হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া শুরু হয়েছে। তিনি নিজ নামে ট্রাস্ট গঠন করে যেসব সম্পত্তি দান করে গেছেন, তারই মালিকানা দাবি করে মামলা ঠুকেছেন এরশাদের একসময়ের কর্মচারী ও সাবেক সংসদ সদস্য এইচ এম গোলাম রেজা। এরশাদ তার ট্রাস্ট ও সম্পদে সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিককে অবাঞ্ছিত করে গেছেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর বিদিশা ও সমর্থকদেরই নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে ট্রাস্ট এবং এর সম্পদের নিয়ন্ত্রণ। এ নিয়ে এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতাদের সঙ্গে বিরোধ চলছে।

মৃত্যুর মাস তিনেক আগে ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল সম্পাদিত এক দলিলে ট্রাস্ট গঠন করে তার বিষয়-সম্পত্তির বড় অংশ সেখানে দান করেন এরশাদ। ট্রাস্টের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, ছেলে শাহাতা জারাব এরিকের ভরণপোষণ ও জনহিতকর কাজে ব্যয় হবে সম্পত্তি থেকে অর্জিত আয়। ট্রাস্টের আয় ভোগ ও কর্মকাণ্ডে অংশীদার হতে পারবেন না বিদিশা। তিনি এমন দাবি করলে তা আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হবে না। কিন্তু ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর কিছুদিন পরই ট্রাস্টের তফসিলভুক্ত সম্পত্তি বারিধারার বাসায় ওঠেন বিদিশা। তখন বাধা দিয়েছিলেন জি এম কাদেরের অনুসারী জাপা নেতারা।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ছিলেন এরশাদ নিজেই। বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ছিলেন তার একান্ত সচিব মেজর (অব.) খালেদ আখতার, চাচাতো ভাই সামচ্ছুজ্জামান মুকুল, এরশাদের ব্যক্তিগত কর্মচারী জাহাঙ্গীর আলম এবং ছোট ছেলে শাহাতা জারাব এরিক।

বারিধারা প্রেসিডেন্ট পার্কের সাত হাজার ৪২ বর্গফুটের ফ্ল্যাট ও পার্কিং, গুলশানের ৯৬ নম্বর সড়কের ৪/বি বাড়ির দুই হাজার ৭১ বর্গফুটের ফ্ল্যাট, বনানীতে আল নাহিয়ান ট্রাস্টের সংযুক্ত আরব আমিরাত মৈত্রী শপিং কমপ্লেক্সের এক হাজার ১৬০ বর্গফুটের দোকান, রংপুরের 'পল্লীনিবাস', রংপুরের মিঠাপুকুরের 'পল্লীবন্ধু কোল্ড স্টোরেজ', ১২ কোটি ৯৫ লাখ টাকার স্থায়ী ব্যাংক আমানত, সঞ্চয়, শেয়ার এবং পাঁচটি গাড়ি ট্রাস্টে দান করেন এরশাদ। বাকি সম্পদ স্ত্রী রওশন এরশাদ এবং বড় ছেলে রাহগীর আল মাহী এরশাদ শাদকে দিয়ে গেছেন সাবেক সেনাশাসক।

এরশাদের মৃত্যুর পর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হন খালেদ আখতার। ২০২০ সালে তিনি এবং ট্রাস্টের অপর সদস্য জাহাঙ্গীর আলম মারা যান। তাদের মৃত্যুর পর ট্রাস্টে সদস্য হন জাপার সাবেক দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী মো. মামুনুর রশিদ এবং এস এম ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীর। এ ছাড়া অ্যাডভোকেট রুবায়েত হাসান নামের আরেক ব্যক্তি সদস্য হন। এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার চেয়ারম্যান হন তার ছোট ভাই জি এম কাদের। তিনি কাজী মো. মামুনুর রশিদ ও ফখর উজ জামান জাহাঙ্গীরকে জাপার কমিটি থেকে বাদ দেন। এর পর থেকে তাদের জাপার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করা বিদিশার সমর্থক হিসেবে দেখা যাচ্ছে তাদের।

