মধ্যদুপুরে মরুর উত্তাপে বিমর্ষ হননি কেউ। শরীর ক্লান্ত হলেও মন ছিল চঞ্চল। গরমে হাঁসফাঁস হয়ে বিরতিতে ছাতা মাথায় জিরিয়ে নিতে হলেও রানের ক্ষুধা মেটেনি মোটেও। সাকিব আল হাসান তাই ৪৬ রানে আউট হয়ে ক্ষোভ দেখান ব্যাট দিয়ে মাটিতে আঘাত করে। মরুতে ঝড় তোলা মাহমুদউল্লাহ হতাশা ব্যক্ত করেন হাফ সেঞ্চুরির পর আউট হয়ে। ২৭ বলে ৫০ রান করে চলমান বিশ্বকাপের দ্রুততম হাফ সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার রেকর্ড পরিতৃপ্ত করতে পারেনি টাইগার দলপতিকে। রেকর্ডের দেবতা সাকিবকেও দেন বর। লাসিথ মালিঙ্গাকে ছাপিয়ে টি২০ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উইকেটের মাইলফলকে শহিদ আফ্রিদিকে ছুঁয়ে ফেলেন বাঁহাতি সব্যসাচী এ ক্রিকেটার। ব্যক্তিগত অর্জনের ম্যাচে পাপুয়া নিউগিনির বিপক্ষে ৮৪ রানের জয় দিয়ে গ্রুপ পর্বের খেলা শেষ হলো বাংলাদেশের। মনের মাধুরী মিশিয়ে খেলে শেষ ম্যাচের রেকর্ড জয়ে মাহমুদউল্লাহরা পৌঁছে গেলেন সুপার টুয়েলভে। গ্রুপ 'বি' থেকে স্কটল্যান্ড সব ম্যাচ জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় রানার্সআপ হয়েছে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের মাঝে আইসিসি নিয়ম পরিবর্তন করায় সুপার টুয়েলভে বাংলাদেশ এখন খেলবে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। যদিও আইসিসি সূচি প্রকাশের সময় জানিয়েছিল যে, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা প্রথম পর্বে 'প্রথম' না হলেও সুপার টুয়েলভে উত্তীর্ণ হলে 'ওয়ান' হিসেবেই বিবেচিত হবে।

গতকাল আল আমেরাত স্টেডিয়াম হয়ে উঠেছিল উৎসবের মঞ্চ। সাকিব-মাহমুদউল্লাহরা দুই ম্যাচ পরে চার-ছক্কার ফোয়ারা ছুটিয়ে নিখাদ বিনোদন দেন দর্শকদের। ১৭টি চার-ছয় দেখে গ্যালারি হয় উন্মাতাল। ডিজে জোন থেকে বাজানো হয়েছে- 'চার-ছক্কা হই হই, বল গড়াইয়া গেল কই...' গানটি। ব্যাটিংয়ের পাটে পাটে রোমাঞ্চ ছড়িয়ে ৭ উইকেটে ১৮১ রান করে বাংলাদেশ। বিশাল স্কোর পেয়ে বোলাররাও ছিলেন উজ্জীবিত। সমন্বিত বোলিং দিয়ে পিএনজিকে অলআউট করে দেন ৯৭ রানে।

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে হারের পর সমালোচনার মুখে পড়ে দল। প্রশ্ন ওঠে ব্যাটারদের একাগ্রতা নিয়ে। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন ছিলেন সমালোচকদের দলে। বিষয়গুলো খুব স্পর্শ করেছিল টাইগারদের। দলের ভেতরে সঞ্চার হয়েছিল ক্ষোভ। সমালোচনার জবাব দিতে একটি জয় দরকার ছিল মাহমুদউল্লাহদের। স্বাগতিক ওমানকে হারিয়ে ছন্দে ফেরার রসদ পেয়ে যান তারা। দ্বিতীয় ম্যাচের আত্মবিশ্বাস কাজে লাগিয়ে শেষ ম্যাচটি একপেশে বানিয়ে ফেলেন তারা। সুপার টুয়েলভে কোয়ালিফাই করতে রান রেট বাড়িয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। সাকিব আল হাসান দ্বিতীয় ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে শেষ ম্যাচটি বড় ব্যবধানে জয়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। যেই পরিকল্পনা সেই মতো কাজ। মাসকট সময় দুপুর ২টায় ম্যাচ খেলায় টস জিতে আগে ব্যাটিং নেন অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ। ফিল্ডিং নিলে ১১ জন ক্রিকেটার মরুর গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। পরে ফিল্ডিং করায় গরমের প্রভাব সেভাবে দলের ওপর পড়েনি। এদিন শুরু থেকেই ইতিবাচক ব্যাট করেছেন ব্যাটাররা। আগের ম্যাচের হাফ সেঞ্চুরিয়ান নাঈম শেখ প্রথম ওভারে উইকেট হারালেও লিটন কুমার দাস ছন্দে ছিলেন। ডট বল কম করে রান তোলায় ফোকাস ছিলেন টাইগার ওপেনার। ২৩ বলে ২৯ রান করেন তিনি। লিটন-সাকিবের জুটি ছিল ৫০ রানের। মুশফিক, মাহমুদউল্লাহর সঙ্গেও ছোট ছোট জুটিতে ছিলেন সাকিব। তৃতীয় উইকেটে মুশফিকের সঙ্গে ১৯ বলে ২২ আর চতুর্থ জুটিতে মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে ২০ বলে ২৯ রান যোগ করেন স্কোর বোর্ডে। মাহমুদউল্লাহ ও আফিফেও ২৩ বলে ৪৩ রানের দুর্দান্ত জুটি হয়। ছোট ছোট জুটিতেই বড় স্কোরের দেখা পায় বাংলাদেশ।

