গত এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে তরল পেট্রোলিয়াম (এলপি) গ্যাসের দাম ঘোষণা করেছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। যদিও বাজারে নির্ধারিত দামে মিলছে না সিলিন্ডার গ্যাস; বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে গ্রাহককে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই গতকাল বৃহস্পতিবার অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে আগস্ট মাসের জন্য এলপির দর ঘোষণা করে বিইআরসি। নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, আগস্টে বেসরকারি কোম্পানির ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করতে হবে ৯৯৩ টাকায়। জুলাই মাসে সমপরিমাণ গ্যাসের বিইআরসি নির্ধারিত দাম হচ্ছে ৮৯১ টাকা।

অর্থাৎ প্রতি সিলিন্ডারে এর দাম বাড়ছে ১০২ টাকা।

পরিবহনে ব্যবহূত এলপি গ্যাস, যা অটো গ্যাস নামেও পরিচিত, সেটির প্রতি লিটারের দাম ৪৮ টাকা ৭১ পয়সা নির্ধারণ করেছে কমিশন। জুলাইয়ে প্রতি লিটার অটো গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৪ টাকা।

প্রসঙ্গত, শুরু থেকেই রান্নার জন্য জনপ্রিয় সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের হাতে রয়েছে। এ নিয়ে গ্রাহকদের ছিল নানা অভিযোগ। এমন প্রেক্ষাপটে গত এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সারাদেশের জন্য এলপিজির একই দাম বেঁধে দেয় বিইআরসি। এর পর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রতি মাসেই নতুন দর ঘোষণা করে যাচ্ছে কমিশন। কিন্তু এর কোনো প্রভাব পড়ছে না বাজারে।

কমিশনের নির্ধারিত দরে সন্তুষ্ট নয় ব্যবসায়ী ও গ্রাহকরাও। গ্রাহকদের অভিযোগ, বাজার থেকে তো বাড়তি দামেই গ্যাস কিনতে হচ্ছে। তাহলে দাম ঘোষণা করে কী লাভ! আর এলপিজি ব্যবসায়ীরাও সরাসরি বলছেন, তাদের পক্ষে নির্ধারিত দাম মানা সম্ভব নয়। কারণ বিইআরসির দামে গ্যাস বিক্রি করলে লোকসান দিতে হবে। যৌক্তিকভাবে দাম নির্ধারণ করা না হলে তাদের টিকে থাকাই মুশকিল হয়ে যাবে।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসির চেয়ারম্যান জানান, জুলাই মাসের জন্য সৌদি আরামকো কর্তৃক প্রোপেন ও বিউটেন উভয়েরই ঘোষিত দাম প্রতি টন ৬২০ ডলার। প্রোপেন ও বিউটেনের মিশ্রণ অনুপাত ৩৫ :৬৫ বিবেচনায় প্রোপেন ও বিউটেনের গড় সৌদি সিপি প্রতি টন ৬২০ ডলার বিবেচনা করে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সরকারি পর্যায়ে সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম আগের মতোই ৫৯১ টাকা থাকবে। কারণ এই দামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের কোনো সম্পর্ক নেই।

আবাসিক ও শিল্পে রেটিকুলেটেড সিস্টেমে সরবরাহ করা এলপিজির দাম ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি ৭১ টাকা ৯৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮০ টাকা ৪৩ পয়সা অথবা লিটার হিসাবে শূন্য দশমিক ১৫৯৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ১৭৮৭ টাকা নির্ধারণ করেছে কমিশন।

অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কমিশন সদস্য মোহাম্মদ আবু ফারুক, মকবুল-ই এলাহী, বজলুর রহমান ও কামরুজ্জামান।

দাম নিয়ে বিড়ম্বনা :জুলাইয়ে বেসরকারি কোম্পানির ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮৯১ টাকা। কিন্তু দেশের কোথাও সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস কিনতে পারেননি গ্রাহকরা। গতকালও পটুয়াখালীতে ১০৮০ টাকা, লক্ষ্মীপুরে সর্বনিম্ন ১০৫০ এবং সর্বোচ্চ ১১০০ টাকা, নাটোর ও নওগাঁয় ১০৫০ টাকা, খুলনায় ১১শ টাকা এবং ময়মনসিংহে ১০২০ টাকায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে গ্রাহকদের।

