ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা নিয়ে আওয়ামী লীগে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কয়েকজন এমপি ও জেলা নেতা প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার অনুরোধ জানিয়ে দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছেন। আবার কেউ কেউ দলীয়ভাবে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে অভিমত দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ড তৃতীয় দফা ইউপি নির্বাচনে ৮৮টি ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে শরীয়তপুরে ৫৫টি, মাদারীপুরে ২৬টি এবং গোপালগঞ্জে সাতটি ইউনিয়ন রয়েছে। অর্থাৎ এসব ইউনিয়নের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা থাকবে না।

আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর কয়েকজন সদস্য সমকালকে জানিয়েছেন, ওই তিন জেলার সাত এমপির অনুরোধে ওই ইউনিয়নগুলোতে দলীয় প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপের সব কটি ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়।

এদিকে এসব ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার পর আরও কয়েকজন এমপি ও জেলা নেতাও নিজেদের নির্বাচনী এলাকায় দলের প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছেন। কেউ কেউ এ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেছেন। অবশ্য এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তাদের অনেকেই মুখ খুলতে চাননি।

অবশ্য নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস এমপি সমকালকে জানান, তিনি তার নির্বাচনী এলাকা নাটোর-৪ আসনের সব ইউনিয়নে দলীয় প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করেছেন। এ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গেও তার কথা হয়েছে।

বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপি তৃণমূল নেতাদের মতামত পেলে দলের প্রার্থিতা উন্মুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন এমপি বলেছেন, স্থানীয় পর্যায়ে সার্বিক অবস্থা বিশ্নেষণের পর প্রয়োজন হলে প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার আবেদন করা হবে।

গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন সবুজ এমপি বলেছেন, এ জেলায় মাত্র ৯টি ইউনিয়নের নির্বাচন বাকি রয়েছে। সুতরাং এখানে প্রার্থিতা উন্মুক্ত করার প্রয়োজন নেই। শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতিউর রহমান আতিক এমপি জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী বেশি বলেই শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। শেরপুরে তা নেই। কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল হক মুজিব এমপির পরিস্কার কথা, তিনি প্রার্থিতা উন্মুক্ত চান না।

৮৮টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. হারুণ-অর-রশিদ বলেছেন, প্রতিটি ইউনিয়নেই আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা একের অধিক। তাই কাকে রেখে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে- হয়তো এই ভাবনা থেকেই আওয়ামী লীগ প্রার্থিতা উন্মুক্ত রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরীক্ষামূলকভাবে দলের জনপ্রিয়তা যাচাই করে নেওয়ার চিন্তাভাবনাও থাকতে পারে।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, প্রার্থিতা উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে সুবিধা পাবে। এতে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকবে না। মনোনয়ন বাণিজ্য হবে না। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-বিবাদও থাকবে না। তবে এতে জাতির কোনো লাভ হবে না। এমন পদক্ষেপের ফলে সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অবাধ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের কোনো ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আওয়ামী লীগের হয়তো বোধোদয় হয়েছে। কিন্তু কাকে রেখে কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে- এমন ভাবনা থেকে প্রার্থিতা উন্মুক্ত রাখা হলে সেটা হবে, যেই লাউ সেই কদুর মতো অবস্থা। আসলে দলগতভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনটাই একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে মনোনয়ন গ্রহণ ও প্রার্থিতা প্রত্যাহার নিয়ে বাণিজ্য হচ্ছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা কলুষিত হচ্ছে।









মন্তব্য করুন