কিংবদন্তি গণসংগীতশিল্পী ফকির আলমগীর আর নেই। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল শুক্রবার রাতে তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য এই শিল্পীর মৃত্যুতে সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

তার অসামান্য ভরাট কণ্ঠে গাওয়া 'ও সখিনা গেছস কিনা ভুইল্লা আমারে/আমি অহন রিসকা চালাই ঢাহা শহরে' গানটি পাঁচ দশকের বেশি সময়জুড়ে বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এ ছাড়া 'দেহেরও ভিতরে ডাইলে চাইলে', 'আহারে কালু মাদবর', 'ঘর করলাম না আমি', 'হঠাৎ কোন পথে', 'কামিলেরা কাম করিয়া', 'কালো কালো মানুষের দেশে'সহ হাজারেরও বেশি গানের মাধ্যমে তিনি এ দেশের সব শ্রেণির মানুষের গভীর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফকির আলমগীরের বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তিনি স্ত্রী ও তিন সন্তান রেখে গেছেন। তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন ছেলে মাশুক আলমগীর। তিনি বলেন, 'গতকাল রাত ১০টার দিকে ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় বাবার হার্ট অ্যাটাক হয়। রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালের কভিড আইসিইউ ইউনিটের ইনচার্জ ডা. আমিনা সুলতানা বাবার মৃত্যু ঘোষণা করেন।'

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ সমকালকে জানান, আজ শনিবার দুপুর ১২টায় তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে খিলগাঁও কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হবে। বাদ জোহর খিলগাঁও মাটির মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে দেশের সংগীতাঙ্গনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা কখনও পূরণ হওয়ার নয়। তার গান তরুণ প্রজন্মের মাঝে দেশপ্রেমের নবজাগরণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের সংগীতাঙ্গনে, বিশেষ করে গণসংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলতে তার ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ফকির আলমগীরের চলে যাওয়ার সংবাদে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। নন্দিত এই শিল্পীর শূন্যতা কখনও পূরণ হবে না বলে মনে করেন দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের গুণী ব্যক্তি এবং সংগীতপ্রেমী অগণিত মানুষ।

দীর্ঘদিনের সংগীত সহযোদ্ধার চলে যাওয়ায় খবর বিমর্ষ করেছে ফেরদৌস ওয়াহিদকে। তিনি বলেন, 'ফকির আলমগীর দেশের সংগীতে কতটা অবদান রেখেছেন, তা বলে শেষ করা যাবে না। তিনি যত বড় মাপের শিল্পী ছিলেন, তত বড় মনের মানুষ ছিলেন। ফকির আলমগীরের তুলনা চলে শুধু তার সঙ্গেই।'

কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরী বলেন, 'ফকির আলমগীর ছিলেন সংগীত জগতের এক মহীরুহ। একই সঙ্গে ছিলেন সাদাসিধে নিখাদ ভালো মানুষ। এমন একজন শিল্পীর চলে যাওয়া কত কষ্টের, তা বলে বোঝানো যাবে না।'

দুই ডোজ টিকা নেওয়া সত্ত্বেও গত ১৪ জুলাই ফকির আলমগীরের করোনাভাইরাস রিপোর্ট 'পজিটিভ' আসে। পরদিনই তাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালের কভিড ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৮ জুলাই তাকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। পরে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ফকির আলমগীরকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। টানা আট দিন করোনাভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গেলেন তিনি।

ফকির আলমগীর ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাব মো. হাচেন উদ্দিন ফকির, মা বেগম হাবিবুন্নেসা। ফকির আলমগীর কালামৃধা গোবিন্দ হাইস্কুল থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে স্নাতক পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় এমএ পাস করেন। তার সংগীতচর্চার শুরু হয় ষাটের দশকে। গানের পাশাপাশি বংশীবাদক হিসেবে তার খ্যাতি ছিল। বাংলাদেশের সব ঐতিহাসিক আন্দোলনে তিনি তার গান দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন।

তিনি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠী ও গণশিল্পী গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে যোগ দেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা। স্ব্বাধীনতার পর পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে দেশজ সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়ে বাংলা পপ গানের বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন ফকির আলমগীর।

তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা, গণসংগীত চর্চার আরেক সংগঠন গণসংগীতশিল্পী পরিষদের সাবেক সভাপতি। তিনি নিয়মিত লেখালেখিও করতেন। 'মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের গান', 'গণসংগীতের অতীত ও বর্তমান', 'আমার কথা', 'যারা আছেন হৃদয়পটে'সহ বেশ কয়েকটি বই প্রকাশ হয়েছে তার।

সংগীতে অবদানের জন্য 'একুশে পদক', ' শেরেবাংলা পদক', 'ভাসানী পদক', 'সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড অব অনার', 'তর্কবাগীশ স্বর্ণপদক', 'জসীমউদ্‌দীন স্বর্ণপদক', 'কান্তকবি পদক', 'গণনাট্য পুরস্কার', 'পশ্চিমবঙ্গ সরকারের 'মহাসম্মাননা', 'ত্রিপুরা সংস্কৃতি সমন্বয় পুরস্কার', 'চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড বিশেষ সম্মাননা' ও 'বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ'সহ আরও অনেক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

তবে সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার ফকির আলমগীর জীবদ্দশায় পেয়েছেন, তা হচ্ছে কয়েক প্রজন্মের বাঙালি শ্রোতার অকৃত্রিম ভালোবাসা। আগামীতে বহু প্রজন্ম ফকির আলমগীরের গানে উদ্বেলিত হবেন বলে মনে করছেন সংগীতবোদ্ধারা।

ফকির আলমগীরের মৃত্যুতে অন্যদের মধ্যে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।









মন্তব্য করুন