প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, উন্নয়ন পরিকল্পনা যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ব্যবসায়িক যোগাযোগের সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে আন্তর্জাতিক বাজার ধরার সুযোগ পাবেন।

গতকাল মঙ্গলবার সপ্তাহব্যাপী বাংলাদেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে সম্মেলনে বক্তব্য দেন- পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন ও ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রহমান। এ সময় কয়েকজন সংসদ সদস্য, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) যৌথভাবে এই আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সম্মেলনে বিশ্বের ৩৮টি দেশের ৫৫২টি উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। সম্মেলনে দেশের অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ও ফিনটেক, চামড়া, ওষুধ, স্বয়ংক্রিয় ও ক্ষুদ্র প্রকৌশল, কৃষিপণ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাট-বস্ত্রশিল্পসহ অতি চাহিদাসম্পন্ন ভোগ্যপণ্য উৎপাদন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্ভাবনা তুলে ধরা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু বাংলাদেশের বাজার পাবেন তা নয়, বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর বাজারে রপ্তানির সুযোগ পাবেন। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করতে সরকার সড়ক, নৌ, রেল এবং আকাশপথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। নদী ড্রেজিং করা হচ্ছে। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হচ্ছে। সৈয়দপুরে করা হচ্ছে আঞ্চলিক বিমানবন্দর। আগের বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বন্দর করা হচ্ছে।

শেখ হাসিনা বলেন, কোন দেশে কী পণ্যের চাহিদা রয়েছে, গবেষণা করে বের করতে হবে। সে অনুযায়ী দেশে পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেবেন বলে তিনি মনে করেন। কারণ রপ্তানি পণ্যের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, যে কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাংলাদেশ রাখে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের 'ডুয়িং বিজনেস' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের ১৭৬ থেকে ১৬৮-তে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসার বিভিন্ন সূচক উন্নয়নে বিশ্বের সর্বোচ্চ ২০টি সংস্কারকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ব্যবসা-সংক্রান্ত সব সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়ার জন্য 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস' (ওএসএস) চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক অগ্রাধিকার বাণিজ্য চুক্তি (আরপিটিএ), মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পাদনের লক্ষ্যে ২৩টি দেশের সঙ্গে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ভুটানের সঙ্গে পিটিএ স্বাক্ষর করা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক জোটের সঙ্গে কাজ করছে সরকার।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এরই মধ্যে দেশে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে এবং ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে। সাড়ে চার কোটির বেশি মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় এসেছে। দেশের ১২ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। করোনার প্রভাব মোকাবিলায় সরকার এক লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে তিনি সরকার গঠনের শুরুতে (১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে) মোট রপ্তানি আয় ছিল ৩৮৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০০০-২০০১ অর্থবছর শেষে ৬৪৬ কোটি ডলার হয়। এরপর ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় (২০০৮-২০০৯ অর্থবছরে) মোট রপ্তানি আয় ছিল এক হাজার ৫৫৬ কোটি ডলার, যা গত ১৩ বছরে বেড়ে চার হাজার ৫৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার জন্য তার সরকার বিভিন্ন আইনে সংশোধন এনেছে। পাশাপাশি নতুন আইনও করেছে।

অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ব্যবসার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য বাংলাদেশ বর্তমানে আদর্শ জায়গা। কারণ এখানে দক্ষ শ্রমশক্তি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগসহ ব্যবসার প্রয়োজনীয় সব কিছু সহজে পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ এখন সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ক্ষেত্র। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এ সুযোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হচ্ছে। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামীতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেক।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করা পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের তুলনায় সহজ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে সহজে বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগের রিটার্নও বেশি। কারণ এখানকার মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। বাজারও বড়। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের সরকার কর অবকাশ সুবিধা দিচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ১০০ ভাগ প্রত্যাবাসন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। রয়েছে অন্যান্য প্রণোদনা। বর্তমান বাংলাদেশ নতুন বাংলাদেশ। ফলে এখানে সম্ভাবনাও নতুন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহনশীলতা দেখিয়েছে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য যা সম্ভব হয়েছে।

এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আরও এগোনোর জন্য নতুন বাজার ও পণ্যে যেতে হবে। এ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন বাজার সৃষ্টি ও বিনিয়োগ আসবে বলে মনে করেন তিনি।

ডিসিসিআই সভাপতি রিজওয়ান রহমান বলেন, বাংলাদেশ দ্রুত ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ। করোনার মধ্যেও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে বিনিয়োগ সহজ হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ এখন আকর্ষণীয় জায়গা।

মন্তব্য করুন