প্রবাসী-অধ্যুষিত সিলেটে মূলধনের অভাব নেই। ব্যাংকগুলোতে অলস পড়ে আছে টাকা। যে কোনো ধরনের শিল্পায়নের জন্য অত্যাবশ্যকীয় বিদ্যুৎ বা গ্যাসের ঘাটতিও নেই। আছে পর্যাপ্ত জনবল। এসবের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা মিলে সিলেটে শিল্পায়নের অপার সম্ভাবনা। এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নগরীর উপকণ্ঠ গোটাটিকর ও খাদিমনগরে গড়ে উঠেছে দুটি বিসিক শিল্পনগরী।

কিন্তু এই দুই শিল্পনগরীতে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি বা মণিপুরি শাড়ির মতো পণ্যের কারখানা গড়ে ওঠেনি। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারী। এ নিয়ে অনেকটাই হতাশ সংশ্নিষ্টরা।

১৯৬৪ সালে কাজ শুরু হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৮ সালে গোটাটিকর বিসিকের যাত্রা শুরু। সে সময়ে বস্ত্রশিল্পের অনেক কারখানা গড়ে ওঠে। কিন্তু তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা টিকে থাকতে পারেনি। এরপর স্বল্প সময়ে লাভের আশায় বিসিক হয়ে ওঠে খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনের কারখানার সমাহার। গোটাটিকরে বর্তমানে ৬৬টি কারখানা রয়েছে; এর মধ্যে ৪০টিই মিষ্টি ও খাদ্যজাত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। কাগজে-কলমে বস্ত্র ও বস্ত্রজাত পণ্যের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি বন্ধ। এ ছাড়া পেপার বোর্ড, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিংয়ের চারটি, কেমিক্যাল ও ফার্মাসিউটিক্যাল তিনটি এবং প্রকৌশলজাত ১৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে এখানে।

দক্ষিণ সুরমার গোটাটিকর বিসিক শিল্পনগরের সবচেয়ে বড় কারখানা ভবন ফিজা অ্যান্ড কোং। এটি নগরীর অন্যতম মিষ্টি ও খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া রয়েছে বনফুল, স্বাদ, মধুবন ও রাজমহল। এগুলো মূলত মিষ্টি ও খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। অনেক কনফেকশনারি কারখানাও রয়েছে সেখানে। এসবের মধ্যে ব্যতিক্রম কৃষি যন্ত্রাংশ নির্মাতা আলিম ইন্ডাস্ট্রি। এর বাইরে সিলেট কোল্ড স্টোরেজ ও এম আহমদ কোল্ড স্টোরেজের মতো বড় প্রতিষ্ঠান আছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান এক সময় কাপড় উৎপাদনে সম্পৃক্ত ছিল। এখন তারা সবজি ও ফলমূল সংরক্ষণ করে। খাদিমনগর বিসিকেরও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান খাদ্যসামগ্রীর।

গত ৯ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে 'সিলেট অঞ্চলে শিল্প ও ব্যবসা খাতে সম্ভাবনা, অর্থায়ন সমস্যা ও সমাধানে করণীয়' শীর্ষক মতবিনিময় সভা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেট কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মো. আবুল কালাম হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলে ভারী, মাঝারি ও ক্ষুদ্রশিল্পের পাশাপাশি পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু সঠিক উদ্যোগের অভাবে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

১৯৬৪ সালে গোটাটিকরে ২৪ দশমিক ৮৯ একর জায়গায় প্রথম বিসিক শিল্পনগর স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে কাজ শেষে ১৩৭টি প্লটের মধ্যে ক্রমান্বয়ে ১৩৪টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। সব মিলে ৭২টি প্রতিষ্ঠানকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি বা মণিপুরি শাড়ির মতো পণ্যের কারখানা গড়ে ওঠেনি।

এ বিষয়ে বিসিক কর্তৃপক্ষ বলছে, 'উৎপাদন' ও 'কর্মসংস্থান'ই হলো একটা শিল্পনগরীর সাফল্য। এই হিসেবে গোটাটিকর বিসিক সফল। ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, গোটাটিকর বিসিকের শিল্প কারখানায় মোট বিনিয়োগ ১১৫ কোটি টাকার বিপরীতে বার্ষিক ২৩০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন হয়। একইভাবে কর্মসংস্থান নিয়েও সন্তুষ্ট কর্তৃপক্ষ। গোটাটিকর বিসিকের কর্মকর্তা আবিদুর রহমানের দেওয়া তথ্যমতে, গোটাটিকরে ৪ হাজার ৪০০ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজার ৬৮২ জন পুরুষ, বাকিরা নারী।

