ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শনিরআখড়া ব্রিজ ধরে হেঁটে রাজধানীর দিকে ঢুকছে শত শত মানুষ। যাদের ভাগ্য ভালো, তাদের কেউ রিকশা কিংবা ভ্যানে চলছে। অনেকে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে যাচ্ছে। সবার কাঁধে-হাতেই ব্যাগ। মানুষের ভিড়ে লকডাউনের বিধিনিষেধ মানাতে স্থাপিত পুলিশের অস্থায়ী চেকপোস্টগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়ে ওই সড়কে।

গতকাল শনিবার দুপুরের দিকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে শুরু করে শনিরআখড়া-সাইনবোর্ড মোড় পর্যন্ত এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে সংশ্নিষ্টরা জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল অভিন্ন চিত্র।

যাত্রাবাড়ীতে রাজধানীর অন্যতম ওই প্রবেশপথের মতো একই দৃশ্য এর অদূরে পোস্তগোলা ব্রিজ এলাকাতেও। রাজধানীর অন্যান্য প্রবেশপথ- বাবুবাজার ব্রিজ, গাবতলী আর আব্দুল্লাহপুরের দৃশ্যও ভিন্ন কিছু ছিল না। এসব পথ হয়ে যে যেভাবে পারছে রাজধানীতে ঢুকেছে। সরেজমিন মিলেছে এমন চিত্র।

পোস্তগোলা ব্রিজের অদূরে ধলপুর এলাকায় শিশু কোলে নিয়ে হাঁটছিলেন শারমিন আক্তার। তার হাতেও কাপড়ের ব্যাগ। পাশাপাশি ছিলেন তার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন। ৮ বছর বয়সী ছেলের হাত ধরে হাঁটছিলেন তিনি। তার কাঁধে ঝুলছিল ব্যাগ। লকডাউনের মধ্যেও কোথা থেকে এলেন- জানতে চাইলে শারমিন বলছিলেন, স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই মিরপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে গিয়েছিলেন। কিন্তু গার্মেন্ট খুলে দেওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাকায় ফিরতে হলো।

শারমিনের স্বামী তোফাজ্জল একটু রেগে গিয়ে বললেন, 'চাকরি গেলে আপনি দেবেন? কত ভোগান্তি আর কষ্ট করে ঢাকা আসতে হয়েছে, তা আমরা ছাড়া কেউ জানে না।'

তিনি বলেন, ভোরে একরকম যুদ্ধ করে মাদারীপুরের বাংলাবাজার ফেরিঘাট থেকে ফেরিতে উঠতে পেরেছিলেন। শিমুলিয়ায় নেমে হাজার হাজার মানুষ দেখলেন। কীভাবে ঢাকায় আসবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত জনপ্রতি ৫০০ টাকা ভাড়ায় অটোরিকশায় পোস্তগোলা পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। সেখান থেকে মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকার বাসায় যেতে কোনো বাহন না পেয়ে হাঁটা শুরু করেছেন স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে। যাত্রাবাড়ী মোড়ে কথা হয় ঢাকায় ফেরা আরও কয়েক তরুণের সঙ্গে। তারা সবাই আশুলিয়া এলাকায় বিভিন্ন কারখানার কর্মী। তাদেরই একজন মানিক ছৈয়াল বলছিলেন, শরীয়তপুরের সখিপুর থেকে তারা এসেছেন। ট্রলারে জনপ্রতি ৪০০ টাকা দিয়ে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন। সেখান থেকে কয়েক দফা অটোরিকশা বদল করে ঢাকায় ঢুকতে পেরেছেন। তার ভাষ্য, বহু দিন ধরে বেকার। কারখানা চালু হওয়ায় ঢাকায় চলে এসেছেন। তবে কারখানা এলাকায় পৌঁছতেই পকেট খালি হয়ে যাবে।

পোস্তগোলা এলাকায় চেকপোস্টে দায়িত্বে থাকা পুলিশের শ্যামপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার কাজী রোমানা নাসরিন সমকালকে বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণায় শনিবার সকাল থেকেই পোস্তগোলা ব্রিজ হয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে কারখানার শ্রমিকরা ঢাকায় প্রবেশ করছে। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহনে যে যেভাবে পারছে, রাজধানীতে প্রবেশ করছে। স্বাস্থ্যবিধি মানাতে চেকপোস্টগুলোতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।

বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে নয়াবাজার পর্যন্ত শত শত লোককে হেঁটে যেতে দেখা যায়। কেউ কেউ রিকশা বা ভ্যান দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। নয়াবাজার এলাকার সিরাজউদ্দৌলা পার্কের সামনে কথা হয় আলমাস হোসেনসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তারাও বলছিলেন গ্রামের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী থেকে ঢাকায় আসা পর্যন্ত তাদের ভোগান্তির কথা। ফেরি পার হয়ে শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৯ জনে মিলে একটি মাইক্রোবাসে কেরানীগঞ্জে পৌঁছতে পারলেও এর পর থেকে হাঁটা শুরু করেন।

আলমাস জানান, তারা সবাই টঙ্গী যাবেন। কিন্তু ঢাকায় ঢুকে কোনো বাহন পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেছেন। পথে কোনো বাহন পেলে তাদের সুবিধা হবে। শিমুলিয়া ঘাট থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত অন্তত চারটি জায়গায় পুলিশ আটকালেও কারখানার শ্রমিক বলার পর তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে তিনি জানান।

বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায় দায়িত্বে থাকা পুলিশের চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার ইলিয়াছ হোসেন সমকালকে বলেন, ঈদের পর থেকে চলা লকডাউনের মধ্যে শনিবার ঢাকায় অসংখ্য লোক ঢুকেছে। সবাই শিল্পকারখানার শ্রমিক হওয়ায় তাদের আইনের আওতায় নেওয়া হয়নি। শুধু স্বাস্থ্যবিধি মানাতে এবং মাস্ক পরতে অনেককে সতর্ক করা হয়েছে।

বেড়েছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল :২৩ জুলাই শুরু হওয়া চলমান লকডাউনে এতদিন রাজধানীতে অ্যাপস বা ভাড়ায় মোটরসাইকেল চলাচল কম থাকলেও গতকাল শনিবার কোনো রাখঢাকই ছিল না। রাজধানীর সড়কগুলোতে প্রায় সব মোটরসাইকেলের পেছনে ছিল যাত্রী। তবে ভাড়া আকাশছোঁয়া।

গতকাল বিকেলে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বিজি প্রেসের সামনে চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা একটি মোটরসাইকেল আটক করেন। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চালক মো. জসিম জানান, আরোহী তার চাচাতো ভাই। পরে ওই মোটরসাইকেলের আরোহী মো. আকাশকে জিজ্ঞাসা করলে দু'জনের তথ্যে গরমিল পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত পুলিশ চালককে মামলা দিয়ে ছেড়ে দেয়।

আকাশ জানান, তিনি টঙ্গীর একটি চামড়াজাত পণ্য তৈরির কারখানার কর্মী। কুমিল্লার রামচন্দ্রপুর থেকে নানা বাহনে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় আসেন। সেখান থেকে টঙ্গী যেতে ১২শ টাকায় ভাড়া মোটরসাইকেলে চড়েন। তার জন্য এ ভাড়া বেশি হলেও বাধ্য হয়েই যাচ্ছেন।

ওই চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী সার্জেন্ট উজ্জ্বল হোসেন সমকালকে বলেন, লকডাউনের অন্য দিনগুলোর তুলনায় শনিবার ভাড়ায় মোটরসাইকেল চলাচল বেড়েছে। প্রায় সব যাত্রীই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিক। তবে চালকরা মিথ্যা তথ্য দিয়ে চেকপোস্ট পার হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের আইনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।

লাগামহীন রিকশা ভাড়া :চলমান লকডাউনে এতদিন রাজধানীতে রিকশার চেয়ে যাত্রীসংখ্যা ছিল কম। এ জন্য কোনো কোনো এলাকায় রিকশা ভাড়াও ছিল কম। তবে গতকাল শনিবার রাজধানীতে শত শত মানুষ প্রবেশ করায় রিকশা ভাড়া বেড়েছে। চাহিদা থাকায় মর্জিমাফিক ভাড়া আদায় করেছে চালকরা।

গতকাল বাবুবাজার ব্রিজ এলাকায় কথা হয় কয়েক রিকশাচালকের সঙ্গে। তারা বলছিলেন, এদিন যাত্রীর অভাব ছিল না। তবে বেশিরভাগ যাত্রীই দূরে যেতে চাচ্ছেন। মনির হোসেন নামে এক চালক বলছিলেন, সকালে তিনি ধলপুর থেকে দুই যাত্রী নিয়ে ৮০০ টাকা ভাড়ায় মোহাম্মদপুরের কাঁচাবাজার এলাকায় গেছেন। অন্যান্য দিন কত ভাড়া নিতেন, জানতে চাইলে ওই চালক বলেন, অন্য কোনোদিনে ৪-৫শ টাকা হলেই চলে যেতেন।

এদিকে বিভিন্ন সড়কে রিকশার সঙ্গে গতকাল ভ্যানেও যাত্রীদের যেতে দেখা গেছে। কয়েক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সাধারণত ভ্যানে পণ্য পরিবহন করলেও বেশি ভাড়া পাওয়ায় যাত্রী নিচ্ছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গতকাল ঢাকায় মানুষের চলাচল বেশি থাকলেও প্রাইভেটকার চলাচল আগের মতোই ছিল। তবে আজ রোববার থেকে শিল্পকারখানা চালু হওয়ায় এদিন থেকে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বাড়বে বলে তাদের অনুমান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর ট্রাফিক বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিভিন্ন ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা রিকশা, অটোরিকশা বা হেঁটে গন্তব্যে যাচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র বাহনের চলাচল বাড়লেও ব্যক্তিগত গাড়ির চলাচল বাড়েনি।

ডিএমপির মিডিয়া বিভাগ থেকে জানানো হয়, শনিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় লকডাউনের বিধিনিষেধ অমান্য করায় ৪৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর বাইরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানা দিতে হয়েছে ২০২ জনকে। এ ছাড়া ট্রাফিক বিভাগ ৪৪০টি গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।

ডিএমপির এক কর্মকর্তা বলেছেন, শনিবার ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথে কার্যত বিধিনিষেধ মানানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বিধিনিষেধ মানাতে কড়াকড়ি করলে অন্তত কয়েক হাজার মানুষকে আইনের আওতায় নিতে হতো। তবে কারখানার শ্রমিকদের বিষয়ে পুলিশ ছিল মানবিক।

মন্তব্য করুন