'মা ছাড়া কি ঈদ অয়? ঈদের দিনও মায়ের খোঁজে মর্গে গেছিলাম। দেখা পাই নাই। আজ মায়ের পোড়া দেহটা লইয়া বাড়ি যাইতাছি।' লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সে উঠতে উঠতেই কথাগুলো বলছিল জাকির হোসেন। ১৬ বছরের ওই কিশোরের চোখ বেয়ে তখন গড়িয়ে পড়ছিল পানি। গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় লাগা আগুনে প্রাণ হারানো ৫২ জনের মধ্যে ছিলেন জাকিরের মা জাহানারা বেগমও। গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে মায়ের লাশ পাওয়ার পর সে গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে নিয়ে দাফন করে।

ওই আগুনেই প্রাণ হারিয়েছিল রিপন মিয়া নামের এক তরুণ। ঘটনার ২৭ দিন পর গতকাল বুধবার ছেলের লাশ নিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে এসেছিলেন রিপনের মা লিলি বেগম। মর্গের সামনে তার বিলাপে উপস্থিত লোকজনের চোখের পানি ধরে রাখা ছিল দায়। এই মা বিলাপ করে বলছিলেন, ২৭টি দিন ধরে বুকের ভেতর শোক চাপা দিয়ে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। আজ সন্তানের হাড়গোড় নিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডিতে নিহত ৫২ শ্রমিকের মধ্যে ৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে। ভয়াবহ ওই আগুনে একেকজনের দেহ এতটাই অঙ্গার হয়েছিল, প্রিয়জনও তাদের শনাক্ত করতে পারেনি। মৃতদেহ ব্যাগে ভরে তাতে পৃথক নম্বর দিয়ে রাখা হয়েছিল মর্গে। স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে লাশের ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে তাদের মধ্যে ৪৫ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়। গতকাল তাদের মধ্যে ২৪ জনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি ২১ মরদেহ শনিবার হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

৮ জুলাই সকালে এই মানুষেরা গিয়েছিলেন হাসেম ফুডসের কারখানায় নিজের কর্মস্থলে। ওই দিন সন্ধ্যায় সেখানে লাগা আগুনে পুড়ে অঙ্গার হন তারা। পরদিন সকালে তাদের অঙ্গার হওয়া নিথর দেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিয়ে আসা হয়। তবে স্বজনরা কাউকে চিনতে না পারায় এতদিন মর্গেই ছিল লাশগুলো। পুড়ে প্রায় অভিন্ন চেহারা হওয়ায় এতদিন যেন সবাই ছিলেন সবার স্বজন। গতকাল মর্গের সামনে থেকে যখন নাম ধরে স্বজনদের ডেকে এক এক করে মরদেহের নম্বর দেওয়া কফিন বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন সেখানে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। এতদিনের চাপা কান্না, চাপা শোক বিলাপ হয়ে প্রকাশ পায়।

কিশোরী ফাতেমাও শ্রমিক ছিল ওই কারখানার। গতকাল তার পিতা মো. সুজন মেয়ের মরদেহ নিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, এতদিন তিনি একবারের জন্যও চিন্তা করতে পারেননি তার মেয়ে মারা গেছে। ভেবেছিলেন নিখোঁজ মেয়েটাকে খুঁজে পাবেন। এ জন্য কারখানার সামনে ছুটে গেছেন প্রায় দিনই। ঈদের নামাজ পড়েও রূপগঞ্জ থেকে ঢাকার এই মর্গের সামনে চলে এসেছিলেন।

এই বাবা বলছিলেন, লোকজন আজ একটা কফিন বুঝিয়ে দিয়ে বলছে মেয়ের লাশ। আজ মনে হচ্ছে মেয়েটা নেই। বাবার মৃত্যুর আগে সন্তানের মৃত্যু কী যে যন্ত্রণার, তা কেউ বুঝবে না।

'মৃতদেহ নম্বর-৩১, নাম তাকিয়া আকতার'- গতকাল মর্গের সামনে থেকে পুলিশের এক সদস্য যখন এই ঘোষণা দেন, তখন শাহিনা বেগম নামের এক নারী ভিড় ঠেলে দৌড়ে যান মর্গের ভেতর। বিলাপ করে বলতে থাকেন, 'আমার মেয়ে, আমার মেয়ে...।' মর্গের লোকজন যখন ১৪ বছর বয়সী কিশোরী তাকিয়ার কফিনবন্দি লাশটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে দিচ্ছিলেন, তখন হাউমাউ করে কাঁদছিলেন মা শাহিনা বেগম।

তাকিয়ার বড় বোন আর্জিনা আক্তারও ওই কারখানাতেই কাজ করত। তবে ওই ট্র্যাজেডির এক সপ্তাহ আগে কাজ ছেড়ে একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি নেয়। আর্জিনা বলছিল, তাকিয়া দুই মাসের ওভারটাইমের টাকা পেত। এ জন্য হাসেম ফুডের কারখানা থেকে চাকরিটা ছাড়তে পারছিল না। চাকরিটা ছেড়ে দিলে আজ তার বোনের লাশ বহন করতে হতো না।

অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া সুমাইয়া আক্তার তার বাবা জাহেদ মিয়ার সঙ্গে মা ফিরোজা বেগমের লাশ নিতে এসেছিল। মা, মা বলে এই মেয়েটির বিলাপে ভারি হয়ে ওঠে মর্গের সামনের পরিবেশ। সুমাইয়ার বাবা জাহেদ মিয়া বলছিলেন, ওর মায়ের স্বপ্ন ছিল একমাত্র সন্তান বড় হয়ে ডাক্তার হবে। এ জন্য দু'জন মিলে কাজ করে টাকা জমাচ্ছিলেন তারা। সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ফিরোজা চলে গেল!

গতকাল মর্গ থেকে আয়াত হোসেন, নাঈম ইসলাম, নুসরাত জাহান টুকটুকি, হিমা আক্তার, সাগরিকা শায়লা, খাদেজা আক্তার, মোহাম্মদ আলী, তাকিয়া আক্তার, শাহানা আক্তার, মিতু আক্তার, জাহানারা, ফারজানা, ফাতেমা আক্তার, নাজমা খাতুন, ইসরাত জাহান তুলি, নাজমা বেগম, মো. রাশেদ, রাকিব হোসেন, ফিরোজা বেগম, তারেক জিয়া জেহাদ, রিপন মিয়া, শাহানা আক্তার, মো. মুন্না এবং রিয়া আক্তারের লাশ হস্তান্তর করা হয়।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসএম মাহফুজুর রহমান সমকালকে বলেন, স্বজনদের দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী সরকারি ব্যবস্থাপনায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে মরদেহ গ্রামের বাড়ি পাঠানো হয়েছে। দাফনের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৪ জনের স্বজনের হাতে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বাকি ২১ জনের লাশ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গসহ বিভিন্ন মর্গে রয়েছে। তবে শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকেই লাশ স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

মন্তব্য করুন