গত কয়েক বছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার যৌক্তিক দাম মেলেনি। গরুর চামড়া সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি হয়েছে। তবে গতবারের চেয়ে দাম কিছুটা বেশি ছিল। ছাগলের চামড়ার অবস্থা ছিল বেশি খারাপ, যার বেশিরভাগই কোনো টাকা ছাড়া বিনিময় হয়েছে। অনেক জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। গরুর চামড়াও কিছু নষ্ট হয়েছে। এবার ফড়িয়াদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। কোরবানিদাতাদের বেশিরভাগই মসজিদ ও মাদ্রাসায় চামড়া দান করেছেন। বেশ কয়েক বছর ধরে এভাবেই বঞ্চিত হচ্ছেন গরিব আত্মীয় ও প্রতিবেশী।

চামড়ার স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারদর, চাহিদা, সরবরাহ ও রপ্তানির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে ঈদুল আজহার আগে কোরবানির পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট ৪০ থেকে ৪৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৩ থেকে ৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সারাদেশে খাসির ১৫ থেকে ১৭ টাকা এবং বকরির চামড়া ১২ থেকে ১৪ টাকা নির্ধারিত ছিল।

সরেজমিন দেখা যায়, ঢাকায় গরুর চামড়া গড়ে ১৫ থেকে ২৫ টাকা বর্গফুটে বিক্রি হয়েছে। সমকালের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী ঢাকার বাইরে বিক্রি হয়েছে আরও কম দরে। সাধারণত গরুর চামড়া ১৫ থেকে ৪০ বর্গফুট পর্যন্ত হয়। সারাদেশে ১০০ থেকে ৪০০ টাকায় প্রতিটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, একটি গরুর চামড়ায় ৬০ থেকে ৭০ টাকার লবণ দিতে হয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ গড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা ব্যয় হয়। আড়ত ও ট্যানারিগুলোর মোট খরচ ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। এসব খরচ বাদ দিয়ে প্রতি বর্গফুট চামড়ার দর প্রথম স্তরে ঢাকায় হওয়া উচিত অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ টাকা।

হাজারীবাগের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন সমকালকে বলেন, এবার মহল্লায় ঘুরে বিভিন্ন বাসা থেকে খুচরা হিসেবে কেনেননি। মসজিদ ও মাদ্রাসা থেকে একসঙ্গে ৫০০ থেকে ৭০০ চামড়া কিনেছেন। গড় হিসাব করে প্রতিটি চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দাম দিয়ে কিনেছেন। এতে প্রতি বর্গফুটের দাম পড়েছে ১৬ থেকে ২৪ টাকা। এই চামড়া পোস্তার আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের কাছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। প্রতিটি চামড়ায় ১০০ টাকার বেশি লাভ হয়েছে। সরকার নির্ধারিত দর অনুযায়ী ঢাকায় প্রতিটি লবণযুক্ত ৩০ বর্গফুট গরুর চামড়া এক হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। লবণ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন মিলে সব খরচ ১৫০ টাকা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের গড়ে ১০০ টাকা লাভ ধরলেও প্রথম ধাপে কোরবানিদাতা কিংবা মসজিদ-মাদ্রাসা থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় কেনার কথা। কিন্তু এর অর্ধেক দামে বেচাকেনা হয়েছে। রাজধানীর কাজীপাড়ায় চামড়া কিনেছেন ফারুক হোসেন নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী। তিনি জানান, ছোট চামড়া ২৫০ টাকা ও বড় চামড়া ৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে কিনেছেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ট্যানারি রিলায়েন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান মিয়া সমকালকে বলেন, গত কয়েক বছর তিনি লবণ ছাড়া চামড়া কেনেননি। এবার ঢাকার চার হাজার চামড়া কিনে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। এই চামড়া গড়ে তিনি ৭৫০ টাকা দর দিয়েছেন। ট্যানারিগুলো এই দরে কিনলেও আড়তদাররা অনেক কমে কিনেছেন। এতে চামড়ার প্রাথমিকভাবে ভালো দাম না পাওয়ায় গরিবরা বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে, ট্যানারিগুলোকে বেশি দামে চামড়া কিনতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, এবার সরকার দু'দিন ঢাকায় চামড়া না আনার নির্দেশনা দিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে চামড়া নষ্ট হবে না। ঢাকার বাইরে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ হয়েছে। ফলে ট্যানারিগুলো ভালো মানের চামড়া পাবে। আর যারা লবণ দিয়েছেন, তারাও ভালো দাম পাবেন। তিনি আশা করেন, এখন পরিবেশ দূষণ থেকে রেহাই পেলে ধীরে ধীরে চামড়ার সংকট কাটবে।