এক দশক আগেও বেশি দামে সিলিন্ডার গ্যাস কিনতে হতো গ্রাহকদের। পরে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সহযোগিতায় এ খাতের বাজার সম্প্রসারিত হয়। অনেক কোম্পানি এলপিজির আমদানি ও সরবরাহে জড়িত হয়। বিনিয়োগ হয় শত শত কোটি টাকা। দামও পড়তে শুরু করে। এর পরও দাম ক্রেতাদের নাগালের বাইরে থেকে যায়। গ্রাহকরা অভিযোগ করেন, ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করেন। এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়। আদালতের আদেশে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গত ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো সারাদেশের জন্য এলপিজির একই দাম বেঁধে দেয়।

ক্রেতারা বলছেন, সরকার শুধু দাম ঘোষণা করেই দায়িত্ব শেষ করছে। মাঠে তা কার্যকর হচ্ছে কিনা, তা কেউই দেখছে না। এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিইআরসি জানাচ্ছে, সারাদেশে তদারকি করার মতো জনবল তাদের নেই। এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এগিয়ে আসতে হবে। গ্রাহককে সচেতন হতে হবে। অভিযোগ পেলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলোচনা চান ব্যবসায়ীরা :এলপিজির খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোম্পানি যে দামে তাদের কাছে গ্যাস বিক্রি করে, তাতে কমিশন যোগ করলে সরকার ঘোষিত দরে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রি করা সম্ভব নয়।

এলপি ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা বারবার দাম ঘোষণার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছেন। একাধিক বৈঠক করেছেন কমিশনের সঙ্গে। চিঠি দিয়েছেন, কিন্তু তাদের মতামত বিবেচনা করা হচ্ছে না।

ওমেরা এলপিজির প্রধান নির্বাহী শামসুল আলম সমকালকে বলেন, দাম বাড়ছে, না কমছে, সেটা বিষয় নয়। মূল সমস্যা পদ্ধতিতে। যে ফর্মুলায় বিইআরসি দাম সমন্বয় করছে তাতে গলদ রয়েছে। এ নিয়ে আমরা অনেকবার কথা বলেছি। কমিশন আলোচনা করতে রাজি হয়েছে। বিইআরসি যখন চাইবে, ব্যবসায়ীরা তখনই বসবেন। তিনি বলেন, দাম মানব না- এমন গোঁ ধরে তো বসে নেই। এ খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। তাই একটা সমাধানে আসতে হবে। এটি লাভ-ক্ষতির বিষয় নয়; ব্যবসায়ীদের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই একটি সুষ্ঠু সমাধান প্রয়োজন।

অভিযান বন্ধে ই-মেইল করেছে লোয়াব :বিইআরসি কর্তৃপক্ষ বলছে, গণশুনানি ছাড়া লোয়াবের বক্তব্য শোনার সুযোগ নেই। যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, তা ব্যবসায়ীদের মানতে হবে। না হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। গত ১২ জুলাই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এক অভিযানে বাড়তি দরে এলপিজি বিক্রির কারণে একটি অটো গ্যাস ফিলিং স্টেশনকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। ওই দিনই এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াব ই-মেইল করে বিইআরসিকে। এতে বলা হয়, গত ১২ এপ্রিল ঘোষিত মূল্য সংশোধনের জন্য এলপি গ্যাস অপারেটরদের ১৮টি আবেদন শুনানির অপেক্ষায়। আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের অভিযান বন্ধ রাখা হোক।

এ বিষয়ে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেছেন, তারা ব্যবসায়ীদের আবেদন পেয়েছেন। ৭ জুলাই শুনানির তারিখ ঠিক করলেও করোনা পরিস্থিতি বিবেচনা করে তা পেছানো হয়েছে। ৫ আগস্ট লকডাউন শেষ হলে দ্রুত শুনানির তারিখ ঘোষণা করা হবে।

সরকারি একটি কোম্পানিসহ বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানি, মজুদ ও বিতরণে সক্রিয় রয়েছে ২৯টি প্রতিষ্ঠান। বার্ষিক এলপিজি ব্যবহারের পরিমাণ ১০ লাখ টন, যার ৯৮ শতাংশ আসে বেসরকারি খাত থেকে। ৩৮ লাখ গ্রাহকের জন্য সারাদেশে রয়েছে তিন হাজার পরিবেশক ও ৩৮ হাজার খুচরা বিক্রেতা।



.

মন্তব্য করুন