'চায়ের রাজ্য' সিলেটে বড় ধরনের শিল্পায়নের পাশাপাশি স্থানীয় কুটির শিল্পগুলো বিসিক শিল্পনগরীতে জায়গা নেয়নি। এ বিষয়ে খাদিমনগর বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জল হোসেন মনে করেন, তার সামান্য কয়েক দিনের অভিজ্ঞতায় মনে হয়েছে, শীতল পাটিসহ ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের প্রসারের জন্য শিল্পনগরকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা কাজে লাগাতে পারতেন।

সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের একপাশে বিভাগীয় কমিশনার ও সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি, সিলেট শিক্ষাবোর্ডসহ বেশ কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়। সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উল্টো দিকে গোটাটিকর বিসিকের প্রধান ফটক পার হলেই চোখে পড়ে দীনতার চিত্র। মূল সড়কের পিচ উঠে গেছে। বাতাসে কারখানার বর্জ্যের দুর্গন্ধ। একেবারে পেছনের দিকে গুড ফুড নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এটির ম্যানেজার সুলতান আহমদ বলেন, সমস্যার শেষ নেই। রাস্তার অবস্থা তো দেখেছেন। নালা ব্যবস্থা ভালো না। বৃষ্টি মৌসুম এলেই বিসিক নগরী জলাবদ্ধতার শিকার হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গোটাটিকর বিসিকের সামনের সড়কসহ আশপাশের সব স্থাপনা উঁচু। ফলে ভেতরে নালা ব্যবস্থা থাকলেও বিসিকের পানি বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না। পানিতে দুর্গন্ধ থাকায় পার্শ্ববর্তী আলমপুর-কুচাই এলাকাবাসী বিসিকের বাইরে মূল নালা বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। সুরমা নদীর কাছাকাছি হওয়ায় জলাবদ্ধতা অনেক সময় ভয়াবহ বন্যায় রূপ নেয় বলে সংশ্নিষ্টদের ভাষ্য।

জলাবদ্ধতার বিষয়ে গোটাটিকর বিসিক নগরীর কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আবিদুর রহমান খান বলেন, স্থানীয় কাউন্সিলর ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। বিসিকের ভেতরের নালাগুলো সংস্কার করা হয়েছে। পানি বাইরে যাওয়ার তো সুযোগ নেই। পার্শ্ববর্তী এলাকার লোকজন নালায় বাঁধ দিয়ে রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, এখানে মাত্র ছয়টি ছাড়া বাকি সব প্রতিষ্ঠান চালু আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা রেখে পুরো এলাকায় মাটি ভরাট করে উচ্চতা বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত হবে না। তাই কারখানার বর্জ্যের দুর্গন্ধ দূর করার পদক্ষেপ নিতে হবে।

খাদিমনগরে জেলার দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরের যাত্রা শুরু ১৯৯৬ সালে। এখানে ৭৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৬টি পুরোদমে চালু রয়েছে, যার অর্ধেক খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। বাকি চারটি প্রতিষ্ঠান রুগ্‌ণ এবং চারটিতে অবকাঠামো নির্মাণ চলছে।

সিলেটের দুই বিসিকে ১০টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও উদ্যোক্তারা নতুন করে কোনো প্লট পাচ্ছেন না। মামলার জালে আটকে থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের প্লট অন্যদের বরাদ্দ দেওয়া যাচ্ছে না। আবার নির্ধারিত সীমানার মধ্যে খালি জায়গা না থাকায় আগ্রহীদের বাড়তি জায়গাও দেওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য ২০০৫ সালে খাদিমনগর বিসিকের এলাকা আরও ২৫ একর বর্ধিতকরণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। পরে তা সংশোধন করে ১০ একর করা হলেও বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নতুন উদ্যোক্তারা বিসিকে প্লট পাচ্ছেন না।

বেহাল আরও তিন জেলার বিসিক

সিলেট বিভাগের বাকি তিন জেলা হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জে আরও তিনটি বিসিক শিল্পনগর রয়েছে। সেগুলোতে সমস্যার অন্ত নেই। অবকাঠামো উন্নত না হওয়ায় হবিগঞ্জে শিল্প কারখানা গড়ে তুলতে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। এ কারণে প্লট বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ফেলে রেখেছেন তারা।

