সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসেন না বলে কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফে বৌদ্ধ মন্দিরে এবং বৌদ্ধদের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ৯ বছরেও শেষ হয়নি। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা 'রামু ট্র্যাজেডি' বলে অভিহিত হয়। ওই ঘটনায় করা ১৮টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তবে কোনো মামলায় এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ হয়নি। আদালতে উপস্থিত হতে সাক্ষীদের অনাগ্রহে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। এতে মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রামুতে সীমা বৌদ্ধ মহাবিহারে হামলার মধ্য দিয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত। পরের দিন ৩০ সেপ্টেম্বর উখিয়া ও টেকনাফের বৌদ্ধ বিহার, বৌদ্ধপল্লিতে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। দু'দিনের তাণ্ডবে ১৯টি বৌদ্ধ বিহার, ৪১ বসতঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় আরও ছয়টি বিহারে এবং বৌদ্ধদের অর্ধশত বাড়িঘরে। পুড়ে যায় কয়েকশ বছরের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্ব্বিক নিদর্শন। ফেসবুকে কোরআন শরিফ অবমাননার গুজব ছড়িয়ে এই হামলা চালানো হয়। ঘটনার পর করা হয় ১৯টি মামলা। তবে জনৈক সুধাংশু বড়ুয়া রামু থানায় তার করা একটি মামলা পরে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, বৌদ্ধপল্লিতে হামলার ঘটনায় করা ১৯ মামলার এজাহারে নাম-ঠিকানা উল্লেখিত আসামি ছিল ৩৭৫ জন। রামু থানার আট মামলার এজাহারে মোট আসামি সাত হাজার ৮৭৫ জন। এর মধ্যে ১১১ জনের নাম-ঠিকানা থাকলেও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল ৭৪ জনকে। সন্দেহভাজন হিসেবে আটক ছিল ১৩২ জন। উখিয়া থানার সাত মামলায় পাঁচ হাজার ৬২৪ আসামি থাকলেও গ্রেপ্তার হয় ১১৬ জন। টেকনাফ থানার দুটি মামলায় ৬৫৩ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার ছিল ৬৩ জন। কক্সবাজার সদর মডেল থানায় দুই মামলায় এক হাজার ৩০ জনকে আসামি করা হলেও গ্রেপ্তার হয় ৯৮ জন। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছেন গ্রেপ্তার হওয়া সবাই।

রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, 'রামুর সহিংসতায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে যে আঘাত হেনেছিল তা অনেকটা দূর হয়েছে। বৌদ্ধরা পেয়েছে দৃষ্টিনন্দন বিহার। কিন্তু এর পরও বৌদ্ধদের মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে তা মুছে যায়নি। কারণ, রামুর ঘটনার পর যে মামলাগুলো হয়েছে, তার কোনোটাই এখনও শেষ হয়নি।'

ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় দায়ীদের কারোর শাস্তি না হওয়ায় আক্ষেপ জানালেন এই বৌদ্ধ ভিক্ষু। তিনি বলেন, 'এর ফলে অজানা রয়ে গেল কারা এই ঘটনায় জড়িত। কারা সহিংসতায় ইন্ধন দিয়েছেন। আটক ব্যক্তিরা সবাই এখন জামিনে বের হয়ে গেছেন। অনেকেই পাড়ি দিয়েছেন বিদেশে। মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা সংশয়।

প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, রামু হামলার ১৮টি মামলার বাদী পুলিশ। পুলিশ কাকে আসামি করেছে, কাকে বাদ দিয়েছে আমরা জানি না। সেদিনের ঘটনায় যারা সামনের সারিতে ছিল, যারা ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে নেতৃত্ব দিয়েছে, এদের অনেকের নাম পুলিশের অভিযোগপত্রে নেই। আবার অনেক ব্যক্তির নাম যুক্ত হয়েছে যারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। রামু হামলার পর বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কমিটি জড়িতদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করতে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ঘটনার পরিকল্পনাকারী গডফাদারদের কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকে আটক করে এসব মামলা দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। মামলায় অনেক সাক্ষীর নাম-ঠিকানাও লেখা হয়েছে ভুলভাবে।

ক্ষতিগ্রস্ত এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা না করে পুলিশ এসব মামলার তদন্তকাজ সম্পন্ন করেছে বলে প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু অভিযোগ করেন। তিনি মনে করেন, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা এবং আসামি করার ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্বহীনতায় অনেক সাক্ষী মামলার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছেন। অনেকের মনোভাব বদলে গেছে। পুলিশও সাক্ষীদের আদালতে নিতে তৎপর নয়। তিনি বলেন, রামু সহিংসতার বিচার না হওয়ায় একই কায়দায় একের পর আরও সহিংস ঘটনার জন্ম হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ফরিদুল আলম জানান, বৌদ্ধ বিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনায় সর্বমোট ১৯টি মামলা হয়। এর মধ্যে বাদীর ইচ্ছায় একটি মামলা পরে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অন্য ১৮টি মামলায় ৯৯৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। এসব মামলা সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, 'বারবার সমন দেওয়ার পরও সাক্ষীরা আদালতে আসছেন না। আমরা বলেছি, সাক্ষীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। এর পরও তারা আদালতে আসতে আগ্রহী নন। সাক্ষীরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালতে না এলে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই ব্যাপারে বৌদ্ধ নেতাদেরও ভূমিকা রয়েছে।'

রামু উপজেলা বৌদ্ধ কল্যাণ ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ূয়া বলেন, 'রামু হামলার সঙ্গে জড়িত অনেকের ছবি ও ভিডিও আমরা তদন্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করেছি। অথচ প্রকৃত অপরাধীদের কাউকে আসামি করা হয়নি। যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের আমরা চিনি না। আমাদের অন্ধকারে রেখে মামলার তদন্ত হয়েছে। আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।'

রামু সহিংসতায় ফেসবুকে কোরআন অবমাননাকারী হিসেবে কথিত সেই উত্তম বড়ূয়াকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিনি কোথায়- এই প্রশ্নের উত্তরে পরিবার বলছে, তারা কিছু জানে না। কোনো তথ্য নেই পুলিশের কাছেও। অথচ এই উত্তম বড়ূয়া মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। 

মন্তব্য করুন