ইউনিয়ন পরিষদের তৃতীয় ধাপের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় রাজাকারপুত্র, হত্যা মামলার আসামি ও দলছুট ব্যক্তিরা স্থান পেয়েছেন। কয়েকটি ইউনিয়নে বিতর্কিত ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপেও কয়েকটি ইউনিয়নে বিতর্কিতরা মনোনয়ন পেয়েছিলেন। পরে তাদের বাদ দিয়ে নতুন প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়। তৃতীয় ধাপের বিতর্কিত প্রার্থীদের পরিবর্তন করা হয়নি।

এদিকে আওয়ামী লীগ প্রথম এবং দ্বিতীয় ধাপের মতো তৃতীয় ধাপে নির্বাচনেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিয়েছে। তৃতীয় ধাপে ৩০ জন নারী মনোনয়ন পেয়ে দলের প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন শিকদার মিজানুর রহমান। তার বাবা চাঁদ আলী শিকদার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন বলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন। তারা শিকদার মিজানুর রহমানের দলীয় মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে মানববন্ধন এবং বিক্ষোভ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। শিকদার মিজানুর রহমান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বিনোদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছেন মোফাজ্জল হোসেন মোফা। এই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. পরেশ চন্দ্র রায়ের অভিযোগ, প্রার্থী নির্বাচন ও জেলা থেকে কেন্দ্রে প্রার্থীর নাম পাঠানোর বেলায় অনিয়মের পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের সমর্থন এবং পছন্দকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। তৃণমূল থেকে যোগ্য ও পরীক্ষিত প্রার্থী হিসেবে বিশ্বজিৎ মোহন্তের নাম চূড়ান্ত করা হলেও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান প্রতীক বাণিজ্য এবং আর্থিক সুবিধা নিয়ে মোফাজ্জল হোসেন মোফার নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন। অথচ মোফাজ্জল হোসেন মোফা বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেছেন। তিনি এখনও বিএনপি নেতাদের নিয়ে প্রকাশ্যে শোভাযাত্রা করেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও হয়েছিল। লাঠিয়াল হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিস্তার চরসহ নিরীহ কৃষক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। তার অত্যাচার থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও বাদ যাননি।

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নে রেজাউল করিমের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে। তবে জেলা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতার পছন্দের হওয়ায় কেউই তার মনোনয়ন নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না। কিন্তু তাকে নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি রয়েছে। বহরপুর ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসা রেজাউল করিম ২০১২ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেও তাকে দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী দলছুট হিসেবেই দেখছেন।

বিএনপি নেতার মনোনয়ন :ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার রূপসদী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আবদুল হাকিম। তিনি বিএনপির স্থানীয় নেতা বলে দাবি করেছেন রূপসদী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন। তার বক্তব্য, আবদুল হাকিম এখনও স্থানীয় বিএনপির সম্মানিত সদস্য। আবার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগেরও সদস্য। একই ব্যক্তি কীভাবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতা হতে পারেন এবং কীভাবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন, সেই প্রশ্ন তুলেছেন দেলোয়ার হোসেন।

নারী প্রার্থী যারা :আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ড তৃতীয় দফার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যে ৩০ নারীকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিয়েছে তারা হচ্ছেন- ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার বৈরচুনায় টেলিনা সরকার হিমু, বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছীতে সোনিতা নাসরিন, রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলায় ফাহিমা বেগম, নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়ায় পারভীন আকতার বানু, সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার রাজাপুরে ছনিয়া সবুর, পাবনার চাটমোহর উপজেলার নিমাইচরায় নুরজাহান বেগম, যশোরের শার্শা উপজেলার লক্ষ্মণপুরে আনোয়ারা খাতুন, মনিরামপুর উপজেলার ভোজগাতীতে আছমা তুন্নাহার, মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার মহম্মদপুরে রাবেয়া বেগম, নড়াইলের কালিয়া উপজেলার হামিদপুরে পলি বেগম, মাউলীতে রোজী হক, খাশিয়ালে হালিমা বেগম, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগরে শ্যামলী অধিকারী, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মরজালে সানজিদা সুলতানা, রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার রতনদিয়ায় মেহেদী হাচিনা পারভীন, বোয়ালিয়ায় হালিমা বেগম, জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ঝাউগড়ায় আঞ্জুমনোয়ারা বেগম, শেরপুরের নকলা উপজেলার বানেশ্বর্দীতে আঞ্জুমান আরা বেগম, নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়ায় মাজেদা খাতুন, বিশকাকুনীতে লাভলী আক্তার, কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতীতে তাহেরা খাতুন, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারংয়ে ছালমা আক্তার চৌধুরী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহজাদাপুরে আছমা আক্তার, কালিকচ্ছতে রোকেয়া আক্তার, কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার পদুয়ায় মিনু বেগম, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার কেরোয়ায় শাহিনুর বেগম রেখা, কক্সবাজারের রামগঞ্জ উপজেলার লামচরে মাহেনারা পারভীন, চকরিয়া উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলায় ফারহানা আফরিন মুন্না, কৈয়ারবিলে জন্নাতুল বকেয়া এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নে মাহমুদা বেগম।

২ হাজার ৭৯ ইউপিতে প্রার্থী :দলের মনোনয়ন বোর্ড তৃতীয় দফার নির্বাচনে ২ হাজার ৭৯টি ইউপিতে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- রংপুর বিভাগের পঞ্চগড়ে ১৫টি, ঠাকুরগাঁওয়ে ১৮টি, দিনাজপুরে ২২, নীলফামারীতে ১৯, লালমনিরহাটে ১৭, রংপুরে ১৩, কুড়িগ্রামে ২৮, গাইবান্ধায় ১৯টি; রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাটে ৫টি, বগুড়ায় ২৭টি, নওগাঁয় ২২টি, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৪টি, রাজশাহীতে ১৩টি, নাটোরে ১৫, সিরাজগঞ্জে ১৯, পাবনায় ২৭; খুলনা বিভাগের মেহেরপুরে ৬, কুষ্টিয়ায় ১৪, চুয়াডাঙ্গায় ১৩, ঝিনাইদহে ১৬, যশোরে ৩৫, মাগুরায় ১৫, নড়াইলে ১২, খুলনায় ৭, সাতক্ষীরায় ১৭; বরিশাল বিভাগের বরগুনায় ৪, পটুয়াখালীতে ৬, ভোলায় ৮, বরিশালে ৫, পিরোজপুর ২; ঢাকা বিভাগের টাঙ্গাইলে ২৪, কিশোরগঞ্জে ২৩, মানিকগঞ্জে ১০, মুন্সীগঞ্জে ২১, ঢাকায় ১১, গাজীপুরে ৭, নরসিংদীতে ২২, নারায়ণগঞ্জে ৮, রাজবাড়ীতে ১৪, ফরিদপুরে ১৫, গোপালগঞ্জে ১৬; ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুরে ১৫টি, শেরপুরে ২১, ময়মনসিংহে ২৭, নেত্রকোনায় ২৫; সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জে ১৭, সিলেটে ১৬, মৌলভীবাজারে ২৩, হবিগঞ্জে ২১; চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩৩, কুমিল্লায় ৩০, চাঁদপুরে ১৮, ফেনীতে ৮, নোয়াখালীতে ৬, লক্ষ্মীপুরে ২৯, চট্টগ্রামে ৩৯, কক্সবাজারে ১৬, খাগড়াছড়িতে ৭, রাঙামাটিতে ৭ এবং বান্দরবানে ৮টি।





মন্তব্য করুন