ নিয়ে করোনায় মোট ১২ হাজার ৯৮৯ জনের মৃত্যু হলো। এর বিপরীতে গত চব্বিশ ঘণ্টায় করোনা সংক্রমিত আরও দুই হাজার ৬১ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এর মধ্য দিয়ে করোনা সংক্রমিত মোট সাত লাখ ৫৯ হাজার ৬৩০ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, গত চব্বিশ ঘণ্টায় আগের দিনের তুলনায় কিছুটা কমেছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা। গতকাল সারাদেশের ৫১০টি ল্যাবে ১৯ হাজার ৪৪৭টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এই সময়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে ১৯ হাজার ৮৬৯টি। বুধবার ২০ হাজার ৬০৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। শনাক্ত বিবেচনায় এখন দেশে সুস্থতার হার ৯২ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

সীমান্ত জেলায় ক্রমেই অবনতি :রাজশাহী বিভাগে শনাক্ত হওয়া ৮১৫ জনের মধ্যে সর্বোচ্চ রোগী রাজশাহী জেলায়- ৩৫৩ জন। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে গত চব্বিশ ঘণ্টায় মারা গেছেন ১২ জন। বৃহস্পতিবার সকালে হাসপাতালটির নির্ধারিত ২৭১ বেডের বিপরীতে ভর্তি ছিলেন ২৯০ জন রোগী।

জয়পুরহাটে গত বুধবার ৪৩৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন ১০১ জন। শনাক্তের হার ২৩ শতাংশের ওপরে। বাগেরহাটে চব্বিশ ঘণ্টায় ১৫৭ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৬৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৪০ শতাংশ। এ সময়ে মারা গেছেন দু'জন। নওগাঁয় চব্বিশ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ছিল ২৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। এ সময়ে ৩৭২টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ৯৪ জন। দিনাজপুর সদর উপজেলায় শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ২৬ শতাংশ। যশোরের অভয়নগরে গতকাল ২৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত মিলেছে ১৩ জন। শনাক্তের হার ৪৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। নাটোরে এক দিনে ১৮৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ৬২ জন। শনাক্তের হার ৩৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন একজন।

এদিকে, শয্যা সংকটে খুলনা করোনা হাসপাতালে রোগী ভর্তি স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় সাতক্ষীরায় দ্বিতীয় দফায় ১৭ জুন পর্যন্ত এক সপ্তাহ লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। এ জেলায় গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৯৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছেন ৪৮ জন। আক্রান্তের হার ৫০ দশমিক ৫২ শতাংশ। এ ছাড়া উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার ভোরে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় গতকাল ভোর ৬টা থেকে শুরু হয়েছে সাত দিনের লকডাউন, চলবে ১৬ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে রোগীর জায়গা না হওয়ায় শয্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাতেও রোগী ধরছে না। এ অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ১৫ নম্বর ওয়ার্ডকেও করোনা ওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহারের কাজ শুরু করেছে। হাসপাতালটিতে গত চব্বিশ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১২ জনের মধ্যে রাজশাহীর ৯ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনজন রয়েছেন। তাদের মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন সাতজন, বাকিদের উপসর্গ ছিল।

রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ৪২ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ১৮ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৬, নওগাঁর সাত ও নাটোরের একজন।

এদিকে, আজ শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় সাত দিনের সর্বাত্মক কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টায় সার্কিট হাউসে এক জরুরি সভায় এ ঘোষণা দেন বিভাগীয় কমিশনার ড. হুমায়ুন কবির। ১৭ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত লকডাউন চলবে।

হুমায়ুন কবির বলেন, লকডাউন চলাকালে রোগীবাহী, আম ও পণ্যবাহী এবং জরুরি সেবা ছাড়া কোনো ধরনের পরিবহন চলবে না। এ সময়ে সব ধরনের দোকানপাট, মার্কেট, গণজমায়েত বন্ধ থাকবে। নগরীতে রিকশা, অটোরিকশাও চলবে না।

খুলনা ব্যুরো জানায়, করোনা হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. সুহাস রঞ্জন হালদার জানিয়েছেন, ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার সকালে রোগী ভর্তি ছিলেন ১২৬ জন। পরে আরও চারজন ভর্তি হন। এখন আর কোনো শয্যা খালি না থাকায় আপাতত রোগী ভর্তি করা সম্ভব নয়।

গতকাল খুলনা মেডিকেল কলেজের পিসিআর ল্যাবে ২৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছেন ১০৯ জন। শনাক্তের হার ৪০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে পরের দিন ভোর ৬টা পর্যন্ত জয়পুরহাট ও পাঁচবিবি পৌর শহরে লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন। পরিচালিত হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, সিভিল সার্জন ডা. কে এম হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বুধবার থেকে গতকাল সংক্রমণের হার কিছুটা কম। মোংলা ও রামপাল উপজেলায় একজন করে মারা গেছেন।

নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, জেলায় গত চব্বিশ ঘণ্টায় কোয়ারেন্টাইনে নেওয়া হয়েছে ২৬৪ ব্যক্তিকে। বর্তমানে জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৬ জন।

দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, সদর উপজেলায় সংক্রমণ বেশি। এ উপজেলায় আক্রান্তের হার ৪০ দশমিক ২৬ শতাংশ। পুরো জেলায় আক্রান্তের হার ২৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত চব্বিশ ঘণ্টায় ১৫০টি নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ৪৩ জনের।

নওয়াপাড়া (যশোর) প্রতিনিধি জানান, অভয়নগরে গত কয়েক দিনে ১১৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভা ও যশোর পৌরসভায় সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ চলছে। গতকাল নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় নওয়াপাড়া বাজারে সব দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। মোটরসাইকেল, রিকশায় একজনের বেশি চলাচল করতে দেওয়া হয়নি।

নাটোর প্রতিনিধি জানান, জেলায় মোট আক্রান্ত দুই হাজার ৪৭ জন। সংক্রমণ রোধে চলছে লকডাউন। স্বাস্থ্যবিধি না মানায় গতকাল পৃথক অভিযান চালিয়ে ২৫ জনকে ১০ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নাটোর সদর হাসপাতালে কভিড রোগীদের জন্য ৩০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।