দফায় দফায় বিধিনিষেধ বাড়িয়েও সংক্রমণের রাশ টানা যাচ্ছে না। আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়ছেই। অনেক জায়গায় চলমান লকডাউনের মধ্যেই শনাক্তের হার বেড়েছে কয়েক গুণ। রোগী বাড়ছে সীমান্তের জেলা ছাড়াও অন্য জেলাগুলোতে। কোথাও আবার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। তাছাড়া প্রাইভেট, কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হওয়ার খবরও মিলছে। ভয়জাগানিয়া এই পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রে মানুষকে কোনোভাবেই সচেতন করা যাচ্ছে না। তাদের ভাব, যেন কিছুই হয়নি!

এদিকে, অঞ্চলে অঞ্চলে করোনার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুধু বিধিনিষেধ আরোপ এবং তার মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া যেন কিছুই করার নেই- পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগও বারবার শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজের কাজ হচ্ছে না; এই কমছে তো এই বাড়ছে সংক্রমণ। সবমিলিয়ে সারাদেশে সার্বিক করোনা পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। ব্যুরো, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতার প্রতিবেদনে থাকছে বিস্তারিত :

রাজশাহী মেডিকেলের করোনা ওয়ার্ডে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন তিনজন, বাকিদের উপসর্গ ছিল। মৃতদের মধ্যে রাজশাহীর সাতজন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁর একজন করে রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন ৪৪ জন। গতকাল রাজশাহীর দুটি পিসিআর ল্যাবে জেলার ৪০০টি নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ১৬৬। শনাক্তের হার ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। এদিকে, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের আট জেলায় ৬৪৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

নওগাঁয় গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দু'জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ১৭৯ জনের নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ৩৪ জন। শনাক্তের হার ১৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের একজন নিয়ামতপুর উপজেলার ও অপরজন মান্দা উপজেলার বাসিন্দা।

নাটোরে ২৪ ঘণ্টায় ১২৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ৬৬। শনাক্তের হার ৫১ দশমিক ৫০ শতাংশ। নাটোর ও সিংড়া পৌরসভায় দ্বিতীয় দফা লকডাউনের দ্বিতীয় দিনেও গতকাল শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কঠোর অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালতও কাজ করছেন।

পঞ্চগড়ে রোববার ৪৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ১২ জন। শনাক্তের হার প্রায় ৩০ শতাংশ। জেলায় বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮৭৩ জন।

দিনাজপুর সদর উপজেলায় লকডাউনের তৃতীয় দিন চলছে। এর মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১৯০। এই সময়ে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭৪৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে দিনাজপুর জেলায় ২৭৫ জন পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলারই ১৯০ জন।

সংক্রমণ না কমায় সাতক্ষীরায় চলমান লকডাউন তৃতীয় দফায় আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। গতকাল দুপুরে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল এতে সভাপতিত্ব করেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় সভা থেকে আড়াইশ শয্যার সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ করোনা ডিডিকেটেড হাসপাতাল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখন থেকে অন্য কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হবে না।

এদিকে, উপসর্গ নিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ৮৮। শনাক্তের হার ৪৭ দশমিক ৩১ শতাংশ।

যশোরে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৮৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ২০৩। শনাক্তের হার ৪২ শতাংশ। এদিন যশোর জেনারেল হাসপাতালে একজন করোনা রোগী এবং উপসর্গ নিয়ে আরও একজন মারা গেছেন। এই হাসপাতালের করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে ৮০ শয্যার বিপরীতে ৯১ জন এবং আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১৯ শয্যার বিপরীতে আরও ৪০ জন ভর্তি আছেন।

এদিকে, যশোরের অভয়নগরে ঘরে ঘরে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। এখানে বুধবার ৪১ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ৩২ জন। শনাক্তের হার ৭৮ শতাংশের ওপরে। গত কয়েকদিনে শনাক্ত হয়েছে ১৫৫ জন রোগী। অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৮ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। তার মধ্যে চারজনের দেহে 'ডেলটা' ধরন শনাক্ত হয়েছে। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পৌরসভা এবং যশোর পৌরসভায় দ্বিতীয় দফায় আরও সাত দিন কঠোর বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মাহামুদুর রহমান রিজভী বলেন, প্রতিদিন বাড়ছে করোনা রোগী। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিনিয়ত ১৮ থেকে ২০ জন করোনা রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বরিশাল থেকে সড়কপথে খুলনার দূরত্ব ১১৫ কিলোমিটার এবং ৮১ কিলোমিটার দূরত্ব বাগেরহাটের। এ হিসাবে বাগেরহাট ও খুলনা বরিশালের প্রতিবেশী জেলা। বাগেরহাট ও খুলনায় করোনাভাইরাসের 'ডেলটা' ধরনের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে বরিশালও।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বিপর্যস্ত খুলনার কয়রায় দুর্গতদের মাঝে নতুন করে করোনা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে এ উপজেলায় ১৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া এলাকায় জ্বর, সর্দি, কাশির রোগী বাড়ছে। ঝিনাইদহে করোনা মহামারি বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে লোকগান, নাটিকা, বিজ্ঞাপন ও ক্যারাভান প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন প্রচারমূলক কার্যক্রম চলছে। এদিকে, শৈলকূপা উপজেলার অলিগলিতে সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে চলছে কয়েকশ কোচিং সেন্টার। এসব কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট পড়তে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে অভিভাবকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা লিজা। এ বিষয়ে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন। এ ছাড়া হরিণাকুণ্ডুতে সাত দিনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

গোপালগঞ্জ ও মুকসুদপুর পৌরসভা, সদর উপজেলার লতিফপুর ও কাশিয়ানী সদর ইউনিয়নে সাত দিনের বিশেষ লকডাউন ঘোষণা করেছে প্রশাসন। আজ শুক্রবার সকাল ৭টা থেকে তা কার্যকর হবে। গতকাল জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।

নড়াইলে গতকাল একজনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। জেলায় গত চব্বিশ ঘণ্টায় ৭৮ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত ৩৮। শনাক্তের হার ৪৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। এ ছাড়া মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় দু'জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন গাংনীর এবং আরেকজন সদর উপজেলার বাসিন্দা। একই সময়ে জেলায় আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে ২০ জন।

চুয়াডাঙ্গায় বুধবার আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এদিন ১৩১ জনের নমুনা পরীক্ষায় শনাক্ত হয়েছে ৫৯ জন। শনাক্তের হার ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ।











বিষয় : করোনা

মন্তব্য করুন