একের পর এক মডেল ও অভিনেত্রী গ্রেপ্তারের পর ঢাকার অভিজাত এলাকার একটি ভিন্ন জগতের তথ্য বেরিয়ে আসছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারার মতো জায়গায় বিশাল বিশাল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে বহু 'পার্টি হাউস'। সন্ধ্যার পরপরই জমে ওঠে এসব হাউস। নারী-পুরুষ মডেলরা এর আয়োজক। চলে লাখ লাখ টাকার লেনদেন।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত স্থানে ৩০-৪০টি পার্টি হাউসের সন্ধান পেয়েছেন গোয়েন্দারা। সংশ্নিষ্টরা জানান, যারা এসব পার্টি হাউসে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তারা ধনাঢ্য পরিবারের সদস্য।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পার্টি হাউসে নিয়মিত আয়োজনকারীদের মধ্যে আরও কয়েকজন বিতর্কিত মডেল ও অভিনেত্রী গ্রেপ্তার হতে পারেন। তালিকা করে কয়েকজনকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

পার্টি হাউসে যাতায়াতকারীদের ব্যাপারে তথ্য রাখেন- এমন একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গুলশান ১ নম্বর এলাকায় অভিনেত্রী শিলা হাসানের পার্টি হাউস আছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের এই ফ্ল্যাটে অনেক দিন ধরে নাইট পার্টির আয়োজন করে আসছেন তিনি। তার পার্টিতে শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা অনেকের যাতায়াত রয়েছে। উঠতি মডেল, অভিনেত্রীরা সেখানে থাকেন। রাতভর চলতে থাকে নানা আয়োজন। একেক রাতে ১০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত একেকজন খরচ করেন। ঘণ্টা হিসাবে পার্টি হাউসে ছোট ছোট কক্ষও ভাড়া দেওয়া হয়।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, গুলশানে আলাদা ফ্ল্যাটে পৃথক পার্টি হাউস রয়েছে আরেক বিতর্কিত মডেল মরিয়ম আক্তার মৌয়ের। তার চক্রে ৪০-৫০ জন রয়েছে। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে গ্রেপ্তার মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসার। এ ছাড়া আরেকজন মডেলের সঙ্গে দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের 'ঘনিষ্ঠ' সম্পর্ক রয়েছে। পার্টি হাউসে যাতায়াতের সূত্র ধরেই তারা এ ধরনের সম্পর্কে জড়ান।

গুলশানকেন্দ্রিক আরেক পার্টি হাউসের আয়োজক একজন ফ্যাশন হাউসের কর্ণধার। কয়েক মাস আগে তার স্ত্রীকে ভাগিয়ে নেন একজন বড় ব্যবসায়ী। সমাজের প্রভাবশালীদের নানাভাবে ম্যানেজ করে চলেন ওই ফ্যাশন হাউসের মালিক। তার বিরুদ্ধে একটি ব্যাংকের অর্থ কৌশলে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

সূত্র জানায়, বিতর্কিত এসব মডেল অভিনেতা-অভিনেত্রীর মধ্যে যারা পার্টির আয়োজক, তারা প্রায় সবাই অঢেল অর্থের মালিক। বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী তাদের অনেককে গাড়ি-ফ্ল্যাট উপহারও দেন। আবার অনেককে কৌশলে ফাঁসিয়ে অর্থ আদায় করা হয়।

জানা গেছে, গ্রেপ্তার পরীমণিও পার্টি কালচারে যুক্ত। তার বাসার গ্যারেজে দুটি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। গুলশানে রয়েছে তার একটি ফ্ল্যাটও। এসব গাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনার কোনো বৈধ সোর্স দেখাতে পারেননি তিনি।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পরীমণি বিশ্বাস করতেন, ভিন্ন জগতে যাতায়াত করলেও কখনও আটকের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে না। দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করলেও প্রভাবশালী ওই মহল তাকে অভয় দিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত তারা পরীমণিকে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করতে পারেনি।

অন্য একটি সূত্র জানায়, ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন এক শীর্ষ সন্ত্রাসী এক মডেলকে প্রতি মাসে পাঁচ লাখ টাকা করে দিয়ে আসছেন। তিনি প্রায়ই পার্টি হাউসে যান। দুবাইয়ে ওই মডেলকে নিয়ে তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল।

ঢাকায় যারা এসব পার্টি হাউসের সঙ্গে জড়িত, তাদের মধ্যে অনেকে দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় পার্টিতে অংশ নিতেন। অনেক সময় ধনাঢ্য পরিবারের বখে যাওয়া সন্তানরা এসব মডেলকে নিয়ে বিদেশে যেতেন। আবার অনেক সময় বিদেশি নাগরিকদের আমন্ত্রণে একটি সিন্ডিকেট বাংলাদেশ থেকে তাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দেশের বাইরে নিতেন। এখন পর্যন্ত ১০ জন শিল্পপতি, পাঁচজন ব্যবসায়ী, একজন ব্যাংকের কর্ণধারসহ ১৭-১৮ জনের একটি সিন্ডিকেট পাওয়া গেছে, যারা নিয়মিত এসব পার্টিতে যেতেন।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার প্রযোজক নজরুল ইসলাম রাজের বনানীর অফিসে নিয়মিত নারীদের আনাগোনা ছিল। একই সঙ্গে সেখানে পরিচিত মডেল, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার লোকদেরও যাতায়াত ছিল। রাজের ওই অফিস থেকে প্রায়ই চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যেত। স্থানীয়রা জানান, ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ ডেকে তাদের সতর্ক করা হলেও তা বন্ধ হয়নি।

বাড়ির ম্যানেজার আলী মিয়া বলেন, 'রাজ স্যার গাড়ি নিয়ে প্রায় প্রতিদিন সকাল-বিকেল এখানে আসতেন। নারী-পুরুষ নিয়ে ফ্ল্যাটে রাত কাটিয়ে সকালে বের হয়ে যেতেন। ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা সতর্ক করলেও আমলে নিতেন না।'

একজন কর্মকর্তা জানান, টিকটক-লাইকির মতো প্ল্যাটফর্মে যারা অভিনয় করেন, তাদের মধ্য থেকে অনেক সুন্দরী তরুণীকে টার্গেট করতেন পার্টি হাউসের সঙ্গে সংশ্নিষ্টরা। মডেল বানানো ও নাটকে অভিনয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের দলভুক্ত করা হয়।



মন্তব্য করুন