করোনা মহামারিতে উৎসাহ-উদ্দীপনায় কিছুটা ছেদ পড়লেও দেশজুড়ে যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে গত বুধবার উদযাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ লাভের আশায় ঈদুল আজহার নামাজ শেষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করেন।

মহামারি সত্ত্বেও অনেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা উদযাপন করতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই ছুটে গিয়েছিলেন গ্রামে। অনেকে আবার যেতে পারেননি বা যাননি। সামর্থ্য অনুযায়ী ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর পথে কোরবানি করেন বুধবারসহ টানা তিন দিন। নিজেদের ও প্রিয়জনের নামে পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ে সচেষ্ট হন তারা। পরে সমাজের দরিদ্র ও অসহায়দের মধ্যে কোরবানির মাংস বিলিয়েছেন সামর্থ্যবানরা। ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় শেষে মুসল্লিরা দু'হাত তুলে করোনা থেকে মুক্তি চেয়ে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানান। কভিড-১৯ থেকে মুক্তির জন্য মসজিদে মসজিদে এবার মহান আল্লাহর মর্জি কামনা করা হয়।

চার হাজার বছর আগে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম (আ.) পৃথিবীতে তার সবচেয়ে প্রিয়, নিজ সন্তান হযরত ইসমাইলকে (আ.) কোরবানি দেওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার কুদরতে হযরত ইসমাইলের (আ.) পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। হযরত ইব্রাহিমের (আ.) এ ত্যাগের মনোভাবের কথা স্মরণ করে প্রতিবছর মুসলমানরা প্রিয় পশু কোরবানি করেন।

করোনা মহামারির কারণে এবারও জাতীয় ঈদগাহ এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে জামাত হয়নি। মসজিদে মসজিদে জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে পাঁচটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে গত বছরের মতো এবারও কোলাকুলি না করার জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়। সবাইকে বাসা থেকে অজু করে মসজিদে মাস্ক পরে যেতে হবে। কাতারে দাঁড়াতে বলা হয় দূরত্ব রেখে।

ঈদ জামাত শেষে শুরু হয় পশু কোরবানির তোড়জোড়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবার পশু জবাইয়ের জন্য সব মিলিয়ে ৩৬৫টি স্থান নির্ধারণ করে দেয়, যা গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বুধবার দেশের কোথাও কোথাও বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। সকাল সাড়ে ১১টার পর ঢাকার কোথাও কোথাও এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলেও গরু-ছাগল জবাই বা মাংস কাটায় তা বড় ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। পশু কোরবানি শেষে রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ সম্পন্ন করেছে এবার।

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বঙ্গভবন থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে সরকারের পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় বঙ্গভবনের হলওয়েতে সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাষ্ট্রপতি পরিবারের সদস্য ও বঙ্গভবনের অতিপ্রয়োজনীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে ঈদের নামাজ পড়েন। মারাত্মক সংক্রামক করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের মতো এবারও ঈদে বঙ্গভবনের সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা বাদ দেওয়া হয়।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের বরাবরের মতো এবারও ঈদ শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের গজনবী রোডে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে (মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার-১) বসবাসরত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ফলমূল ও মিষ্টান্ন পাঠান তিনি।

কারাবন্দিদের জন্য বন্দিজীবনে তাদের আনন্দ দিতে প্রতিবছরই নানা আয়োজন করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দেড় দিন বন্দিদের ঘরোয়া পরিবেশের আমেজ দেওয়ার জন্য সকাল ৭টায় তাদের নিজ নিজ সেলে মুড়ি ও পায়েস পাঠানো হয়। মুড়ি ও পায়েস খাওয়ার পর বন্দিরা ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করেন। করোনার প্রাদুর্ভাব এড়াতে বন্দিরা কারা মসজিদের বিকল্প হিসেবে নিজ নিজ ওয়ার্ডে নামাজ পড়েছেন। ঈদের জামাত শেষে কারাবন্দিদের জন্য ১৭টি গরু কোরবানি করা হয়। ঈদের দিন দুপুরে ও রাতে বন্দিদের জন্য বিশেষ খাবারের আয়োজন করে কারা কর্তৃপক্ষ। ঈদের দিন দুপুরে বন্দিরা খান ভাত, গরু/খাসির মাংস, রুই মাছ ও আলুর দম। রাতে খান পোলাও, গরু/খাসির মাংস, রোস্ট, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিংকস ও পান-সুপারি।

ঈদের ছুটি শেষ না হতেই বৃহস্পতিবার থেকে রাজধানী ফিরতে শুরু করেন সাধারণ মানুষ। বাস, ট্রেন, লঞ্চ ও ফেরীতে ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। গতকাল শুক্রবার ভোর থেকে আবারও ১৪ দিনের লকডাউন শুরু হয় সারাদেশে।

চট্টগ্রামে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদের জামাত :চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, বন্দর নগরী চট্টগ্রামে করোনাভাইরাস সংক্রমণের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টায় চট্টগ্রামে প্রথম ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় নগরের জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদে। চট্টগ্রামের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা নিজ নিজ এলাকার মসজিদে পড়েন ঈদের নামাজ। ঈদের নামাজ শেষে করোনাভাইরাস মহামারি থেকে দেশ ও জাতির মুক্তি কামনা করে মোনাজাত করেন মুসল্লিরা।

করোনা থেকে মুক্তির প্রার্থনা :সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে বৃষ্টিস্নাত সকালে মসজিদে মসজিদে পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের পাশাপাশি জামাত শেষে বিশেষ দোয়ায় মহামারি করোনা থেকে মুক্তির প্রার্থনা করা হয়। সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্দেশে এবারও নগরীর ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহসহ কোনো ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়নি। সকাল ৮টায় হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার মসজিদে নগরীর প্রধান ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে এ মসজিদে সামাজিক দূরত্ব মেনে শত শত মানুষ ঈদের জামাতে অংশ নেন। নগরীর পাড়া-মহল্লার প্রায় এক হাজার ১০০ মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

খুলনায় শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা :খুলনা ব্যুরো জানায়, যথাযোগ্য মর্যাদা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে খুলনায় গত বুধবার পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমান মসজিদে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক মহামারি থেকে মুক্তি কামনা করে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ মোনাজাত। সকাল ৮টায় ঈদের প্রধান জামাত খুলনা টাউন জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা সিটি করপোরেশন পরিচালিত বায়তুন নূর জামে মসজিদে সকাল সোয়া ৮টা এবং সোয়া ৯টায় অনুষ্ঠিত হয় দুটি জামাত। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঈদের জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হয়।



মন্তব্য করুন