১৯৮৬ সালে ১৫ একর জায়গা নিয়ে হবিগঞ্জে বিসিক শিল্পনগর চালু হয়েছিল। এখানে বর্তমানে ৪২টি কারখানা চালু রয়েছে এবং ৫টি বন্ধ। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছে মোট ৩৪ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে আছে বিসিক কর্তৃপক্ষের। এই বকেয়ার মধ্যে রয়েছে বরাদ্দকৃত জমির কিস্তি পরিশোধ, শিল্পনগরের সার্ভিস চার্জ ও খাজনার টাকা।

হবিগঞ্জের কয়েকজন শিল্প উদ্যোক্তা বলেছেন, বিসিকের ভেতরে রাস্তাঘাটের অবস্থা নাজুক। একাধিক কালভার্ট ভাঙা। নেই সীমানা প্রাচীর। প্রয়োজনীয় পানির ব্যবস্থা নেই। শিল্পনগরের কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) আল আমীন ভূইয়া বলেন, ভাঙা রাস্তাঘাট ও সীমানা প্রাচীর না থাকাটা এখানকার বড় সমস্যা। পানির পাম্পের বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, শিল্প উদ্যোক্তারা লিখিতভাবে আবেদন করলে বিষয়টি দেখা যাবে।

রুগ্‌ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভারে খুঁড়িয়ে চলছে মৌলভীবাজারের বিসিক শিল্পনগর। ১৯৮৭ সালে সদর উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকায় ১৪ দশমিক ৫৯ একর জায়গার ওপর এই শিল্পনগর গড়ে ওঠে। মোট ১০২টি প্লটের মধ্যে ১০০টি বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাতে শিল্পায়নের গতি নেই। শিল্পনগর এলাকায় পানি নিস্কাশন ও বর্জ্য ফেলার অব্যবস্থাপনায় সংকটে পড়েন উদ্যোক্তারা। আগর-আতর, স মিল, অ্যালুমিনিয়ামের কারখানা গড়ে উঠলেও এখানেও বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মূলধনের অভাবে ১৪টি দীর্ঘ দিন ধরে রুগ্‌ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আগ্রহী শিল্প উদ্যোক্তার অভাবে ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ঋণ দিতে অনীহার কারণে শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো রুগ্‌ণ অবস্থায় পড়ে আছে বলে মনে করছেন মৌলভীবাজার বিসিক শিল্পনগরের উপপরিচালক জহুরুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাস্তা সংস্কার, পানি নিস্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থানায় পরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।

ভঙ্গুর সড়ক, নৌ পথে কাঁচামাল পরিবহনের ব্যবস্থা না থাকা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ না পাওয়ায় ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছেন না সুনামগঞ্জের বিসিকের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ২০০৬ সালে প্লট বরাদ্দ শুরুর পর অনেকে আগ্রহী হলেও ব্যাংক ঋণসহ নানা সমস্যায় এখন এই শিল্পনগরের সুফল প্রত্যাশিত নয়। মালিক সংগঠনের সভাপতি মো. খালেদ মিয়া বলেন, 'সুরমা নদী আমাদের কাছেই। তারপরও নদীপথে কাঁচামাল পরিবহন করতে পারি না। বিসিকের ভেতরের রাস্তা বেহাল। বৃষ্টি হলে কাঁদা লেগে যায়। অনেকের গ্যাস সংযোগ পর্যন্ত নেই।'

সুনামগঞ্জ বিসিক শিল্পনগরের উপব্যবস্থাপক এমএসএম আসিফ বলেন, সুনামগঞ্জের উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তা ছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা বিসিকে আসেন না। তারা বালু, পাথর ও কয়লার ব্যবসা করেন। তিনি আরও বলেন, নদীপথে পণ্য পরিবহনের জন্য সুরমা নদীর সঙ্গে বিসিকের সংযোগ সড়ক করার জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কের ওপাশের জমি বিসিকের নয়। তাই সংযুক্ত সড়ক করতে সময়ের প্রয়োজন। বিসিকের ভেতরের সড়কও খুব দ্রুত হয়ে যাবে বলে দাবি তার।

প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার প্রতিনিধি





















বিষয় : সিলেট

মন্তব্য করুন