যশোরের অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়ায় সংঘটিত সাম্প্রদায়িক হামলার প্রায় আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও এ মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়নি। এ মামলার চার্জ গঠন নিয়ে সরকারপক্ষের আইনজীবীদের বিরোধিতা এবং উচ্চ আদালতে আপিলের কারণে বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অপরাধে কয়েকশ অস্ত্রধারী অতর্কিত হামলা চালায় মালোপাড়ায়। হামলাকারীরা বোমার বিস্ম্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ছাড়াও শতাধিক বাড়িঘরে ভাঙচুর এবং ঘরে থাকা মালপত্র লুটপাট করে। পুড়িয়ে দেয় ১০টি বাড়ি। হামলায় আহত হয় অন্তত ২৫ জন। জামায়াত-বিএনপির চালানো সেদিনের ওই সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় তছনছ হয়েছিল পুরো গ্রাম। এ সময় আতঙ্কিত গ্রামবাসী পার্শ্ববর্তী ভৈরব নদ সাঁতরে ও ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে পার হয়ে দেয়াপাড়া গ্রামের পালপাড়া এলাকার পূজামণ্ডপে আশ্রয় নেন। পরদিন প্রশাসন ও রাজনৈতিক-সামাজিক নেতৃবৃন্দের সহায়তায় গ্রামে ফিরলেও সন্ধ্যা নামার আগেই নারী-শিশুদের অনেকেই ফের পাড়ি জমাতেন নদীর ওপারে। যারা ভিটে আঁকড়ে পড়েছিলেন তাদের প্রতিটি মুহূর্তও কাটত আতঙ্কের মাঝে।

দশম জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে ঘটে যাওয়া দুঃসহ সহিংসতার মধ্যে অন্যতম ছিল চাপাতলা মালোপাড়ার ঘটনাটি। হামলার পর দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পাশে দাঁড়ায় তাদের। ছুটে আসেন দেশবরেণ্য ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রী-এমপি, দেশি-বিদেশি সংস্থা ছাড়াও স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তোলপাড় হয় সারাদেশ, নড়ে বসে প্রশাসন। মালোপাড়ার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসানো হয় দুটি পুলিশ ক্যাম্প।

এ হামলার ঘটনায় পরদিন পুলিশ ৩৯ জনের নাম উল্লেখসহ ৫ শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করে। এ মামলায় বিভিন্ন সময়ে আটক দেখানো হয় শতাধিক ব্যক্তিকে। মামলাটি অভয়নগর থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাত ঘুরে তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। হামলার বছরপূর্তির আগের দিন অর্থাৎ ২০১৫ সালের ৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যশোর সিআইডির পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম ১০০ জনকে অভিযুক্ত করে যশোরের জেলা জজ আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন।

যশোরের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট বিমল কুমার রায় জানান, আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি বিচারের জন্য ২০১৯ সালে যশোরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (১ম) আদালতে পাঠানো হয়। বর্তমানে সেখানেই মামলাটি বিচারাধীন। তবে মামলার চার্জ গঠনকালে ওই আদালতের তৎকালীন বিচারক আব্দুল হামিদ এজাহারনামীয় ছাড়া চার্জশিটে থাকা বাকি আসামিদের অব্যাহতি দেন। তিনি (অ্যাডভোকেট বিমল) ও অপর অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট আবু সেলিম রানা অব্যাহতি প্রদানে আপত্তি জানালেও আদালত তা গ্রহণ করেননি। এরপর এ নিয়ে তারা চলতি বছরের মার্চ মাসে হাইকোর্টে আপিল করেন। কিন্তু উচ্চ আদালত এখনও এ ব্যাপারে কোনো আদেশ দেননি। সে কারণে নিম্ন আদালতে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া আপাতত বন্ধ রয়েছে।

সহিংসতার শিকার মালোপাড়ার মানুষ গত ক'বছরে পেয়েছেন পাকা রাস্তা, কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারের তৈরি করে দেওয়া নতুন ঘরবাড়ি ছাড়াও সরকারি-বেসরকারি অনেক সাহায্য সহযোগিতা। এতে খুশি সেখানকার মানুষেরা। তবে মামলার বিচার না হওয়ায় ক্ষোভও আছে এখানকার বাসিন্দাদের।

সেদিনের হামলায় আহত বিশ্বজিৎ সরকার বলেন, 'আমরা ঘটনার পর চাল, ডাল, কম্বল, জাল, নগদ টাকা সবকিছুই পাইছি। লেগেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ক্ষতিগ্রস্ত ৬২টি পরিবারকেই সরকারের পক্ষ থেকে পাকাবাড়ি করে দেওয়া হয়েছে। শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি সংস্কার করে দেওয়া হয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে নির্মিত নতুন বাড়ির পাশাপাশি রয়েছে সংস্কার করা বাড়িও। মালোপাড়া এখন তাই সবুজ টিন আর সাদা দেয়ালের এক নতুন জনপদ। এখন শুধু বিচার পেলেই খুশি আমরা।'

স্থানীয় পূজামণ্ডপ কমিটির নেতা শেখর বর্মণ বলেন, তাদের দাবি ছিল একটি স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প। তা এখন পর্যন্ত না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে তাদের। অন্যদিকে রাস্তাসহ যে ৯টি দাবি করেছিল তা আজও সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মালোপাড়ায় পুরোপুরি স্বস্তি ফিরেছে। বর্তমানে এ এলাকায় কোনো ভীতি নেই।

মন্তব্য করুন