আগামী ডিসেম্বর থেকে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, বিএনপিসহ বিরোধী দলের গ্রেপ্তার নেতাকর্মীদের মুক্তি, মামলা প্রত্যাহারসহ বেশ কয়েকটি দাবি সামনে রেখে এ আন্দোলনের পরিকল্পনা করছে দলটি।

এসব দাবির সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করা সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও পেশাজীবীদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্মে কিংবা যুগপৎ আন্দোলনের সিদ্ধান্ত রয়েছে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের।

বিএনপি নেতারা বলছেন, আন্দোলনের মতো কর্মসূচিতে যাওয়ার আগে দ্রুত সংগঠনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সঙ্গে ঐকমত্যে আসতে চায় দলটি। এ ক্ষেত্রে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে অটুট রেখে ডান-বামসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল, সুশীল সমাজ ও পেশাজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করতে চাইছে তারা। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দ্বিতীয় দফায় আজ মঙ্গলবার থেকে দলের কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক হবে দলের হাইকমান্ডের।

এসব বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বিশেষত. আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার অধীনে তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বিএনপির বিগত বৈঠকে এসব বক্তব্য উঠে এসেছে। সেখানে নেতারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনের মতামত দিয়েছেন। বৈঠকে দেওয়া তাদের এসব বক্তব্যই বিএনপির দলীয় বক্তব্য।

বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের বেশ কয়েক নেতা জানান, আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হচ্ছে এ নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ। বিএনপি ইসির পুনর্গঠন ইস্যুতেই প্রথমে মাঠে নামার চিন্তা করছে। এ জন্য দলীয় প্রস্তাবনা জাতির সামনে তুলে ধরা হবে।

বিএনপি বলছে, সার্চ কমিটিই হোক আর আইন করেই হোক; এ সরকারের অধীনে সব নির্বাচন কমিশনই হবে আজ্ঞাবহ। তাই নির্বাচন কমিশন গঠনের আগে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করতে হবে।

গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ধারাবাহিক বৈঠক হয়। তিন দিনের এ বৈঠকে মোট ২৮৬ জন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ১১৮ জন বক্তব্য দেন। এসব বৈঠকে বিএনপির সিনিয়র, মধ্যম ও তরুণ নেতাদের সবাই বলেছেন, আন্দোলন ছাড়া তাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। আর আন্দোলন ছাড়াই তাদের বেশিরভাগ নেতাকর্মী

ঘরছাড়া। মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত। এ অবস্থায় ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো এবারও সরকারকে ওয়াকওভার দিলে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই এবার সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন ছাড়া তাদের মুক্তি মিলবে না।

বিএনপির ধারাবাহিক বৈঠকে এবারের আন্দোলনে নেতারা নিজেদের একক শক্তির ওপর নির্ভর করার কৌশল নিতে বলেছেন। নেতারা দলকে শক্তিশালী করতে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দলসহ সব অঙ্গ সংগঠনকে সক্রিয় রাখতে পুনর্গঠন করার দাবি করেছেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ইসি গঠনের আগে রাজপথে শক্ত অবস্থান নেওয়ার জন্য যুগোপযোগী সংগঠন করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো ও নতুন মিত্র তৈরির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তারা।

দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গ বৈঠকের পর আজ মঙ্গলবার থেকে দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলার নেতাদের সঙ্গে তিন দিনের সিরিজ বৈঠকে বসছেন দলের হাইকমান্ড। প্রথম দিন ঢাকা বিভাগের ১০৮, ফরিদপুর বিভাগের ১৪ জন নির্বাহী সদস্য ছাড়াও জেলার চারজনসহ ১২৬ জন নেতা উপস্থিত থাকবেন। কাল বুধবার চট্টগ্রাম বিভাগের ৩৭, কুমিল্লা বিভাগের ২৩, ময়মনসিংহ বিভাগের ১৮, সিলেট বিভাগের ১৪ ও রংপুর বিভাগের ১৭ জন নির্বাহী সদস্য ছাড়াও জেলার ২০ জন নেতাসহ ১২৯ জনকে বৈঠকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে খুলনা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের ১০৮ নেতাকে। তাদের মধ্যে রয়েছেন খুলনা বিভাগের ৩২, রাজশাহী বিভাগের ৩৫ ও বরিশাল বিভাগের ২৭ জন নির্বাহী সদস্য এবং এ তিন বিভাগের ১৪ জন জেলা সভাপতি।

এসব বৈঠকে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির করণীয়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আন্দোলনের কর্মকৌশল, মাঠ পর্যায়ের সংগঠনকে আরও সক্রিয় করে তোলা ইত্যাদি বিষয়ে নেতারা যার যার মতামত তুলে ধরবেন।

মাঠের নেতাদের এসব বক্তব্যকে আমলে নিচ্ছেন হাইকমান্ড। বৈঠকগুলোতে দলের শীর্ষ নেতা ডিসেম্বরে আন্দোলনে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, 'সামনে রাজপথের আন্দোলন কর্মসূচি দেওয়া হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত যেসব নেতা মাঠে থাকবেন না, তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

রাজপথের আন্দোলনকে টার্গেট করে সব নেতাকর্মীকে সক্রিয় করছে বিএনপি। বিগত দিনে বহিস্কৃত ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের দ্রুত বিএনপিতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন দলের শীর্ষ নেতা। এর অংশ হিসেবে ছাত্রদলের সাবেক ১২ জন নেতাসহ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ১১ নেতার বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সারাদেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলকে সংগঠিত করার তাগাদা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের ওয়ার্ড, ইউনিট কমিটি প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্যান্য জেলাতেও একই নির্দেশনা দিয়েছে দলটি। আগামী এক মাসের মধ্যে এসব কাজ শেষ করে সাংগঠনিক রিপোর্ট দলের হাইকমান্ডের কাছে পাঠাতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য করুন