আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে- এমন শঙ্কা ছিল বিতর্কিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাসেলের। তবে তিনি তা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত ছিলেন না। বরং আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে ছিলেন বেশ আশাবাদী। পুলিশের তদন্তসংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এ সংশ্নিষ্ট একটি সূত্রের ভাষ্য, ব্যবসায় 'কৌশলগত ভুল' ছিল দাবি করলেও রাসেলের অসৎ উদ্দেশ্যের কারণেই প্রতিষ্ঠানটি এ পরিস্থিতিতে এসে দাঁড়ায়। পণ্য দিতে না পারলেও তিনি নতুন গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া বন্ধ করেননি। উল্টো যতটা সম্ভব টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ভুক্তভোগী এক গ্রাহকের করা প্রতারণার মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে রাসেল ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান তার স্ত্রী শামীমা নাসরিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের সহকারী কমিশনার নিউটন দাস সমকালকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। রিমান্ড শেষে মঙ্গলবার তাদের আদালতে হাজির করা হবে।

গত বুধবার গভীর রাতে রাজধানীর গুলশান থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ভুক্তভোগী আরিফ বাকের। পরদিন বিকেলে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ইভ্যালির দেনা প্রায় হাজার কোটি টাকা। তবে তাদের ব্যাংক হিসাবে আছে মাত্র ৩০ লাখ টাকা।

তদন্তসংশ্নিষ্টরা জানান, গুলশান থানার মামলায় রাসেল ও শামীমাকে আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে দু'জনের জন্য প্রশ্নগুলো ছিল একই। উত্তরে দু'জন একই রকম তথ্য দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রাহকরা ইভ্যালির কাছে পাবেন ৭০০ কোটি টাকার বেশি। আর পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে আরও প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও অন্যান্য বিষয় মূলত রাসেলই দেখতেন। সার্বিক কার্যক্রমে তার স্ত্রী বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখতেন না।

সূত্র জানায়, গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ কোন খাতে ব্যবহার করা হয়েছে- এ প্রশ্নের সদুত্তর পাননি তদন্ত কর্মকর্তারা। স্বামী-স্ত্রী বলেছেন, গ্রাহকের অর্থ পণ্য কিনতেই ব্যবহার করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিপুল অর্থের ঘাটতির কারণ তারা ব্যাখ্যা করেননি। তবে সাভারে রাসেলের কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে। আবার শুরু থেকেই লোকসানি প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির নানা খাতে ব্যয়ও ছিল অনেক বেশি। রাসেল ও শামীমা বেতন হিসেবেই নিতেন মাসে ১০ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানের প্রচার চালাতেও ব্যয় করেছেন গ্রাহকের কাছ থেকে নেওয়া বিপুল অর্থ।

জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল দাবি করেন, প্রতারণার কোনো ব্যাপার নয়; কৌশলগত কিছু ভুলের কারণে তিনি জটিলতায় পড়েন। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতিবাচক প্রতিবেদন ও করোনাকালীন লকডাউন তার জন্য বড় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, এক পর্যায়ে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে- তা ধরেই রেখেছিলেন রাসেল। তবে তার ধারণা ছিল, কিছুটা ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলেও শেষ পর্যন্ত তার কিছুই হবে না। এ ধরনের মামলায় তেমন কোনো সাজা হওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া তিনি কৌশলে সব দিক ম্যানেজ করে আইনের ফাঁক গলে ঠিক বেরিয়ে আসবেন। আর আর্থিক দায় এড়াতে প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া ঘোষণাসহ কয়েকটি বিকল্প পথও ভেবে রেখেছিলেন।

তদন্ত সূত্র জানায়, ইভ্যালির সার্ভার থেকে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক ও পণ্য সরবরাহকারীদের তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে লেনদেন হওয়া অর্থের পরিমাণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। সেই হিসাব পাওয়ার পর অন্যান্য সূত্রে পাওয়া আর্থিক লেনদেনের হিসাব মিলিয়ে দেখা হবে।

পুলিশ জানায়, গুলশান থানার মামলায় রাসেল-শামীমা দম্পতিকে আপাতত আর রিমান্ড চাওয়ার পরিকল্পনা নেই। তবে তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় মামলা রয়েছে। সে মামলায় তাদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে রাখা হয়েছে। আজ সে আবেদনের শুনানি হতে পারে।

এর আগে শুক্রবার ইভ্যালির কাছে পণ্য সরবরাহকারী কামরুল ইসলাম চকদার ধানমন্ডি থানায় মামলাটি করেন। এজাহারে তিনি ৩৫ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ করেন। ওই মামলায় মোট ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।





মন্তব্য করুন