খালেদ আখতারের মৃত্যুর পর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হন কাজী মো. মামুনুর রশিদ। ২০২০ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভায় তাকে এ পদে নিয়োগ করা হয়। নিয়োগের হলফনামায় এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে বিদিশা সিদ্দিকের স্বাক্ষর রয়েছে।

দলিলে অবাঞ্ছিত করা হলেও কীভাবে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সভার মাধ্যমে চেয়ারম্যান নিয়োগের হলফনামায় সাক্ষী হয়েছেন? এ প্রশ্নে বিদিশা সমকালকে বলেন, 'আমি সাক্ষী হতেই পারি।' দলিলের শর্তের বিষয়ে তাকে জানালে তিনি বলেন, ট্রাস্ট গঠন করা হয়েছে এরিকের জন্য। ট্রাস্টের সম্পদ এরিকের সম্পদ। এরিক তাকে বারিধারায় রেখেছেন। তিনি সন্তান এরিকের বাড়িতে রয়েছেন।

গত ১৪ এপ্রিল এরশাদের মৃত্যুবার্ষিকীতে বারিধারায় ট্রাস্ট আয়োজিত মিলাদ মাহফিলে এরিক বলেছিলেন, তার কোনো ক্ষতি হলে চাচা জি এম কাদের দায়ী থাকবেন। ওই অনুষ্ঠান থেকে তিনি সৎমা রওশন এরশাদকে জাপার চেয়ারম্যান এবং মা বিদিশা সিদ্দিক ও সৎভাই রাহগীর আল মাহী এরশাদ শাদকে কো-চেয়ারম্যান 'ঘোষণা' করেন। কাজী মো. মামুনুর রশিদকে মহাসচিব 'ঘোষণা' করেন। তবে ওই ঘোষণার সঙ্গে রওশন এরশাদ ও শাদ এরশাদের সম্পৃক্ততা নেই জানিয়ে বিবৃতি দেয় জাপা।

কাজী মামুনুর রশিদ সমকালকে বলেন, ট্রাস্টের পরিচালনা পর্ষদ তাকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করেছে। বিদিশা সিদ্দিক বারিধারায় রয়েছেন তার ছেলের অনুমতিতে। এ বিষয়ে জানতে এরিকের সঙ্গে কথা বলতে পরামর্শ দেন কাজী মামুন। তবে এরিকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

রাজনীতির সমীকরণ ছাড়াও ট্রাস্টের সম্পত্তি নিয়ে আইনি মারপ্যাঁচ রয়েছে। মালিকানা দাবি করেছেন গোলাম রেজা। বিদিশার লেখা বই এবং জাপা নেতার ভাষ্য অনুযায়ী, গোলাম রেজা একসময় এরশাদের কর্মচারী ছিলেন। তিনি এরশাদের ব্যবসা ও সম্পদ দেখভাল করতেন। পরবর্তী সময়ে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য হন। ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। সম্পত্তি 'আত্মসাতের' অভিযোগে ২০১২ সালে গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিস্কার করেন এরশাদ।

গোলাম রেজা সমকালের কাছে দাবি করেন, এরশাদ যেসব সম্পত্তি ট্রাস্টে দান করে গেছেন, সেসবে তার এখতিয়ার ছিল না। বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের ফ্ল্যাট দুটি বন্ধক রেখে এরশাদ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। বন্ধক না ছাড়িয়ে তিনি তা ট্রাস্টে দান করেছেন। রাজউকের অনুমতি ছাড়াই গুলশানের ফ্ল্যাট ট্রাস্টে দিয়েছেন, যা অবৈধ। রংপুরের 'পল্লীনিবাস' এরশাদের চাচাতো ভাইদের নামে বরাদ্দ নেওয়া খাসজমিতে তৈরি; তা দান করারও অধিকার ছিল না এরশাদের।

গোলাম রেজার দাবি, ট্রাস্টে দান করা বনানীর আল নাহিয়ান ট্রাস্টের মার্কেটের দোকানের প্রকৃত মালিক তিনি, এরশাদ নন। দুবাইয়ের শাসক শেখ জায়েদ আল নাহিয়ানের দান করা ২৫ মিলিয়ন ডলারে তার নামে ট্রাস্ট গঠিত হয়েছিল এরশাদের শাসনামলে। বনানীর মৈত্রী মার্কেট ট্রাস্টের সম্পদ। সেখান থেকে এরশাদ নিজ নামে দোকান বরাদ্দ নেন।

