করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। গত এক সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন করোনায় সংক্রমিত হয়ে মারা যাচ্ছেন দুই শতাধিক মানুষ। এ মহামারিতে দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ মাস ছিল জুলাই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, করোনাভাইরাসে মোট মৃতের ৩০ শতাংশই ঘটেছে এ মাসে।

নমুনা পরীক্ষা কমে আসায় এক সপ্তাহ পর গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ হাজারের নিচে নেমেছে দৈনিক শনাক্ত। তবে পুরো জুলাইয়ের তথ্য বিশ্নেষণ করে দেখা গেছে, দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত করোনা রোগীর প্রায় ২৭ শতাংশ পাওয়া গেছে এ মাসে।

করোনা মহামারির ৩০তম সপ্তাহে এসে আগের সপ্তাহের তুলনায় শনাক্ত বেড়েছে ৫৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ এবং মৃত্যু বেড়েছে ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশ। সেইসঙ্গে ২৯তম সপ্তাহের তুলনায় গত সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষা বেড়েছে ৫৯ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং সুস্থ হওয়ার সংখ্যা বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

শনাক্ত কমলেও বেড়েছে মৃত্যু :গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আগের দিনের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে। এ সময়ে করোনা সংক্রমিত আরও ২১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আগের দিন শুক্রবার ২১২, বৃহস্পতিবার ২৩৯ এবং বুধবার ২৩৭ জনের মৃত্যু হয়। করোনা সংক্রমিত হয়ে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৫৮ জনের মৃত্যু হয় গত মঙ্গলবার।

গত ৭ জুলাই প্রথমবারের মতো দৈনিক মৃত্যু দুইশ অতিক্রম করে। এরপর থেকে গতকাল পর্যন্ত মাত্র সাত দিন দৈনিক মৃত্যু ছিল দুইশ'র নিচে। এ পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত ২০ হাজার ৬৮৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

গতকাল আগের দিনের তুলনায় নমুনা পরীক্ষা প্রায় ১৫ হাজার কমে আসায় শনাক্ত রোগীও কমেছে সাড়ে চার হাজারের মতো। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৯ হাজার ৩৬৯ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর আগের দিন ১৩ হাজার ৮৬২ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়।

দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮৪ জনে পৌঁছাল। এর বিপরীতে আগের দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা সংক্রমিত হয়ে সুস্থতার সংখ্যা বেড়েছে। এই সময়ে আরও ১৪ হাজার ১৭ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আগের দিন শুক্রবার ১৩ হাজার ৯৭৫ জন সুস্থতার তালিকায় এসেছেন। এ নিয়ে করোনা সংক্রমিত ১০ লাখ ৭৮ হাজার ২১২ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ৩০ দশমিক ২৪ শতাংশ। আগের দিন এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ১৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের ৬৪৮টি পরীক্ষাগারে ৩০ হাজার ৯৭৬টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষা করা হয় ৩০ হাজার ৯৮০টি নমুনা। আগের দিন ৪৮ হাজার ৫৮৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল।

জুনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশে করোনা সংক্রমিত হয়ে ১৪ হাজার ৫০৩ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। জুলাই শেষে এ সংখ্যা পৌঁছায় ২০ হাজার ৬৮৫ জনে। সে হিসাবে গত মাসে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরও ৬ হাজার ১৮২ জন। অর্থাৎ করোনায় মোট মৃতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ২৯ দশমিক ৮৯ শতাংশই মারা গেছেন জুলাই মাসে।

গত ৩০ জুন দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ২৫৮। জুলাই মাস শেষে এ সংখ্যা ১২ লাখ ৪৯ হাজার ৪৮৪ জনে পৌঁছে। অর্থাৎ গত মাসে রোগী পাওয়া গেছে ৩ লাখ ৩৬ হাজার ২২৬ জন। মোট শনাক্ত রোগীর এক-চতুর্থাংশের বেশি তথা ২৬ দশমিক ৯১ শতাংশই পাওয়া গেছে জুলাইয়ে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, আগস্টে সংক্রমণ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। ঈদের আগে এক সপ্তাহের লকডাউন শিথিল করায় এমনটা আশঙ্কা করছেন তারা। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগরের সরকারি ১৭টি হাসপাতালের মধ্যে ১২টিতে আইসিইউর সব শয্যা পূর্ণ হয়ে গেছে। বাকি পাঁচটি হাসপাতালে শয্যা খালি রয়েছে মাত্র ১২টি। দেশের সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতাল মিলিয়ে মোট ১৩৮৭ আইসিইউ শয্যার মধ্যে খালি আছে ১৭৪টি। করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে সাধারণ শয্যাও কমে আসছে।

সর্বোচ্চ শনাক্তের হার বরিশালে :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা মহানগরে পাওয়া গেছে দেশের মোট শনাক্তের ২৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ রোগী। এদিন মহানগরে আগের দিনের ১৩ হাজার ৬৫৮ থেকে কমে ৮ হাজার ৫৮৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। তাই আগের দিনের ৩ হাজার ৩৯৭ থেকে কমে ২ হাজার ৫৮৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার আগের দিনের ২৪ দশমিক ৮৭ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।

বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে ঢাকায়। এ বিভাগে ১৩ হাজার ২৪টি নমুনা পরীক্ষা করে ৪ হাজার ২৭২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। আগের দিন এ বিভাগে ৫ হাজার ৫৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার আগের দিনের ২৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ।

গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে শনাক্ত করোনা রোগীর ৪৫ দশমিক ৬০ শতাংশই মিলেছে শুধু ঢাকা বিভাগে। অবশ্য নমুনা পরীক্ষায়ও এগিয়ে আছে এ বিভাগ। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রামে ২ হাজার ৮২৭, রংপুরে ২৩৩, সিলেটে ৩৪০, খুলনায় ৫৭১, রাজশাহীতে ৫২০, বরিশালে ৩২২ এবং ময়মনসিংহে ২৮৪ জনের শরীরে করোনাভাইরাস মিলেছে।

বিভাগভিত্তিক তালিকায় বরিশালে সবচেয়ে বেশি ৪৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ হারে রোগী শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রামে ৩৫ দশমিক ৭৮, সিলেটে ৩৫ দশমিক ৬৮, খুলনায় ২৮ দশমিক শূন্য ৬, ময়মনসিংহে ২৪ দশমিক ৭৬, রংপুরে ২৬ দশমিক ৩৬ এবং রাজশাহীতে সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ হারে রোগী পাওয়া গেছে।

মৃত্যুতেও শীর্ষে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। গত ২৪ ঘণ্টায় এ বিভাগে ৬৭ জন করোনা সংক্রমিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া খুলনায় ২৭, সিলেটে ৯, রাজশাহীতে ২২, বরিশালে ১০, রংপুরে ১৬ এবং ময়মনসিংহে ১২ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এদিন সরকারি হাসপাতালে ১৫৬, বেসরকারি হাসপাতালে ৪৯ এবং বাসায় মারা গেছেন ১৩ জন।

মৃতদের মধ্যে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে ১২০ জন, ৫১ থেকে ৬০ ও ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ৩৭ জন করে; ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে ১৭ জন, ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৬ জন এবং ১০ বছরের নিচে রয়েছে একজন। মৃতদের মধ্যে ১৩৪ জন পুরুষ এবং ৮৪ জন নারী।

মন্তব্য করুন