উত্তরা ক্লাবের সাবেক সভাপতি নাসির উদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তুলে তুমুল আলোচনার জন্ম দেন অভিনেত্রী পরীমণি। নাসিরকে আসামি করে সাভার থানায় মামলাও করেছিলেন তিনি। সিনেমার গল্পের মতো গতকাল বুধবার কাহিনিতে নতুন মোড় চলে আসে। হঠাৎ করেই রাজধানীর বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমণিকে আটক করে র‌্যাব। এরপর জানায়, তার বাসা থেকে বিভিন্ন ধরনের বিদেশি মদ ও ভয়ংকর মাদক এলএসডি পাওয়া গেছে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল কে এম আজাদ সমকালকে বলেন, পরীমণির বাসা থেকে অবৈধ বিদেশি মদ, এলএসডি, আইস এবং এসব সেবনের সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। মাদক গ্রহণ ও কারবারে জড়িত ছিলেন তিনি। মাদক আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হবে। পরীমণিকে এখন নানা অভিযোগের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গতকাল বিকেলে পরীমণির বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায়, শত শত সংবাদকর্মী ও উৎসুক জনতার ভিড়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বাসার ভেতরে-বাইরে অবস্থান নিয়েছেন। পরীমণি যে ভবনে বসবাস করেন, তার পাশের ভবনের নিরাপত্তারক্ষী ফজলুর রহমান জানান, বিকেল ৩টার দিকে সাদা পোশাকের অনেক লোকজনকে ওই এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে দেখেন। এর কিছু সময় পর র‌্যাবের অনেক সদস্য গাড়ি নিয়ে আসেন। এরপর পুলিশের লোকজনও আসেন। বারবার র‌্যাব সদস্যরা ফ্ল্যাটের বাইরে থেকে পরিচয় দিলেও দরজা খুলছিলেন না পরীমণি। সাড়ে ৪টার দিকে দরজা খুললে র‌্যাব সদস্যরা তার বাসায় ঢোকেন। রাত ৮টার দিকে পরীমণিকে তার বাসা থেকে বের করে নেন র‌্যাব সদস্যরা। এ সময় সেখানে র‌্যাবের কোনো সদস্য সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেননি। এ ছাড়া পরীমণিও কথা বলার সুযোগ পাননি। অভিনেত্রীকে বনানী থেকে সরাসরি উত্তরায় র‌্যাব সদর দপ্তরে নেওয়া হয়।

পরীমণিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর গতকাল রাতে বনানীর ৭ নম্বর রোডে নজরুল ইসলাম রাজ নামে আরেক প্রযোজকের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করেছে র‌্যাব। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, পরীমণিকে জিজ্ঞাসাবাদের পর নজরুল ইসলাম রাজের নামটি সামনে আসে। তার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পরীমণির। একাধিক সময় ফেসবুক লাইভে কথা বলার সময় রাজ অভিনেত্রীর পাশে ছিলেন। তিনি পরীমণির প্রথম ছবি 'ভালোবাসা সীমাহীন'-এর প্রযোজক ও রাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, অভিযানে রাজের বাসা থেকে মদ, মাদক গ্রহণের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও বিকৃতি যৌনাচারে লিপ্ত থাকার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।

অপর একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি একাধিক মডেলকে আটকের ধারাবাহিকতায় গতকাল পরীমণিকে আটক করার প্রস্তুতি নেয় পুলিশ। তবে অভিনেত্রীর উত্তরার বাসায় পুলিশের আগেই র‌্যাবের একটি টিম পৌঁছে যায়। এরপর র‌্যাব অভিযান শুরু করে। ঘটনাস্থলে গিয়ে ফেরত আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সদস্যরা।

এর আগেও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য আলোচনায় আসে পরীমণির নাম। ৭ জুন গভীর রাতে '৯৯৯' থেকে কল পাওয়ার পর গুলশান থানা পুলিশের একটি দল অল কমিউনিটি ক্লাবে যায়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কথা কাটাকাটির জেরে ক্লাবে গ্লাস ভাঙচুর করেছেন পরীমণি। পরে আর ওই ঘটনায় কেউ অভিযোগ করেননি।

ফেসবুক লাইভ :গ্রেপ্তারের আগে নিজের ফেসবুক পেজে লাইভে কথা বলেন পরীমণি। তিনি বলেন, 'আমি ঘুমাইতেছিলাম। বাসার নিচে মেইন গেটে সব ভাঙচুর করে তারা ওপরে চলে আসছে। এখন বাসার গেট ভাঙচুরের চেষ্টা করছে। বারবার কলিংবেল বাজাচ্ছে। পুলিশসহ কেউ শুনছে না। আমি সবাইকে ফোন করলাম, কেউ আসছে না।'

পরী বলেন, 'এরা যদি ডাকাত হয় কী করবেন? ... তারা নাকি কেউ জানে না, কোন থানা থেকে আসছে, সিআইডি না র‌্যাব কেউ কিছু বলতে পারছে না। আমি ডিবি অফিসে ফোন করলাম, হারুন ভাই বললেন, আমাদের এখান থেকে কেউ যায়নি। তোমার দরজা খোলার দরকার নেই। আমরা আসছি।'

এ সময় পরীমণি একজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তখন তাকে বলতে শোনা যায়, 'আমি মরে যাব, আর পৃথিবী দেখবে না? আমি লাইভ কাটব না। আমি দেখিয়ে মরব। আমার সঙ্গে কেউ কিছু করে পার পাবে না। আর মেরে ফেললে তো কোনো কিছু করার নেই।'

পরীমণি লাইভে এসব অভিযোগ করলেও র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের ভিত্তিতেই তার বাসায় অভিযান হয়েছে।

মামলা করবেন নাসির :মিথ্যা অপবাদ, সম্মানহানি ও পারিবারিকভাবে অপদস্থ করার অভিযোগে নায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ। গতকাল তিনি সমকালকে বলেন, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার চরিত্র হনন করা হয়েছে। আমাকে জেল খাটানো হয়েছে। অভিযোগ থাকলে পরীমণি থানায় আমার বিরুদ্ধে প্রথমেই মামলা করতে পারত। তখন পুলিশ তদন্ত করে সত্য বের করত। সেটা না করে সে ফেসবুকে আবেগঘন বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে নেওয়ার ফাঁদ পাতে। আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে তার বিরুদ্ধে মামলা করব। আমার সম্পর্কে যে ধরনের অভিযোগ করেছেন সবই মিথ্যা, পারিবারিকভাবে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনার পর পরীমণির ও অন্য সাক্ষীদের বক্তব্যে অনেক ফারাক।

মন্তব্য করুন