করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী অবস্থাতেই ঈদুল আজহা উপলক্ষে শিথিল হয়েছিল লকডাউন। আট দিন পর ঈদের রেশ কাটার আগেই আবার দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ১৪ দিনের লকডাউন। গতকাল শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শুরু হওয়া পূর্ব ঘোষিত লকডাউনের প্রথম দিনে ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলো ছিল ফাঁকা। ছুটির দিনেও দেখা গেছে ব্যাপক কড়াকড়ি। পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি দেশজুড়ে সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদেরও দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

চলতি দফার লকডাউন চলবে ৫ আগস্ট মধ্যরাত পর্যন্ত। এই সময়ে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, চলমান এই লকডাউন হচ্ছে 'কঠোরতম'। আগের বিধিনিষেধে শিল্পকারখানা চালু থাকলেও এবার বন্ধ থাকছে প্রায় সব শিল্পকারখানাও।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা হুহু করে বাড়তে থাকায় বিশেষজ্ঞদের সুপারিশে দেশজুড়ে ১ জুলাই থেকে দুই সপ্তাহ লকডাউন বলবৎ ছিল। তাতেও সংক্রমণ বা মৃত্যুর হার কমানো যাচ্ছিল না। গ্রেপ্তার, জরিমানা করেও ওই লকডাউনের শেষ দিকে এসে মানুষকে সেভাবে আটকে রাখা যাচ্ছিল না। অনেকেই রাস্তায় বের হতে শুরু করেন, বিধিনিষেধ ভেঙে দোকান খুলতে শুরু করেন পাড়া-মহল্লার ব্যবসায়ীরাও।

এমন পরিস্থিতিতে ঈদ উদযাপনে ১৪ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত সব বিধিনিষেধ শিথিলের ঘোষণা আসে। একই সময়ে ঘোষণা আসে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে আবারও বিধিনিষেধগুলো কার্যকর হবে।

গত বৃহস্পতিবার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন টানা ১৪ দিনের এই বিধিনিষেধকে 'সবচেয়ে কঠোরতম' হিসেবে অভিহিত করে তা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতাও চান।

পূর্ব ঘোষিত সেই লকডাউনের প্রথম দিন গতকাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, রংপুর, সিলেট, বরিশাল ও ময়মনসিংহের মতো বিভাগীয় শহর ছাড়াও জেলা ও উপজেলা শহরগুলোও ছিল ফাঁকা। সড়কে যেমন গণপরিবহন চলেনি, তেমনি রিকশার চলাচলও ছিল একেবারেই কম। বিধিনিষেধ মানাতে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এমনিতেই ঈদের ছুটির পর শহরগুলোর চিত্র স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। তা ছাড়া শুক্রবার হওয়ায় লোকজনের চলাচলও ছিল কম। এক-দু'দিন পরে হয়তো লোকজনের চলাচল বাড়তে পারে; তা ঠেকাতে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগের বিধিনিষেধের মতোই এবারও সব সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস, সড়ক, রেল ও নৌপথে গণপরিবহন, অভ্যন্তরীণ উড়োজাহাজসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে। বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকিট বা প্রমাণ দেখিয়ে গাড়িতে যাতায়াত করতে পারবেন। সরকারি কর্মচারীরা নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করে দাপ্তরিক কাজ ভার্চুয়ালি সম্পন্ন করবেন।

শপিংমল, মার্কেটসহ সব দোকানপাট, সব পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে। চলমান এই কঠোর বিধিনিষেধে সব ধরনের শিল্পকারখানা বন্ধের ঘোষণা রয়েছে। তবে খাদ্য ও খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণ মিল-কারখানা এবং ওষুধ, অক্সিজেন ও কভিড-১৯ প্রতিরোধে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদনকারী শিল্প এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে। কোরবানির পশুর চামড়া পরিবহন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমও কঠোর বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে।

পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ও জরুরি পরিষেবা যেমন- কৃষিপণ্য-উপকরণ, খাদ্যশস্য-খাদ্যদ্রব্য পরিবহন বা বিক্রি, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, করোনার টিকাদান, ফায়ার সার্ভিস, টেলিফোন, ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা, ডাকসেবা, ব্যাংক, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ অন্যান্য জরুরি বা অত্যাবশ্যকীয় পণ্য-সেবার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট অফিসের কর্মচারী ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে যাতায়াত করতে পারবে। কাঁচাবাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। টিকা কার্ড দেখিয়ে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে। খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পার্সেলে খাবার বিক্রি করতে পারবে।

সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, বিধিনিষেধ চলাকালে ব্যাংকে লেনদেন চলবে সীমিত সময়ের জন্য। ঈদের ছুটি শেষে ব্যাংকগুলো আগামীকাল রোববার থেকে গ্রাহক চাহিদামতো শাখা খোলা রাখতে পারবে। লেনদেন হবে সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত।

এ ছাড়া এই লকডাউনে সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধের পাশাপাশি ফেরিতে যাত্রীবাহী সব ধরনের গাড়ি ও যাত্রী পরিবহনও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে শুধু জরুরি পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স পারাপার করা যাবে।

এদিকে রাজধানীর প্রবেশপথ সদরঘাট, গাবতলী, আবদুল্লাহপুর, পোস্তগোলা, যাত্রাবাড়ী ও বাবুবাজার এলাকায় গতকাল ভোর থেকে পরিস্থিতি ছিল একেবারেই ভিন্ন। লকডাউন শুরুর আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ফেরা শত শত লোক বাসায় যেতে গাড়ি না পেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়ে।

গতকাল ভোর থেকেই গাবতলীসহ রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে চেকপোস্ট বসিয়ে অবস্থান নেয় পুলিশ। এসব এলাকায় দেখা যায়, সকাল ৭টার আগ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় গাড়ি ঢুকতে পারলেও এরপর থেকেই কড়াকড়ি শুরু হয়। দূরপাল্লার বাসগুলোর যাত্রীদের রাজধানীতে প্রবেশের আগেই নামিয়ে দেওয়া হয়। এতে কোথাও কোথাও গাড়ির লম্বা জটও দেখা দেয়। লোকজন হেঁটে রাজধানীতে ঢুকতে পারলেও বাসায় পৌঁছতে গাড়ি না পেয়ে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

গাবতলী-আমিনবাজার পয়েন্টে দায়িত্বে থাকা ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার এ এস এম মাহতাব উদ্দিন বলেন, সরকারের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী সকাল ৬টা থেকে বিধিনিষেধ কার্যকর হয়েছে। এরপর থেকে জরুরি কাজে নিয়োজিত ছাড়া কোনো যানবাহন চলার কথা নয়। তাই ঢাকায় কোনো গণপরিবহন যাত্রী নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। তবে বিধিনিষেধ শুরুর আগে অনেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। সে বিবেচনায় যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে হেঁটে রাজধানীর অংশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

গতকালও নানা অজুহাতে বাসা থেকে লোকজন বেরিয়েছেন। পুলিশের চেকপোস্টে আটকা পড়ে তাদের অনেকেই বলেছেন, হাসপাতালে যাচ্ছেন। কেউ বলেছেন, গ্রাম থেকে ফিরে বাসায় যাচ্ছেন। তবে তাদের এসব দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে না পেরে অনেককে জরিমানা গুনতে হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) ইফতেখাইরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিনা কারণে ঘর থেকে বের হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪০৩ জন। এর বাইরে ভ্রাম্যমাণ আদালত ২০৩ জনকে বিভিন্ন অঙ্কের জরিমানা করেছেন। এ ছাড়া পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ৪৪১টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

এর আগে ১ থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত চলা লকডাউনে বিধিনিষেধ ভঙ্গ করার অভিযোগে পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ৯ হাজার ২ জনকে গ্রেপ্তার করেছিল। ওই সময় পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২ হাজার ৯৯৯ জনকে ৩৯ লাখ ১২ হাজার ৩৩০ টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল।

দেশজুড়ে র‌্যাবের ১৫৮ চেকপোস্ট :লকডাউনের প্রথম দিন বিধিনিষেধ মানাতে সারাদেশে র‌্যাবের ১৫৮টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। এ ছাড়া ১৬৮টি টহল টিম বিধিনিষেধ মানানো ও লোকজনকে সচেতন করতে দায়িত্ব পালন করেছে। র‌্যাব সদর দপ্তর থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

র‌্যাব সদর দপ্তর জানায়, বিনা প্রয়োজনে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণে র‌্যাবের জনসচেতনতামূলক মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন। এ ছাড়া র‌্যাব জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে।

গতকাল বিধিনিষেধ অমান্য করায় দেশব্যাপী চালানো ১২টি ভ্রাম্যমাণ আদালতে ৯৫ জনকে ৪৮ হাজার ৭০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধকরণে বিনামূল্যে এক হাজারের বেশি মাস্ক বিতরণ করা হয় এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হ্যান্ড স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হয়।











মন্তব্য করুন