সন্তানের জীবন বাঁচাতে মায়ের জীবন উৎসর্গ করার উদাহরণ মাঝেমধ্যেই মানুষকে শোকবিহ্বল করে তোলে। এ রকমই এক দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন চট্টগ্রামের এক নারী। মৃত্যু প্রায় অবধারিত জেনেও করোনায় আক্রান্ত ওই নারী তার আইসিইউ সাপোর্ট সমর্পণ করেন একই রোগে সংকটাপন্ন তার ছেলেকে। এর কিছুক্ষণ পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন সেই মমতাময়ী মা। এ ঘটনায় চিকিৎসকরাও মর্মাহত হয়েছেন।

হাসপাতাল সূত্র ও পারিবারের সদস্যরা জানান, দিন দশেক আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন কানন প্রভা পাল (৬৭)। এর মধ্যে তার ছেলে শিমুল পালও আক্রান্ত হন করোনায়। পরে তাকেও ভর্তি করা হয় একই হাসপাতালে। গত মঙ্গলবার শিমুল পালের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন হয় আইসিইউর। কিন্তু হাসপাতালটির একটি আইসিইউ শয্যাও খালি ছিল না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালসহ নগরের বেশ কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও খালি পাওয়া যায়নি কোনো আইসিইউ শয্যা।

এ পরিস্থিতিতে শিমুল পালের শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যেতে থাকে। ছেলের শারীরিক অবস্থা খারাপের খবর জানতে পেরে ছটফট করতে থাকেন মা। পরে তিনি চিকিৎসকদের অনুরোধ করেন যাতে তার আইসিইউ সাপোর্ট সরিয়ে ছেলেকে দেওয়া হয়। মঙ্গলবার রাতে ছেলের জন্য আইসিইউ বেড ছেড়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই মারা যান কানন পাল।

শিমুল পালের মামা টিটন পাল সমকালকে বলেন, 'বোনের এমন করুণ মৃত্যু হবে কখনও কল্পনাও করতে পারিনি। ছেলেকে নতুন জীবন দিয়ে তিনি চলে গেলেন। চিকিৎসাধীন শিমুল পালের শারীরিক অবস্থাও তেমন ভালো নেই। বুধবার সকালে তার অক্সিজেন সেচুরেশন ৮০ থাকলেও দুপুরের দিকে তা ৫০-এ নেমে যায়। সঙ্গে আছে শ্বাসকষ্টও। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সে এখনও ঝুঁকিমুক্ত নয়।'

ছেলেকে বাঁচাতে মায়ের শয্যা ত্যাগ করে মৃত্যুর ঘটনাটি দাগ কাটে হাসপাতালের চিকিৎসকসহ চট্টগ্রামের সবার মনে। কানন পাল চট্টগ্রাম নগরের সিঅ্যান্ডবি কলোনি এলাকার বাসিন্দা। জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ফোকাল পারসন হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আবদুর রব মাসুম বলেন, ছেলের জন্য জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউর প্রয়োজন শোনার পর থেকেই ছটফট করছিলেন ওই মা। সন্তানকে বাঁচাতে নিজের আইসিইউ সাপোর্টটি ছেলের জন্য দিয়ে দিতে বলেন তিনি। তখন তার শারীরিক অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। এ কারণে আমরা তাতে রাজি হইনি। কিন্তু তিনি পরে অনেক জোরাজুরি করায় পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মতামত নিয়ে ওই মাকে আইসোলেশন সেন্টারে সরিয়ে নিয়ে ছেলেকে তার আইসিইউ শয্যাটি দেওয়া হয়। এর ঘণ্টা খানেক পরই তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি খুবই হৃদয়বিদারক।

হাসপাতালের আইসিইউ বেডের প্রধান ডা. রাজদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, তখনকার মুহূর্তটি চিকিৎসদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। কেননা, মা ও ছেলে উভয়ের শারীরিক অবস্থায় খুব খারাপ ছিল। এমন দুর্ঘটনা আর কারও জীবনে যেন না আসে।

গত ১৫ জুলাই কানন পাল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের কভিড ইউনিটের মহিলা আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। এর কয়েক দিন পর তার ছেলে শিমুল পালও করোনায় আক্রান্ত হয়ে একই হাসপাতালের পুরুষ আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হন। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই কানন প্রভার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় ২২ জুলাই তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।





মন্তব্য করুন