সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে- আগের দুইবারের মতো এবারও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হকসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী সরকারের এ অবস্থানের কথা বিভিন্ন সময় বলেছেন। তবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরা আর সার্চ কমিটি চায় না। তারা চায়, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হোক, যাতে স্থায়ী আইনি কাঠামোর মধ্য থেকেই কমিশন গঠন করা যায়। সংবিধানের মধ্যে থেকে নতুন আইন প্রণয়নের জন্য এখনও যথেষ্ট সময় আছে।

সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও নির্বাচন কমিশন গঠনে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরাও আইন তৈরির কথা বলছেন। এ অবস্থায় আজ রোববার বিকেল ৩টায় ১৪ দলীয় জোটের ভার্চুয়াল বৈঠক ডাকা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মন্দিরে হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বৈঠকটি ডাকা হলেও এতে নির্বাচন কমিশনের প্রসঙ্গটিও থাকবে বলে জানা গেছে। বৈঠকে জোটের শরিকরা নতুন আইন ও কাঠামো তৈরির প্রস্তাব তুলে ধরবে।

শরিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, ২০০৫ সালে যে ২৩ দফার ভিত্তিতে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, সেখানেও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে অবস্থান থেকে সরে এসে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে 'সার্চ কমিটি' দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের পথ বেছে নেয়। ফলে নির্বাচন ও নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন বিতর্ক যোগ হয়। আগামীতে নির্বাচন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যাতে কোনো প্রশ্ন উঠতে না পারে, তারা সে লক্ষ্যেই অগ্রসর হওয়ার পক্ষপাতী।

কয়েকজন নেতা সমকালকে বলেন, জোটের আজকের বৈঠকে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রসঙ্গ উঠলে আইন প্রণয়ন বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের বিষয়টিও তোলা হবে। এ ছাড়া বৈঠকে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন প্রণীত আইনের খসড়া সামনে নিয়ে আসা হতে পারে। নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বিদায় নেওয়ার আগে শামসুল হুদা কমিশন ওই আইনের খসড়া প্রণয়ন করলেও পরে সেটি অনুমোদন পায়নি। আওয়ামী লীগ সরকার সেটিকে গ্রহণ করলে এখন নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে এত বিতর্ক হতো না।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ৪ অক্টোবর তার জাতিসংঘ সফরপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। তার মাধ্যমেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। এর পর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সবার সঙ্গে আলোচনা করে সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। নতুন করে আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই।

নির্ভরযোগ্য কয়েকটি সূত্র জানায়, নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে অভিন্ন প্রস্তাব তুলে ধরতে চায় আওয়ামী লীগ। তারা চাচ্ছে, রাষ্ট্রপতি গত দু'বারের মতো এবারও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসলে ১৪ দলের পক্ষ থেকে যেন অভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সার্চ কমিটি গঠিত হলে সমঝোতার ভিত্তিতে যেন সম্ভাব্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশনারদের নাম প্রস্তাব করা হয়। এ কারণেই ১৪ দলের এ বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া স্থবির হয়ে থাকা ১৪ দলকে সক্রিয় করাও দীর্ঘ দিন পর বৈঠক ডাকার কারণ। এর আগে ৫ অক্টোবর বৈঠক ডেকেও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় সেটি বাতিল করা হয়েছিল।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে মধ্যেই নতুন কমিশন গঠন করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০১২ ও '১৭ সালের দুটি নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল; পরবর্তী কমিশনও সেভাবে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছে সরকার ও আওয়ামী লীগ-সংশ্নিষ্ট সূত্রগুলো। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ প্রথমে ৩১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেন। এর পর বর্তমান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের (তখন আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন) নেতৃত্বে সার্চ কমিটি গঠন করেন। সার্চ কমিটি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাঁচটি করে নাম চায় এবং ১০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা সুপারিশ আকারে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায়। রাষ্ট্রপতি এই সুপারিশের মধ্য থেকে কে এম নূরুল হুদাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আরও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেন। এর আগে ২০১২ সালেও তৎকালীন রাষ্ট্রপতি (প্রয়াত) জিল্লুর রহমান একই প্রক্রিয়ায় বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে সার্চ কমিটি গঠন করেন। ওই সার্চ কমিটির সুপারিশে গঠিত হয়েছিল কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন।

অবশ্য এ দুটি কমিশন বিশেষ করে বিদায়ী কে এম নূরুল হুদা কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দলগুলোর মধ্যে প্রবল আপত্তি রয়েছে। ১৪ দলের শরিক দলগুলোর মধ্যেও 'অসন্তোষ' রয়েছে। এ কমিশনের অধীনে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ সংসদ নির্বাচনের 'গ্রহণযোগ্যতা' নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে ১৪ দলের কোনো কোনো শরিক।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে নতুন আইন প্রণয়নের পক্ষে। তিনি সমকালকে বলেন, এ আইনটা বহু আগেই করা উচিত ছিল। এটা সংবিধানেই বলা আছে। ১৪ দল থেকে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তাতেও আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছিল। এমনকি নির্বাচন কমিশন থেকেই এ আইনের একটা খসড়া করা হয়েছিল। কিন্তু সেটি নিয়ে আগানো হয়নি।

মেনন বলেন, আইন করার জন্য যথেষ্ট সময় আছে। এখনই এ নিয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে আইনটা করা যেতে পারে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সব বিতর্কের অবসানের জন্যই সংবিধান নির্দেশিত পথে স্থায়ী আইনি কাঠামোর মাধ্যমে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ জন্য নতুন আইন করতে হবে।

এ ধরনের আইন করার জন্য সময় নেই বলে সরকারের পক্ষে যে ভাষ্য দেওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে একমত নন সাবেক এ তথ্যমন্ত্রী। মেননের মতো তিনিও বলেন, যথেষ্ট সময় আছে। এই সময়ের ভেতরেই আইনি কাঠামোটা তৈরি করা যায়। তা ছাড়া এটা করার জন্য এত সময় লাগেও না।

হাসানুল হক ইনু বলেন, এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন চলে যাওয়ার আগে আইনের একটা খসড়া তৈরি করে রেখে গিয়েছিলেন। সেটা কাজে লাগানো যেতে পারে। তা ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশের নির্বাচন কমিশনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েও খুব দ্রুত একটা আইনি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে। ১৪ দলের বৈঠকেই এ প্রস্তাব তুলে ধরা হবে।

বাংলাদেশ জাসদের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন করা উচিত। তবে আইন করার আগে সব দলের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।

জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম জানান, তারাও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে জোর দেবেন।

ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন সমকালকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নের কথা সংবিধানেই আছে। সেটা হলে নির্বাচন কমিশন গঠন প্রশ্নে কারও কথা বলার সুযোগ থাকবে না। সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানেও তা সহায়ক হবে।

মন্তব্য করুন