চিত্রনায়িকা পরীমণির বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রাজধানীর বনানী থানায় মামলা করেছে র‌্যাব। গতকাল বৃহস্পতিবার এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। একই মামলায় পরীমণির ম্যানেজার আশরাফুল ইসলাম ওরফে 'দীপু মামা'কে আসামি করা হয়েছে। পরে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে পরীমণি ও আশরাফুলকে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে পরীমণি ও আশরাফের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এ ছাড়া পৃথকভাবে মাদক আইনে একই থানায় প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজ ও সবুজ আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে র‌্যাব। এর আগে গত বুধবার বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমণিকে আটক করা হয়। ওই অভিযানের ধারাবাহিকতায় গ্রেপ্তার করা হয় রাজসহ আরও তিনজনকে।

র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) কর্নেল কেএম আজাদ সমকালকে বলেন, সমাজের যারা এই ধরনের কাজের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট, তাদের বার্তা দেওয়া দরকার। একটি চক্র তৈরি হয়েছে, যারা একই সিন্ডিকেটের সদস্য হয়ে অনৈতিক নানা কাজে জড়িত। যেহেতু সেখানে মাদকও আছে, তাই র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে পরীমণি খুব স্বাভাবিক ছিলেন। তবে বর্তমান পরিণতির জন্য নিজের অপরিপকস্ফতাকে দায়ী করেছেন তিনি। বুধবার রাতে স্বাভাবিক খাওয়া-দাওয়াও করেন। যাচাই-বাছাই ছাড়া যার তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখাও তার বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত ছিল না বলে স্বীকার করেন পরীমণি। পরীমণিকে যারা চালিত করতেন, তারা কোনো বিষয়ে তাকে সতর্ক করেননি বলেও জানান তিনি।

গতকাল বিকেলে পরীমণিকে বনানী থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। বুধবার আটকের পর অভিনেত্রী যে পোশাকে ছিলেন, গতকালও তাকে একই পোশাকে দেখা গেছে। এরপর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করে সাত দিনের হেফাজতের আবেদন করেন বনানী থানার পরিদর্শক সোহেল রানা। রাতেই পরীমণির পক্ষে তার আইনজীবীরা রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন জানালেও তা নাকচ করে দেন ঢাকার মহানগর হাকিম মো. মামুনুর রশিদ। পরীমণিকে চার দিনের হেফাজতে নেওয়ার আদেশ দেন তিনি। একই মামলার আসামি পরীমণির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপু এবং বুধবার র‌্যাবের আলাদা অভিযানে গ্রেপ্তার নজরুল ইসলাম রাজ ও তার ব্যবস্থাপক সবুজ আলীকেও বনানী থানার মাদকের আলাদা মামলায় চার দিনের হেফাজতে দিয়েছেন বিচারক।

আদালতে তোলার সময় খুব স্বাভাবিক ছিলেন পরীমণি। আদালত প্রাঙ্গণে তাকে হাসিখুশিও দেখা যায়। তবে শুনানির শুরু থেকেই পরীমণি আদালতে নিশ্চুপ ছিলেন।

চিত্রনায়িকাসহ চারজনের গ্রেপ্তারের প্রেক্ষাপটে গতকাল উত্তরায় র‌্যাব সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, পরীমণির বাসায় মিনি বার রয়েছে। মদের লাইসেন্স থাকলেও মেয়াদ পেরিয়েছে অনেক আগেই। পরীমণি, নজরুল রাজসহ চক্র ডিজে পার্টি আয়োজনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করত। এসব অর্থ তারা বিভিন্ন ব্যবসার কাজে লাগাত।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, রাজের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে তার কম্পিউটারসহ কিছু ডিভাইস জব্দ করা হয়েছে। তার মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে। এগুলো থেকে বেশকিছু ছবি ও ভিডিওচিত্র পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা হবে।