২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর দোকানটি গোলাম রেজার মেয়ে ডা. শারমিন রেজা বুবলির কাছে আড়াই কোটি টাকায় বিক্রি করতে বায়না দলিল করে পে-অর্ডারের মাধ্যমে এক কোটি ৮৭ লাখ টাকা নেন এরশাদ। দোকান বিক্রির অনুমতি চেয়ে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান তথা তৎকালীন সমাজকল্যাণ সচিব কামরুন্নেসা খানমের বরাবর আবেদন করেন। ২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ট্রাস্টের ৮৬তম বোর্ড সভায় বিক্রির অনুমতি পান এরশাদ। তবে মোট দামের ২০ শতাংশ, অর্থাৎ ৫০ লাখ টাকা ট্রাস্টে দিতে বলা হয়।

গোলাম রেজার দাবি, টাকা নিলেও এরশাদ তাকে দোকান লিখে দেননি। তাই তিনি মামলা করেছেন।

তবে কাজী মামুনুর রশিদ সমকালকে বলেন, গোলাম রেজা প্রতারক হিসেবে পরিচিত। জাল দলিল তৈরির কুখ্যাতি রয়েছে তার।

পল্লীবন্ধু কোল্ড স্টোরেজের মালিকানাও দাবি করেছেন গোলাম রেজা। তার দাবি, এরশাদ ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ঋণে 'পোদাগঞ্জ কোল্ড স্টোরেজ' করেছিলেন। এই কোম্পানির চার হাজার শেয়ার ২০০৩ সালে গোলাম রেজার নামে হস্তান্তর করে তাকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ করা হয়। এরশাদ পরে শেয়ার হস্তান্তরের দলিল বাতিল করলে মামলা করেন (রংপুর-৮৮/২০১২) গোলাম রেজা। নিম্ন আদালত দলিল বাতিলের পক্ষে রায় দিলে হাইকোর্টে যান গোলাম রেজা। মামলা নম্বর ২৩/২০১৪।

গোলাম রেজার দাবি, হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিলেও 'পোদাগঞ্জ কোল্ড স্টোরেজে'র নাম পাল্টে 'পল্লীবন্ধু কোল্ড স্টোরেজ' নাম দিয়ে ট্রাস্টে দান করেন এরশাদ। আপিল বিভাগে এ নিয়ে মামলা চলছে।

এরশাদের চাচাতো ভাই সামচ্ছুজ্জামান মুকুল প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক। সামচ্ছুজ্জামান সমকালকে বলেন, কোল্ড স্টোরেজ ট্রাস্টের সম্পদ। এর মালিকানা আদালতের রায়ে নিশ্চিত হয়েছে। গোলাম রেজা কেউ নন।

জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট রেজাউল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিদিশার কোনো এখতিয়ারই নেই এরশাদ ট্রাস্টে যুক্ত হওয়ার এবং সম্পদ ভোগের। তিনি আইন অমান্য করে সাক্ষী হয়েছেন। ট্রাস্টের সম্পদ থেকে প্রতি মাসে বিপুল আয় হয়। এরিকের জন্য তা থেকে ব্যয় হয় সামান্যই। বাকিটা ভোগদখল করতেই বিদিশা, কাজী মামুনরা ট্রাস্টের কবজা করেছেন।

এরশাদ ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ এবং রেখে যাওয়া সম্পত্তি নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে শাদ এরশাদ বক্তব্য দেননি। তবে জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, বিদিশা সিদ্দিক এরশাদের তালাকপ্রাপ্ত। তাকে নিয়ে কথা বলতে চাই না। এরশাদের বিষয়-সম্পত্তি তার পরিবারের ব্যাপার। জাপা নেতারা এরশাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী। দলে অবাঞ্ছিত কারও স্থান নেই।

মন্তব্য করুন