টানা দুই ম্যাচে তিন সিনিয়রের স্ট্রাইক রেট নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের জবাব দেওয়ার জন্যই হয়তো স্ট্রাইক রেট মাথায় রেখে ব্যাটিং করেন সাকিব-মাহমুদউল্লাহ। তিনটি করে চার-ছক্কা হাঁকিয়ে ২৭ বলে ৫০ রান করেন টাইগার দলপতি। ১৮৫.১৮ স্ট্রাইক রেট তার। ইনিংসের ১৭ নম্বর ওভারে সপারকে দুটি ছয় ও একটি বাউন্ডারি হাঁকান তিনি। পরের ওভারেই আফিফ পর পর দু'বার বাউন্ডারি মেরে স্কোর বোর্ড বড় করেন। ১৪ বলে আফিফের ২১ আর ৬ বলে সাইফের ১৯ রান ছিল স্লগ ওভারের আদর্শ ব্যাটিং। পাওয়ার প্লেতেও রান উঠেছে গতকাল। প্রথম ম্যাচে ২ উইকেটে ২৫, আর দ্বিতীয় ম্যাচে ২ উইকেটে ২৯ রান করা দল পিএনজির বিপক্ষে এক উইকেটে করে ৪৫ রান। ১০ ওভার শেষে যেটা ৭১ রানের চূড়া স্পর্শ করে। স্লগ ওভারের রান রেট ছিল মুগ্ধ হওয়ার মতো। শেষ পাঁচ ওভারে তিন উইকেট হারিয়ে ৬৮ রান যোগ হয়েছে।

বাংলাদেশের বোলিং ব্যাটিংয়ের চেয়েও ভালো ছিল। পিএনজির ব্যাটারদের উইকেটে সেট হওয়ারই সুযোগ দেননি সাইফউদ্দিনরা। একজন বোলারও গতকাল খারাপ করেননি। সাকিব ছিলেন সবচেয়ে কৃপণ। চার ওভারে মাত্র ৯ রান দিয়ে চার উইকেট শিকার তার। যেটা টি২০ বিশ্বকাপে মাইলফলকে নিয়ে গেছে সাকিবকে। বিশ্বকাপের ৩৪ ম্যাচ খেলে ৩৯ উইকেট শিকার করা আফ্রিদির রেকর্ডে ভাগ বসালেন বাঁহাতি এ অলরাউন্ডার। সাইফউদ্দিন টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই ছন্দে রয়েছেন। ধারাবাহিকতা ধরে রেখে প্রথম রাউন্ডের শেষ ম্যাচে ২১ রানে দুই উইকেট শিকার তার। অফস্পিনার মেহেদী ব্যাটারদের জন্য রীতিমতো আতঙ্ক। আইপিএলের ডেথ ওভার বোলার মুস্তাফিজ কেন যেন বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে মারাত্মক হয়ে উঠতে পারেননি। যদিও টি২০ সংস্করণে কোনো ব্যাটসম্যান বা বোলারের পক্ষে টানা ভালো খেলা সম্ভব নয়। উত্থান-পতন ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেমন থাকে তেমনি দলীয় পারফরম্যান্সও ওঠানামা করে। বাংলাদেশ দলই এর বড় প্রমাণ। প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে হারের পর সুপার টুয়েলভে যাওয়া যেখানে শঙ্কার মুখে পড়েছিল, তারাই টানা দুই ম্যাচ জিতে পরের রাউন্ড নিশ্চিত করে ফেলে সবার আগে। দল ছন্দে ফেরায় বিসিবি কর্তাদের মতো টিম ম্যানেজমেন্টের সদস্যরাও কিছুটা শান্ত হয়েছেন। দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যাটিং লাইনআপ এলোমেলো করলেও গতকাল ফিরে গেছে সেট ফরম্যাটে। কোনো সন্দেহ নেই, গ্রুপ পর্বের ছন্দ কাজে লাগিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডে আরও ভালো খেলার চেষ্টা করবেন মাহমুদউল্লাহরা।

মন্তব্য করুন