লাভবান ট্যানারি মালিক ও আড়তদার : ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা যে দামে কিনবেন, সেই দর নির্ধারণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর ফলে প্রথম ধাপে দরের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতি থাকে না। বিশেষজ্ঞরা কোরবানিদাতা কত টাকায় বিক্রি করবেন তা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এতে সাড়া দেননি ট্যানারি মালিকরা। এ সুযোগে ট্যানারি ও আড়তদারের প্রতিনিধি এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যত কম দামে পারেন, চামড়া কিনেছেন। আর লবণযুক্ত চামড়ার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কমে কেনার সুযোগ নিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। এর ফলে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরাই লাভবান হবেন। আর বঞ্চিত হলেন গরিব মানুষ।

পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তার আড়তে প্রতিটি ছোট চামড়া ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা ও বড় চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। আকারে অনেক বড় চামড়া ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা দর দিয়েছেন আড়তদাররা। বড় চামড়া তারা লবণ দিয়ে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান সেখানকার আড়তদার মো. মতিন মিয়া। তিনি বলেন, এবার আড়তগুলোর বকেয়া টাকা পুরোপুরি না দেওয়ায় নির্ধারিত দরে কেনা সম্ভব হয়নি। মাঠে চামড়া কিনতে মৌসুমি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টাকা না দিলে চামড়ার দাম ভালো পাওয়া যায় না। গত বছর টাকা না দেওয়ায় খুচরা ক্রেতারা মাঠে যাননি। এতে অনেক বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছে। এবার কিছু টাকা দিয়েছেন ট্যানারি মালিকরা। এ কারণে এবার কিছুটা দাম মিলেছে।

লালবাগের পোস্তার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আফতাব খান সমকালকে বলেন, এবার ঢাকাসহ সারাদেশেই লবণ দিয়ে চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে দামে কিছুটা হেরফের হয়েছে। চামড়া নষ্ট হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকার বাইরের চামড়ার দাম কিছুটা কম থাকায় অনেকে গভীর রাতে ঢাকায় লবণ ছাড়া চামড়া নিয়ে এসেছেন। বেশি সময় লবণ ছাড়া থাকায় অনেকের চামড়া নষ্ট হয়েছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ সমকালকে বলেন, সার্বিকভাবে অন্য বছরের চেয়ে এবার চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ হয়েছে। তেমন চামড়া নষ্ট হয়নি। তবে গত বছরের চেয়ে এবার ৮ থেকে ১০ শতাংশ কোরবানি কম হওয়ায় চামড়া কম হবে। তিনি বলেন, এবার লবণ দেওয়া চামড়া ট্যানারি মালিকরা সরকার নির্ধারিত দামেই কিনবেন। এখন প্রাথমিকভাবে লবণ ছাড়া চামড়া কিছুটা কম দামে বেচাকেনা হলেও গত বছরের চেয়ে ভালো দাম পেয়েছেন।

এবারও নষ্ট হয়েছে চামড়া :গত বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার পোস্তা ও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের আশপাশের বেশকিছু আড়তের মোকামের সামনের প্রধান সড়কে শত শত নষ্ট চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ওই দিন সংগ্রহ করা কোরবানির পশুর চামড়ার দাম না পেয়ে ফেলে গেছেন কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ী। তারা অভিযোগ করেছেন, প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনে আড়তদাররা দর দিতে চাননি। গভীর রাত পর্যন্ত আড়তে আড়তে ঘুরেও অনেকে বিক্রি করতে পারেননি। আবার কিছু আড়তদার বসিয়ে রেখে শুধু গাড়ি ভাড়ার টাকা দিতে চেয়েছেন। তখন রাজি না হওয়ায় আড়ত বন্ধ করে চলে গেছেন। এ কারণে ফেলে রেখে চলে গেছেন। কোরবানির পশুর চামড়া নালা-নর্দমাতেও ফেলার কথা জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরশনের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। এসব চামড়া নিয়ে করপোরেশনের কর্মীরা বেকায়দায় পড়েছেন বলে বৃহস্পতিবার দুপুরে কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম তদারকিবিষয়ক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

মৌসুমি ব্যবসায়ী আবু জাফর জানান, ঈদের দিন খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় চামড়া কিনছেন আড়তদারা। এর পরে তিনি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় গরুর চামড়া সংগ্রহ করে রাতে আড়তে নিয়ে যান। আড়তদাররা গড়ে ২০০ টাকা করে দাম দিতে চান। আড়তে আড়তে সারারাত ঘুরে বিক্রির চেষ্টা করেন। কিন্তু গভীর রাতে চামড়া পচে যাওয়ার কথা বলে শেষ পর্যন্ত কোনো দাম দিতে রাজি হয়নি। এ কারণে ফেলে দিয়ে চলে আসতে হয়েছে। ওই রাতে তার মতো অনেকেই চামড়া ফেলে দিয়ে এসেছেন বলে জানান তিনি।

মন্তব্য করুন