ডেসটিনি, ই-অরেঞ্জ, ইভ্যালির মতো প্রতিষ্ঠানে টাকা বিনিয়োগ করে গ্রাহক নিঃস্ব হওয়ার ঘটনায় সরকারের সংশ্নিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, মানুষ নিঃস্ব হওয়ার পর সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে। অথচ সরকারের কাজ কী? এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন সবকিছু সুপ্রতিষ্ঠিত করা। সেখানে সরকার ঠিকমতো কাজ করছে কিনা? সেটা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল সোমবার এক রিটের শুনানিতে এ মন্তব্য করেন। দেশের ৬৪ জেলায় অনিবন্ধিত সুদের ব্যবসা বন্ধ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ স্যায়েদুল হক সুমনের করা এক রিটের ওপর এই শুনানি গ্রহণ করা হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর তিনি 'জনস্বার্থে'

রিটটি দায়ের করেন। আদালতে আবেদনের পক্ষে রিটকারী নিজেই এবং রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নুর উস সাদিক চৌধুরী শুনানি করেন।

এদিকে দেশের ই-কমার্স ব্যবসা তদারকি করতে একটি 'ই-কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' করার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আনোয়ারুল ইসলাম বাঁধন হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট শাখায় রিটটি দায়ের করেন। রিটে বাণিজ্য সচিব, বিটিআরসির চেয়ারম্যান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের চেয়ারম্যান ও ই-ক্যাবকে বিবাদী করা হয়েছে। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটের শুনানি হবে বলে জানিয়েছেন রিটকারী আইনজীবী।

গত ৭ সেপ্টেম্বর সারাদেশের গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া অনিবন্ধিত সুদের ব্যবসা বন্ধ চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। রিটে ৬৪ রজলার ডিসি-এসপিকে বিবাদী করা হয়। রিটে বলা হয়, দেশের প্রতিটি এলাকায়, প্রতিটি গ্রামে সমবায় সমিতির নামে সুদের ব্যবসা চলছে। আবার অনেকে ব্যক্তিগতভাবে ঋণ দেওয়ার নামে উচ্চহারে সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো নিবন্ধন নেই। সাধারণ মানুষ এসব সুদের কারবারির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতে আদায় করা সুদের পরিমাণও আকাশছোঁয়া। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের সামনে তারা সুদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সংবিধান ও আইন অনুসারে এ ধরনের ব্যবস্থা অবৈধ। এ জন্য রিটটি দায়ের করা হয়েছে।

গতকাল ওই রিটের শুনানিতে বিদেশে টাকা পাচারের বিষয়েও হাইকোর্ট সরকারের সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। হাইকোর্ট বলেন, 'আমার বাড়ি কেন অরক্ষিত? আমার বাড়ি মানে বাংলাদেশ। দেশের মানুষ দরজা-জানালা বন্ধ করে শান্তিতে ঘুমাবে। কিন্তু আমার ঘর কেন অরক্ষিত? আমাদের দরজাগুলো কেন খোলা? মানুষের টাকা কেন লুট করে নিয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে? এগুলো বন্ধ করা কাদের দায়িত্ব? এটা আমরা দেখতে চাই। আমরা এটা পরীক্ষা করতে চাই। আমরা এ বিষয়ে দেখেশুনে আদেশ দেব।'

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নুর উস সাদিক চৌধুরী বলেন, 'সরকার যে ব্যবস্থা নিচ্ছে না, তা কিন্তু নয়। এহসান গ্রুপের মালিককে সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে, ইভ্যালির কর্তা ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।'

তখন হাইকোর্ট বলেন, 'সরকার তো ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু সেটা কখন? যখন আমি নিঃস্ব হয়ে গেলাম, আমার রেমিডিটা (সুরক্ষা) কোথায়? আমার টাকাটা নিয়ে গেল আমি দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। সে থানায় যাবে, জেলে যাবে যাক। কিন্তু আমার টাকাটা যে নিয়ে গেল সেটা কোথায়? আমরা মামলা করার পর চোর ধরা পড়ছে। চুরি তো ঠেকানো যাচ্ছে না।'

এ পর্যায়ে আদালত সরকারের মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। হাইকোর্ট বলেন, 'সরকারের কাজ কী? এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন সবকিছু সুপ্রতিষ্ঠিত করা। সেখানে সরকার ঠিক মতো কাজ করছে কিনা? এটি আমরা খতিয়ে দেখব।' এরপর হাইকোর্ট আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর এ রিটের ওপর পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ধার্য করেন।





মন্তব্য করুন