র‌্যাবের কমান্ডার আরও বলেন, পরীমণির বাসায় নিয়মিত পার্টি হতো। সেই পার্টিতে মদসহ সব ধরনের মাদক সরবরাহ করত রাজ। তার নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট ছিল, যাদের কাজই হলো উঠতি বয়সী তরুণীদের দিয়ে নানা অপকর্ম করানো। মঙ্গলবার মিশুক ও জিসানকে গ্রেপ্তারের পর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরীমণি ও রাজের বাসায় অভিযান চালানো হয়। তিনি আরও বলেন, পরীমণির বাসা থেকে একটি মিনি বার পরিচালনার বিভিন্ন সরঞ্জামসহ ৩৩ বোতল বিভিন্ন প্রকার বিদেশি মদ, দেড় শতাধিক ব্যবহূত বিদেশি মদের বোতল, ইয়াবা ও শিশা সামগ্রী, এলএসডি, আইস ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাব জানায়, গ্রেপ্তার শামসুন নাহার স্মৃতি ওরফে পরীমণিকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার ভাষ্য, 'নিজের সীমানা লঙ্ঘন করায় এমন পরিণতি তার। তবে তিনি এর জন্য অনুতপ্ত।' পিরোজপুরের কলেজে এইচএসসি পড়ার সময় চিত্রজগতে প্রবেশ করেন তিনি। ২০১৪ সালে চিত্রজগতে অন্তর্ভুক্ত হন। এ পর্যন্ত তিনি ৩০টি সিনেমা এবং পাঁচ থেকে সাতটি বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ করেছেন। পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসে চিত্রজগতে একটি শক্ত অবস্থান গড়তে রাজের সহায়তা নেন তিনি।

র‌্যাব জানায়, পরীমণি ২০১৬ সাল থেকে অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে পড়েন। মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে বাসায় মিনি বার তৈরি করেন।

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, রাজকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ১৯৮৯ সালে খুলনার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দাখিল পাস করেন। এরপর তিনি বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঠিকাদারি শুরু করেন। পাশাপাশি শোবিজ জগতেও আসেন। বিভিন্ন সিনেমা-নাটকে তিনি নানান চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনায় যুক্ত হন। রাজ মাল্টিমিডিয়া নামেও তার একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান আছে। ব্যবসায়িক জগৎ ও চিত্রজগতের দুই ক্ষেত্রে তার সংযোগ থাকায় তিনি অতিরিক্ত অর্থ লাভের আশায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিজ অবস্থানের অপব্যবহার করেন।

র‌্যাব আরও জানায়, শরফুল হাসান ওরফে মিশু হাসান ও মো. মাসুদুল ইসলাম ওরফে জিসানের সহযোগিতায় ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন রাজ। এই সিন্ডিকেটটি রাজধানীর অভিজাত এলাকা বিশেষ করে গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পার্টি বা ডিজে পার্টির নামে মাদক সেবনসহ নানাবিধ অনৈতিক কর্মকাে র ব্যবস্থা করে থাকে। ওই পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে সিন্ডিকেট সদস্যরা বিপুল পরিমাণ অর্থ পেয়ে থাকেন। অংশগ্রহণকারীরা সাধারণত উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য। প্রতিটি পার্টিতে ১৫-২০ জন অংশগ্রহণ করত। এ ছাড়া সিন্ডিকেটটি বিদেশেও প্লেজার ট্রিপের আয়োজন করত। একইভাবে উচ্চবিত্ত প্রবাসীদের জন্য দুবাই, ইউরোপ ও আমেরিকায় এ ধরনের পার্টির আয়োজকও ছিল এই সিন্ডিকেট। পার্টি আয়োজনের ক্ষেত্রে আগত ব্যক্তিদের চাহিদা ও পছন্দের বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।

র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, রাজ তার রাজ মাল্টিমিডিয়া কার্যালয়টি অনৈতিক কাজে ব্যবহার করতেন। তার মোবাইল ও ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে বিপুল পরিমাণ পর্নো ভিডিও পাওয়া গেছে। অন্তত ২০০ তরুণ-তরুণীর সঙ্গে রাজের 'ব্যক্তিগত' সম্পর্ক রয়েছে। তাদের অনেককে অনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন তিনি। রাজ র‌্যাবকে জানিয়েছেন, এ ধরনের আয় থেকে নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ, আমদানি, ড্রেজার, বালু ভরাট, ঠিকাদারি ও শোবিজ জগতে লগ্নি করতেন তিনি। তার ব্যবসায় অর্থের জোগানদাতাদের মধ্যে আরও কয়েকজনের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের ব্যবসায়িক কাঠামোতে অস্বচ্ছতা রয়েছে। এগুলো তদন্ত করা হচ্ছে।

একজন কর্মকর্তা জানান, এই চক্রের মাধ্যমে যারা ফেঁসেছেন, তাদের বক্তব্য শোনা হবে। এর মধ্যে যেসব ভিডিও জব্দ করা হয়েছে, তা কী উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল, তাও যাচাই করে দেখা হচ্ছে।





মন্তব্য করুন