স্কুল-কলেজে অধ্যয়নরত ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আজ বৃহস্পতিবার মানিকগঞ্জে কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজে ৫০ থেকে ১০০ শিক্ষার্থীকে টিকাদানের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচির যাত্রা শুরু হবে। আজ পরীক্ষামূলকভাবে টিকা দেওয়া শিক্ষার্থীদের ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর এ কার্যক্রম ব্যাপক আকারে শুরু হবে।

গতকাল বুধবার ফেসবুক লাইভে এসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম এসব তথ্য জানান। প্রায় দুই মাস ধরে আলোচনা-মতবিনিময়ের পর স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের এ সিদ্ধান্ত এলো। প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে টিকাকরণ করা হবে। সেক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। এছাড়া যেসব শিক্ষার্থীর কো-মরবিডিটি রয়েছে তারাও অগ্রাধিকার পাবে।

এরপর টিকা দেওয়া হবে নবম ও একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের। পরে ধাপে ধাপে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনা হবে। স্কুল-কলেজের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও দ্রুততম সময়ের মধ্যে টিকার আওতায় আসছেন।

প্রাথমিক পর্যায়ে ৩০ লাখ শিক্ষার্থী :স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, সরকারের কাছে ৬০ লাখের মতো ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা মজুদ রয়েছে। এ টিকা দিয়ে ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে পূর্ণ দুই ডোজ টিকা দেওয়া সম্ভব হবে।

প্রসঙ্গত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, বিশ্বের কয়েকটি দেশে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্নার টিকা দেওয়া হচ্ছে। অন্য কোনো টিকা ১৮ বছরের কম বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগের ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এ কারণে অন্য টিকা মজুদ থাকলেও সেগুলো শিশুদের প্রয়োগ করা হবে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলে দেশে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। যাদের বয়স ১২ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এসব শিক্ষার্থীকে টিকা দিতে হলে প্রয়োজন দুই কোটি ডোজ টিকা, যা আবার ফাইজার অথবা মডার্না টিকা হতে হবে। শুরুতে নবম, দশম এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় আনা হবে। এই চার শ্রেণি মিলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ লাখের বেশি হবে না। সরকারের কাছে মজুদ থাকা ফাইজারের ৬০ লাখ টিকার মাধ্যমে তাদের টিকাকরণ সম্ভব হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক সমকালকে বলেন, স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে সংগত কারণেই এসব শিক্ষার্থীকে টিকাকরণের প্রসঙ্গটি চলে এসেছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর স্কুল-কলেজের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের টিকাকরণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, প্রথমে একাদশ, দ্বাদশ এবং নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া হবে। কারণ এসব শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। সুতরাং তাদের আগে টিকাকরণ প্রয়োজন। এরপর টিকা পাওয়া সাপেক্ষে অন্যদের দেওয়া হবে।

প্রয়োজন দুই কোটি ডোজ :শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক মিলে দেশে প্রায় এক কোটির মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। যাদের বয়স ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এসব শিক্ষার্থীকে টিকা দিতে হলে দুই কোটি ডোজের প্রয়োজন। সরকারের কাছে এই টিকার মজুদ কিংবা ক্রয়ের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ফাইজারের ৬০ লাখ ডোজ টিকা বর্তমানে মজুদ রয়েছে, যা দিয়ে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে টিকাকরণ করা যাবে। ফাইজারের কাছে আরও ৭০ লাখ টিকার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এটি পাওয়া গেলে আরও ৩৫ লাখ শিক্ষার্থীকে টিকাকরণ করা সম্ভব হবে। এর বাইরে ফাইজার ও মডার্নার টিকা কেনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া চীনের সিনোফার্ম টিকা ট্রায়ালের মাধ্যমে কার্যকর ফল দিলে ওই টিকাও এ কার্যক্রমে কাজে লাগানো হবে বলে জানান তিনি। উল্লেখ্য, চীনের পক্ষ থেকে ওই ট্রায়ালে সন্তোষজনক ফল পাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

শিশুদের টিকাদানের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সম্প্রতি সুইজারল্যান্ড সফরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ও গ্যাভির প্রতিনিধির সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। শিশুদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে তারা সম্মতি দিয়েছেন। এরপরই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকাকরণের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

গতকাল বুধবার ফেসবুক লাইভে এসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম জানান, বৃহস্পতিবার মানিকগঞ্জের কর্নেল মালেক মেডিকেল কলেজে ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম দিনে ৫০ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হবে। টিকা দেওয়ার পর তাদের ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। এরপর বড় আকারে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে।

গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের এক অনুষ্ঠান শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের বলেন, দেশের ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের চলতি সপ্তাহেই ফাইজারের টিকার মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। ফাইজারের টিকার সংরক্ষণ জটিল হওয়ায় আপাতত জেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকার ২১ কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হবে। তবে কোন কেন্দ্রে কখন শুরু করা হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।

শিক্ষার্থীদের নিবন্ধনের বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, প্রথমে স্কুল-কলেজ থেকে শিক্ষার্থীদের তালিকা এনে তা সুরক্ষা ওয়েবসাইটে যুক্ত করা হবে। পরে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা হবে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের টিকাকেন্দ্রও পৃথক হবে।

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানায়, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও টিকার আওতায় আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি অ্যাপের মাধ্যমে এসব শিক্ষার্থীকে এ কার্যক্রমে যুক্ত করছে। যেসব শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তারা জন্মনিবন্ধন কার্ডের মাধ্যমে টিকা নেওয়ার সুযোগ পাবেন। ইউজিসি থেকে পাঠানো শিক্ষার্থীদের নামের তালিকা সুরক্ষা অ্যাপে যুক্ত হওয়ার পর তারা নিবন্ধনের সুযোগ পাবেন। এরপর তারাও টিকার আওতায় আসবেন।

৬৬ শতাংশ চীনের টিকা প্রয়োগ :দেশে বর্তমানে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা, ফাইজার-বায়োএনটেক, মডার্না ও সিনোফার্মের টিকার মাধ্যমে টিকাদান কার্যক্রম চলছে। গতকাল বুধবার পর্যন্ত প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ৩ কোটি ৭২ লাখ ৫ হাজার ৭৬৬ ডোজ। প্রথম ডোজ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৬৯ জন। সব মিলিয়ে টিকা দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি ৬০ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯২ ডোজ। টিকা এসেছে ৭ কোটি ৩২ লাখ ডোজ।

এর মধ্যে অক্সফোর্ডের প্রথম ডোজ ৭৮ লাখ ৩৩ হাজার ৮ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৫৪ লাখ ২৭ হাজার ৯৮৯ জন, ফাইজারের টিকার প্রথম ডোজ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৭২৬ এবং দ্বিতীয় ডোজ ৫৪ হাজার ২ জন, সিনোফার্মের টিকার প্রথম ডোজ ২ কোটি ৬৬ লাখ ৫৫ হাজার ৮০১ এবং দ্বিতীয় ডোজ ১ কোটি ৬ লাখ ২১ হাজার ৪৭ জন এবং মডার্নার টিকার প্রথম ডোজ ২৬ লাখ ৯৭ হাজার ৭৯২ এবং দ্বিতীয় ডোজ ২৪ লাখ ৯১ হাজার ৩২৭ জন পেয়েছেন। টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ চীনের সিনোফার্মের, ২৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ অক্সফোর্ডের, ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ মডার্নার এবং ০.৬০ শতাংশ মানুষ ফাইজারের টিকা পেয়েছেন।

মার্চের মধ্যে টিকার আওতায় ৭০ শতাংশ :আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, টিকাপ্রাপ্তি ও টিকাদানের যে কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, তা ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মধ্যে দেশের ৮ কোটি মানুষকে দুই ডোজ করে টিকা দিতে পারব। একইসঙ্গে মার্চের মধ্যে ১২ কোটি মানুষ দুই ডোজ করে টিকা পাবেন। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় চলে আসবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চলতি মাসে সিনোফার্মের আরও দুই কোটি ডোজ টিকা আসবে। সর্বাধিক টিকা পেতে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোভ্যাক্স থেকে বিনামূল্যে, ক্রয়কৃত এবং অন্যান্য উৎস থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে পৌনে চার কোটি ডোজ টিকা আসবে। ডিসেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি প্রায় পাঁচ কোটি ডোজ টিকা আসবে। আগামী বছর জানুয়ারিতে প্রায় পৌনে চার কোটি ডোজ টিকা আসবে। সব মিলিয়ে জানুয়ারির মধ্যে ১৬ কোটি ডোজ টিকা মজুদ হবে। সুতরাং টিকা নিয়ে সংকট থাকবে না বলে মনে করেন তিনি।





মন্তব্য করুন