বিএনপির সমাবেশ ঘিরে গতকাল মঙ্গলবার সংঘর্ষ হয়েছে। রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ শেষে নেতাকর্মীদের একাংশ মিছিল নিয়ে কাকরাইলের দিকে যেতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এতে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন এবং ৩০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বিএনপি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে দলের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব অভিমুখে সম্প্রীতি শোভাযাত্রা করার কথা ছিল। পুলিশের অনুমতি না মেলায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সম্প্রীতি সমাবেশ হয়।

কর্মসূচি ঘিরে সকাল থেকে পুলিশের কড়া নজরদারির মধ্যেও হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত হন। ফকিরাপুল থেকে কাকরাইল মোড় পর্যন্ত সমাবেশে নেতাকর্মীরা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন অলিগলিতে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পূর্বদিকে জলকামান, রায়টকার রাখা হয় এবং পশ্চিম দিকে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। কর্মসূচিতে যোগদানকালে নেতাকর্মীদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। সমাবেশ করে ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর কিছুক্ষণ পরই সংঘর্ষ শুরু হয়।

সকাল ৯টার পর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশকালে সাদা পোশাকের পুলিশ অনেক নেতাকর্মীকে আটক করেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। সমাবেশ চলাকালে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও সমাবেশ শেষে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নেতাকর্মীদের একাংশ ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে মিছিল করে নাইটিঙ্গেল মোড়ের দিকে যাওয়ার সময় ঢাকা ব্যাংকের সামনে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। পুলিশের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এক পর্যায়ে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছোড়ে ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে। বিএনপি নেতাকর্মীরা এ সময় বিভিন্ন গলিতে অবস্থান নেন। প্রায় ১০ মিনিট ধরে এই সংঘর্ষ চলে। এতে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হন বলে জানা গেছে।

সংঘর্ষের পর দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ব্যর্থতার প্রতিবাদে বিএনপির পূর্বঘোষিত মিছিলে হামলা ও গুলি চালানো হয়েছে। পুলিশের গুলি ও হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি নেতাকর্মী। মিছিল থেকে পুলিশ শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করেছে।

সমাবেশে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশে সরকার পরিবর্তন এখন জনগণের দাবি। আওয়ামী লীগের আর ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই। তারা কোনো সমস্যারই সমাধান করতে পারেনি। তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তৈরি করছে, মানুষের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, জনমানুষের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। অবিলম্বে সরকারকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নিরপেক্ষ সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিন। নতুন নির্বাচন দিন যাতে সবাই ভোট দিতে পারে, ভোটের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।

মির্জা ফখরুল বলেন, আজ আমাদের কর্মসূচি ছিল। আমরা চিঠিও দিয়েছিলাম আগে। কিন্তু সকাল থেকে নেতাকর্মীদের এখানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৫০ জনের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দাবি করে অবিলম্বে তাদের মুক্তি চান তিনি। আধা ঘণ্টার এই সমাবেশে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্র করেছে। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখন হিন্দু সম্প্রদায়, বৌদ্ধ সম্প্রদায়, মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর তারা আঘাত হেনেছে। তাদের লক্ষ্য একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ক্ষমতায় এসে ২০০৮ সাল থেকে তারা দেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, তারা প্রশাসনকে ধ্বংস করেছে, নির্বাচন কমিশনকে দলীয়করণ করেছে। তারা সংবাদমাধ্যমকে অত্যাচার-নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করে রাখতে চায়।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, এই সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না এবং নির্বাচনে যাব না। আগামী দিনে আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য সবাই প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, যে কোনো মুহূর্তে আন্দোলনের ডাক পড়বে। আজকে যেমনি ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তার চেয়ে শত গুণ শক্তি নিয়ে রাজপথে থাকতে হবে। রাজপথে যে বাধা আসবে, সে বাধা অতিক্রম করতে হবে। আঘাত করলে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানির পরিচালনায় সমাবেশে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম বক্তব্য দেন।

এ সময় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, আহমেদ আজম খান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, খায়রুল কবীর খোকন, ফজলুল হক মিলন, মীর সরফত আলী সপু, আবদুস সালাম আজাদ, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, নিপুণ রায় চৌধুরী, অঙ্গসংগঠনের আফরোজা আব্বাস, সাইফুল ইসলাম নীরব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পুলিশের মতিঝিল জোনের উপকমিশনার (ডিসি) আবদুল আহাদ বলেন, বিএনপির সমাবেশে তারা বাধা দেননি। বিএনপির মিছিলের অনুমতি ছিল না, তবু তারা মিছিল করছিল। তিনি আরও বলেন, বিএনপিই পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে তাদের ধাওয়া দেয়।

ফখরুলের বিবৃতি :মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, দেশ পরিচালনায় সব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে সরকার ফ্যাসিবাদী আচরণের আশ্রয় নিয়ে দেশকে ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি মারুফ মিয়া, সহসভাপতি সাঈদ সুমন, সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম নিষাদসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আদালতে হাজিরা দিতে গেলে তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোয় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি এ বিবৃতি দেন।



মন্তব্য করুন